স্বাস্থ্য
ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ
প্রকাশ : ১৭ মার্চ ২০২৬ ১৪:০৫ পিএম
এক মাস সিয়াম সাধনার পর মুসলমানদের প্রধান উৎসব আর আনন্দের দিন হচ্ছে ঈদুল ফিতর। আর এই সময়টাতে নাড়ির টানে পরিবারের সবার সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়ার জন্য দলে দলে মানুষের গ্রামের পথে ছুটে চলার প্রবণতা চিরন্তন। ঈদ মানে খুশি, ঈদ মানে আনন্দ-উল্লাস, স্ফূর্তি আর নতুন সাজে সজ্জিত হওয়া। আমাদের ঈদ-সংস্কৃতির দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যের অন্যতম আকর্ষণ হলো ছোট বাচ্চা থেকে শুরু করে আবালবৃদ্ধবনিতা সবার জন্যই নতুন পোশাক, একটু ভালো খাবারদাবার আর আনন্দ বিনোদন। ঈদের নামাজ শেষে কোলাকুলি, বুকে জড়িয়ে ধরে ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ, ফ্রেমে বন্দি অসংখ্য স্থিরচিত্র, বন্ধুবান্ধব আর আত্মীয়ের বাসায় বাসায় ঘোরাঘুরি, খাওয়াদাওয়া, মজা করা মুসলিমদের জন্য এক মহাআনন্দের। আর এসব ঈদের সংস্কৃতির অংশ। তবে ঈদ ভ্রমণে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং সতর্কতা নিয়ে সবাইকে হতে হবে সচেতন।
ঈদ ভ্রমণে স্বাস্থ্যঝুঁকির
খুঁটিনাটি জানা থাকলে ভ্রমণটি হতে পারে আরও আনন্দময়। যাত্রাপথে যারা দূর-দূরান্তে যান,
তাদের রাস্তাঘাটে পোহাতে হয় হাজারো দুর্ভোগ আর বিড়ম্বনা। তারপরও বাসায় ফেরার আনন্দে
মন থাকে মাতোয়ারা। তাই কষ্টগুলো আর বড় হয়ে ওঠে না। এই সময়টাতে অনেককেই ভ্রমণ করতে হয়
বাস, ট্রেন অথবা লঞ্চে। রাস্তায় যানজট, ফেরি স্বল্পতা ও পারাপারের সংকট, লঞ্চ-স্টিমারে
গাদাগাদি-ঠাসাঠাসি। প্রচণ্ড ভিড় আর ঠেলাঠেলি করে ক্লান্তিকর ও দীর্ঘ ভ্রমণ শেষে বাড়ি
পৌঁছতে হয়, আবার ছুটি শেষে কাজে যোগদান করতে হয়। সবাই চায় নির্বিঘ্নে আর নিরাপদে ঘরে
ফিরতে। তবে যাওয়া আসার ঝক্কিতে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। শিশু ও বয়স্কদের পক্ষে লম্বা
যাত্রাপথের ধকল সহ্য করা খুব কঠিন হয় বইকি। এ সময় আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে শরীর খারাপ
হতেই পারে। তাই যাত্রাপথে কিছু সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত। অন্যথায় ঈদের আনন্দ আগেভাগেই
মাটি হয়ে যেতে পারে। তাই ঈদ ভ্রমণে অসুস্থ হয়ে পড়াটা কোনোক্রমেই কাম্য নয়।
পরিকল্পনা : যাত্রা
শুরুর আগে সুন্দরভাবে পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি নিয়ে রওনা হবেন। একটু সতর্ক হলেই প্রতিরোধযোগ্য
অসুখ-বিসুখ সহজে এড়ানো সম্ভব। শারীরিক অবস্থা খারাপ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
লাগেজ গোছানো
: গোছগাছের ব্যাপারটির সঙ্গে কোথায় যাওয়া হচ্ছে এবং কতদিন থাকতে হবে তা জড়িত। অবশ্যই
নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রসহ এমনকি ছোট বাচ্চা বা বয়স্কদের জন্য যা যা দরকার, তা সঙ্গে
রাখা উচিত। যতটা সম্ভব অপ্রয়োজনীয় জিনিস বাদ দেওয়া ভালো।
রোজা অবস্থায়
ভ্রমণ : রোজা রেখে রওনা হলে নিজের ঘরের তৈরি প্রয়োজনীয় খাবার ও বিশুদ্ধ পানীয় সঙ্গে
রাখুন, যেন ইফতারের সময় বাইরের খাবার খেতে না হয়। বর্তমানে প্রচণ্ড গরম, তাই বেশি বেশি
বিশুদ্ধ পানি পান করুন।
পরিধেয় পোশাক
: ভ্রমণে যত হালকা ও আরামদায়ক পোশাক পরা যায়, ততই সুবিধা, কারণ বাইরে প্রচণ্ড গরম।
ছেলেরা টি-শার্ট পরতে পারেন। তবে নিজের আরামদায়ক হয়, এমন যেকোনো পোশাকই পরতে পারেন।
বেশি টাইট জামাকাপড় পরিহার করা উচিত।
যাত্রাপথে পরনের
জুতা : জুতার ব্যাপারে অবশ্যই খেয়াল রাখুন। বিশেষ করে, নারীরা ভ্রমণের সময় হাইহিল জুতা
এড়িয়ে চলুন। ভ্রমণক্ষেত্রে কমফোর্টেবল জুতা বা স্যান্ডেল হাঁটার জন্য আরামদায়ক।
যানবাহনে সতর্কতা
: জানালা দিয়ে মাথা বা হাত বের করে রাখবেন না। অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে বাস, ট্রেন বা লঞ্চে
ভ্রমণ থেকে বিরত থাকুন। বাস বা ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ করা খুবই বিপজ্জনক, তাই ছাদে ভ্রমণ
থেকে বিরত থাকুন।
ফার্স্ট এইড বক্স
ও প্রয়োজনীয় ওষুধ : ভ্রমণের প্যাকিং করার আগে অবশ্যই ফার্স্ট এইড বক্স নিয়ে নিন। ভ্রমণকালে
যে কোনো সময় ছোটখাটো অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে আপনার কাটাছেঁড়ায় প্রাথমিক
সহায়তা হবে। বিশেষ করে, যারা পাহাড়-পর্বত বা ট্র্যাকিং ট্রিপ দিতে পছন্দ করেন, তাদের
ক্ষেত্রে অধিক কাজে দেবে। কারণ ট্র্যাকিং করার সময় কাটাছেঁড়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। ফার্স্ট
এইড বক্সের সঙ্গে নিয়ে নিন প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র। জ্বর-ঠান্ডা, মাথাব্যথা ইত্যাদি সমস্যা
হওয়াটা স্বাভাবিক। এ ছাড়া বমি, পেট খারাপের ওষুধ এবং ডাক্তারের পরামর্শ অনুসারে অ্যান্টিবায়োটিক
সঙ্গে রাখা জরুরি।
যারা দীর্ঘমেয়াদি
রোগে ভুগছেন : যারা বিভিন্ন রোগে ভোগেন, যেমন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, বাতরোগ,
অ্যাজমা বা অ্যালার্জি, তারা অবশ্যই ঈদ ভ্রমণে প্রয়োজনীয় ওষুধ সঙ্গে নিতে ভুলবেন না।
অ্যাজমা বা শ্বাসকষ্টের রোগীরা সঙ্গে রাখুন ইনহেলার। ডায়াবেটিস রোগীরা ইনসুলিন বা ট্যাবলেট
সঙ্গে রাখবেন এবং লজেন্স, সুগার কিউব সঙ্গে নেবেন। প্লেনে ভ্রমণ করলে ঘন ঘন পা ম্যাসাজ
করতে হবে, না হলে পায়ে রক্ত জমাট বেঁধে ডিপ ভেইন থ্রম্বোসিস হতে পারে। তারা পায়ে রক্তজমা
প্রতিরোধকারী মোজা পরতে পারেন। যাদের ওজন বেশি তারাও এটা পরতে পারেন।
খাবার নিয়ে সতর্কতা
: ভ্রমণে যাওয়ার পূর্বে অবশ্যই অতিরিক্ত খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকুন। নিজের ঘরের তৈরি
খাবার এবং প্রয়োজনীয় বিশুদ্ধ পানি সঙ্গে রাখবেন। বাইরের খাবার, শরবত বা পানীয় পরিহার
করবেন। অপরিচিত কারও দেওয়া খাবার বা পানীয় পান করবেন না। প্রয়োজন অনুযায়ী বিশুদ্ধ পানি
পান করুন এবং বাচ্চাদেরও পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করাবেন। ভ্রমণে খাদ্য ও পানিবাহিত
রোগ প্রতিরোধের ব্যাপারে সচেষ্ট থাকতে হবে।
ভ্রমণের পূর্বে
পর্যাপ্ত ঘুম : ভ্রমণের সময় দীর্ঘ দূরত্ব না থাকা সত্ত্বেও প্রায়ই যানজটের জন্য দীর্ঘক্ষণ
রাস্তাতেই কেটে যায়। এমতাবস্থায় শরীরে যথেষ্ট পরিমাণে শক্তি জোগানের জন্য ভ্রমণের আগে
পর্যাপ্ত ঘুম দরকার। এছাড়াও ট্রেনে মোশন সিকনেস থেকে রক্ষা পেতে যানবাহন চলাকালে কিছুক্ষণ
চোখ বন্ধ রাখা অথবা সম্ভব হলে ঘুমিয়ে নেওয়া ভালো।
গর্ভবতী নারীদের
ভ্রমণ : ভ্রমণের সময়ে গর্ভবতী নারীদের রোজা না রাখাই ভালো। কারণ এই সময়ে ঘন ঘন পানি
না খেলে শরীরে পানির অভাব দেখা দিতে পারে। বাইরের খাবার একেবারেই খাওয়া উচিত নয় গর্ভবতী
নারীদের। বাসা থেকেই শুকনো খাবার নিয়ে আসা উচিত সঙ্গে করে। বাসের একদম পেছনের দিকের
সিট কিংবা ট্রেনের একেবারে পেছনের দিকের বগিতে অনেক বেশি ঝাঁকি অনুভূত হয়। তাই গর্ভবতী
নারীদের উচিত টিকিট করার সময়ে নিজের অসুবিধার কথা জানিয়ে সামনের দিকের সিট নির্বাচন
করা। গর্ভাবস্থায় অনেকক্ষণ এক স্থানে বসে থাকতে থাকতে পায়ে পানি এসে পা ফুলে যেতে পারে।
এ ছাড়াও দীর্ঘক্ষণ একস্থানে বসে থাকলে রক্ত চলাচল কমে যায়। তাই সম্ভব হলে যাত্রাবিরতিতে
কিছুক্ষণ হাঁটাচলা করে নিন। এতে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক থাকবে।
শিশুদের নিয়ে
বাড়তি সতর্কতা : ট্রেনে, বাসে কিংবা লঞ্চে ভ্রমণের সময়ে শিশুরা সব সময়েই জানালার ধারের
সিটটি পছন্দ করে। এ কারণে হঠাৎ করে অতিরিক্ত বাতাসের মুখোমুখি হয়। ফলে শিশুরা অনেকে
ঠিক ভ্রমণের পরপরই আক্রান্ত হয় সর্দিজ্বর কিংবা সাধারণ কাশিতে। এ ছাড়াও বাইরের পানীয়
এবং খাবার খেয়ে বমি ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়। তাই তারা যাতে যাত্রাপথে বাইরের খাবার
না খায়, সে ব্যাপারে সজাগ থাকুন। একেবারে ছোট দুগ্ধপোষ্য শিশু নিয়ে ভ্রমণ না করাই উচিত।
প্রয়োজনে বের হতে হলে তাদের জন্য পর্যাপ্ত খাবারের ব্যবস্থা করে নিতে হবে। চলার পথে
শিশুকে অবশ্যই ধরে রাখবেন, ট্রেন, বাস বা লঞ্চ থেকে নিচে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকিও কিন্তু
উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। খেয়াল রাখবেন কোনো বাচ্চা যেন জানালা দিয়ে হাত বাইরে না রাখে।
এ বিষয়ে সতর্ক হোন।
বয়স্কদের সতর্কতা
: দীর্ঘ ভ্রমণ বয়স্কদের জন্য বেশি কষ্টসাধ্য। বিভিন্ন রোগসহ অনেকেই বাতজ্বর বা আর্থ্রাইটিসে
ভোগেন। তাদের জন্য বাসে বা ট্রেনে ওঠাও সহজ নয়, সে সময় তাদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে
দিন। যাত্রাপথে যেন তারা একই ভঙ্গিতে বেশিক্ষণ বসে না থাকে এবং মাঝেমধ্যে যানবাহনের
মধ্যেই যেন কিছুক্ষণ চলাফেরা করেনÑ সে ব্যাপারে খেয়াল রাখুন। তা না হলে বাতের ব্যথা
বাড়তে পারে, এমনকি পায়ে পানি জমে পা ফুলেও যেতে পারে।
অজ্ঞান পার্টি
থেকে সাবধান : যাত্রাপথে মলম পার্টি ও ছিনতাইকারীদের আনাগোনা বেশি থাকে তাই সতর্ক থাকুন।
যানবাহনে অপরিচিত কেউ খাদ্য বা পানীয় দিলে খাবেন না। কারণ প্রায়ই শোনা যায়, এ ধরনের
খাবার খেয়ে অনেকেই বড় দুর্ঘটনায় পড়েছেন। কাজেই এই বিপদ এড়াতে সচেতন থাকবেন।
জরুরি প্রয়োজনে
: পরিচিত ডাক্তার এবং পুলিশের ফোন নম্বর সঙ্গে রাখুন। অসুস্থ বা কোনো বিপদে পড়লে যেন
সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারের পরামর্শ ও বিপদের সময় পুলিশের সাহায্য নিতে পারেন। পুলিশের
সাহায্য নিতে যেকোনো জায়গা থেকে ৯৯৯-এ ফোন করবেন।
বাড়তি সতর্কতা : ঈদে ঘরমুখো মানুষ বাড়ি যাওয়ার জন্য খুবই ব্যস্ত হয়ে পড়েন। বাস, ট্রেন ও লঞ্চের ছাদে চড়ে ঝুঁকিপূর্ণ সফর করেন, এতে অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদ-আপদের শিকার হন। অন্য সময়ের চেয়ে ঈদের সময় সড়ক দুর্ঘটনার পরিমাণ বাড়ে। এজন্য সফরে সতর্ক ও সাবধান থাকতে হবে, কোনোভাবেই অসতর্কভাবে চলাফেরা করা যাবে না। যে কদিন গ্রামে থাকবেন, অযথা অপ্রয়োজনে রোদে এবং অন্য কোথাও বেশি ঘোরাফেরা করবেন না। এ সময় সাপের কামড়ের রোগীরও প্রচুর খবর পাওয়া যায়। বাচ্চাদের দিকে বেশি নজর রাখবেন যেন পুকুর, নদী বা জলাশয়ের পানিতে বাচ্চারা একা একা না নামে। সবার ভ্রমণ সুন্দর ও নিরাপদ হোক। সর্বোপরি ঈদের ছুটিতে ভ্রমণের প্রস্তুতি, সতর্কতা ও নিরাপত্তা অব্যাহত থাকলে সুন্দর স্মরণীয় এক ভ্রমণ অভিজ্ঞতার আশা করা যায়।
ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ
মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, ইমেরিটাস অধ্যাপক