ব্যাংকিং খাত
আহমেদ তোফায়েল
প্রকাশ : ১৭ মার্চ ২০২৬ ১৪:০১ পিএম
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত আজ এক জটিল বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে। সমস্যা শুধু কিছু খেলাপি ঋণ নয়Ñ সমস্যা আরও গভীরে। এটি আসলে তিনটি বড় সংকটের সমষ্টিÑ দুর্বল শাসনব্যবস্থা, দুর্বল ব্যালান্স শিট এবং নীতিনির্ধারণে মানুষের ভেঙে পড়া বিশ্বাস। এই তিনটি সংকট পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। একটি আরেকটিকে জন্ম দেয়। একটি আরেকটিকে শক্তিশালী করে। ফলে ব্যাংকিং খাতের সমস্যা আজ শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি একটি আস্থার সংকট। একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংকট এবং একই সঙ্গে একটি নীতিগত সংকট। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন এই অবস্থার সৃষ্টি হলো? কীভাবে এটি এত গভীরে পৌঁছল? এর প্রভাব কত দূর পর্যন্ত যেতে পারে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই ব্যাংকিং খাতের বাস্তবতা বিশ্লেষণ করা জরুরি।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো গভর্ন্যান্স বা
শাসনব্যবস্থা। ব্যাংকিং ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো বিশ্বাস। মানুষ তাদের কষ্টের টাকা
ব্যাংকে রাখে বিশ্বাসের ওপর। কিন্তু যখন ব্যাংকের পরিচালনা কাঠামো দুর্বল হয়, তখন সেই
বিশ্বাস নষ্ট হয়ে যায়। গত এক দশকে আমরা বার বার দেখেছি বড় বড় ঋণ কেলেঙ্কারি। হাজার
হাজার কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতি।
স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে ঋণ বিতরণ। এই ঘটনাগুলো কেবল অর্থনৈতিক
ক্ষতি করেনি, এগুলো মানুষের মনে গভীর সন্দেহ তৈরি করেছে।
মানুষ ভাবতে শুরু করেছেÑ ব্যাংক কি সত্যিই নিরাপদ? এই প্রশ্নটি কোনো
ছোট প্রশ্ন নয়। এটি পুরো আর্থিক ব্যবস্থার ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দেয়। কারণ ব্যাংকিং ব্যবস্থার
সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো বিশ্বাস।
কেন গভর্ন্যান্স দুর্বল হলো : কেন ব্যাংকিং খাতে গভর্ন্যান্স এত দুর্বল
হয়ে পড়ল? এর পেছনে কয়েকটি বড় কারণ রয়েছে। প্রথম কারণ রাজনৈতিক প্রভাব। বাংলাদেশে অনেক
ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত। ফলে অনেক ক্ষেত্রে দক্ষতা নয়, প্রভাবই
হয়ে ওঠে সিদ্ধান্তের ভিত্তি।
দ্বিতীয় কারণ স্বার্থের সংঘাত। অনেক পরিচালক নিজের প্রতিষ্ঠানের জন্যই
ব্যাংক থেকে ঋণ নেন। এতে ব্যাংকিং ব্যবস্থার মূল নীতিই ভেঙে পড়ে। তৃতীয় কারণ নিয়ন্ত্রণের
দুর্বলতা। নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনেক সময় পর্যাপ্ত ক্ষমতা বা স্বাধীনতা থাকে না। ফলে অনিয়ম
হলেও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায় না।
ফিট অ্যান্ড প্রপার নীতির গুরুত্ব : এই পরিস্থিতিতে ব্যাংকিং খাত
সংস্কারের প্রথম শর্ত হলো সঠিক নেতৃত্ব নিশ্চিত করা। ব্যাংকের পরিচালক এবং সিইওদের
জন্য কঠোর ফিট অ্যান্ড প্রপার নীতি প্রয়োজন। অর্থাৎ, কে ব্যাংক পরিচালনা করবেন তা স্পষ্টভাবে
নির্ধারণ করতে হবে। তাদের আর্থিক সক্ষমতা থাকতে হবে। পেশাগত দক্ষতা থাকতে হবে। নৈতিক
গ্রহণযোগ্যতা থাকতে হবে। কিন্তু বাস্তবে এই নীতি অনেক সময় কাগজে সীমাবদ্ধ থাকে। যদি
এটি কঠোরভাবে প্রয়োগ না করা হয়, তাহলে কোনো সংস্কারই টেকসই হবে না।
প্রকৃত মালিকানা প্রকাশের প্রয়োজন : বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের আরেকটি
বড় সমস্যা হলো প্রকৃত মালিকানা গোপন রাখা। অনেক সময় দেখা যায় একটি কোম্পানি ঋণ নিচ্ছে।
কিন্তু সেই কোম্পানির প্রকৃত মালিক কে, তা স্পষ্ট নয়। এই ধরনের গোপন মালিকানা ব্যাংকিং
ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। কারণ এতে একই ব্যক্তি বিভিন্ন নামে ঋণ নিতে পারে। ফলে একটি ঋণ আসলে
কত বড় ঝুঁকি তৈরি করছে তা বোঝা কঠিন হয়ে যায়। এই সমস্যা সমাধানে বেনিফিশিয়াল ওনারশিপ
প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা জরুরি। এটি আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ
মানদণ্ড।
আইন সংস্কারের প্রয়োজন : বাংলাদেশে ব্যাংকিং আইন অনেক সময় ঘটনা-ভিত্তিকভাবে
তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ কোনো বড় কেলেঙ্কারি ঘটলে তখন একটি নতুন আইন তৈরি হয়। কিন্তু এই
ধরনের প্রতিক্রিয়াশীল আইন দীর্ঘমেয়াদে ভালো কাজ করে না। কারণ এটি পুরো ব্যবস্থাকে ভারসাম্যহীন
করে ফেলে। একটি ঘটনার জন্য করা আইন অনেক সময় অন্য ক্ষেত্রেও অযথা বাধা সৃষ্টি করে।
ফলে ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে যায়। এই কারণে ব্যাংক কোম্পানি আইনকে আন্তর্জাতিক মানের
সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা জরুরি। বিশেষ করে, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের দ্বিতীয় বড় সংকট হলো মূলধন সংকট। গত কয়েক
বছরে অনেক ব্যাংকের মূলধন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এর প্রধান কারণ খেলাপি ঋণ। যখন
বড় অঙ্কের ঋণ ফেরত আসে না, তখন ব্যাংকের ব্যালান্স শিট দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে ব্যাংকের
প্রকৃত আর্থিক অবস্থা অনেক সময় লুকিয়ে থাকে। এটিকে বলা হয় ‘গোপন দেউলিয়াত্ব’। অর্থাৎ
ব্যাংক কাগজে টিকে আছে। কিন্তু বাস্তবে দুর্বল।
পুনর্মূলধন জোগানের বাস্তবতা : এই পরিস্থিতিতে অনেক সময় সরকার ব্যাংকগুলোকে
পুনর্মূলধন জোগান দেয়। অর্থাৎ জনগণের টাকায় ব্যাংককে বাঁচানো হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলোÑ
এটি কতটা টেকসই সমাধান? যদি মূল সমস্যার সমাধান না হয়, তাহলে একই সমস্যা আবার ফিরে
আসবে। এই কারণে পুনর্মূলধন জোগানের আগে সংস্কারের শর্ত থাকা জরুরি। যে ব্যাংক সংস্কারে
রাজি হবে, কেবল তাদেরই সহায়তা দেওয়া উচিত।
ব্যাংক রেজল্যুশনের নতুন ধারণা : বিশ্বব্যাপী এখন ব্যাংক সংকট মোকাবিলার
নতুন পদ্ধতি চালু হয়েছে। এটিকে বলা হয় ব্যাংক রেজল্যুশন। এর মধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ
পদ্ধতি রয়েছে। একটি হলো ব্রিজ ব্যাংক। এতে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকের কার্যক্রম সাময়িকভাবে
একটি নতুন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে চালানো হয়। আরেকটি পদ্ধতি হলো পারচেজ অ্যান্ড অ্যাসাম্পশন।
এতে একটি শক্তিশালী ব্যাংক দুর্বল ব্যাংকের সম্পদ ও দায় গ্রহণ করে। এই পদ্ধতিগুলো দ্রুত
প্রয়োগ করা গেলে ব্যাংকিং সংকট অনেক সময় বড় আকার নেওয়ার আগেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সংস্কারের একটি প্রস্তাব হলো একীভূতকরণ। অর্থাৎ
কয়েকটি ব্যাংককে একত্র করে বড় প্রতিষ্ঠান তৈরি করা। এতে পরিচালন ব্যয় কমতে পারে। দক্ষতা
বাড়তে পারে। কিন্তু শুধু একীভূতকরণ করলেই সমস্যা সমাধান হবে না। যদি শাসনব্যবস্থা একই
থাকে, তাহলে সমস্যা আবার ফিরে আসবে। তাই একীভূতকরণের সঙ্গে গভর্ন্যান্স সংস্কার জরুরি।
ব্যাংকিং খাতের আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো মুদ্রানীতি। মুদ্রানীতি মূলত
অর্থনীতির দিক নির্দেশনা দেয়। কিন্তু যদি নীতি বার বার পরিবর্তিত হয়, তাহলে বাজার বিভ্রান্ত
হয়ে যায়। সুদের হার করিডোর পরিবর্তন। তারল্য সরবরাহে দ্বৈত সংকেত। এই ধরনের সিদ্ধান্ত
বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি করে। বিনিয়োগকারীরা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন স্থিতিশীল নীতিকে।
কারণ বিনিয়োগ সব সময় ভবিষ্যৎকে কেন্দ্র করে। যদি নীতির ভবিষ্যৎ অনুমান করা না যায়,
তাহলে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি নিতে চান না।
ব্যাংকিং খাতের সংস্কারে আইন থাকাই যথেষ্ট নয়। আইনের প্রয়োগই আসল
বিষয়। বাংলাদেশে অনেক সময় দেখা যায়, আইন আছে কিন্তু প্রয়োগ দুর্বল। বিশেষ করে, ঋণ আদায়ের
ক্ষেত্রে। অনেক মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। ফলে খেলাপিরা উৎসাহিত হয়। ব্যাংকিং খাতের
আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো অর্থ পাচার। যখন বড় অঙ্কের টাকা বিদেশে চলে যায়, তখন দেশের
আর্থিক ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। এটি ব্যাংকের তারল্য কমিয়ে দেয়। এবং বিনিয়োগ কমিয়ে
দেয়। এই কারণে অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করা জরুরি।
ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ করা অত্যন্ত
গুরুত্বপূর্ণ। যদি মানুষ জানে কোন ব্যাংক কতটা শক্তিশালী, তাহলে বাজারে স্বাভাবিক শৃঙ্খলা
তৈরি হয়। স্বচ্ছতা বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ায়। এবং দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোকে সংস্কারে
বাধ্য করে। সবশেষে প্রশ্নটি আবার আস্থার জায়গায় ফিরে আসে। ব্যাংকিং খাতের সংকট আসলে
আস্থার সংকট। এই আস্থা ভাঙতে সময় লাগে না কিন্তু পুনর্গঠন করতে সময় লাগে অনেক। এটি
রাতারাতি সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে। এখন
সিদ্ধান্ত নিতে হবেÑ আমরা কি পুরনো পথেই চলব? নাকি সাহসী সংস্কারের পথে এগোব? সংস্কার
মানে শুধু নতুন নীতি নয়। সংস্কার মানে নতুন সংস্কৃতি। জবাবদিহিতার সংস্কৃতি। স্বচ্ছতার
সংস্কৃতি। পেশাদারত্বের সংস্কৃতি।
আসলে ব্যাংকিং খাত অর্থনীতির হৃদপিণ্ড। এই খাত দুর্বল হলে পুরো অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই ব্যাংকিং সংস্কার শুধু একটি খাতের সংস্কার নয়। এটি দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির প্রশ্ন। লক্ষ্যটি আসলে খুব সহজ। মানুষকে যেন আর হঠাৎ বিস্মিত হতে না হয়। ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে এমন হতে হবে যেখানে ভবিষ্যৎ অনুমান করা যায়। কারণ বিনিয়োগ আসে স্পষ্টতা থেকে। স্লোগান থেকে নয়।
আহমেদ তোফায়েল
সাংবাদিক