× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

শ্রদ্ধাঞ্জলি

খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন: ‘দধীচি’র প্রতিকৃতি

মহিউদ্দিন খান মোহন

প্রকাশ : ১৬ মার্চ ২০২৬ ১৩:৫২ পিএম

মহিউদ্দিন খান মোহন, সাংবাদিক ও কলাম লেখক। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

মহিউদ্দিন খান মোহন, সাংবাদিক ও কলাম লেখক। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

হিন্দু পৌরাণিক কাহিনীতে একজন ঋষি দেবতার কথা বলা হয়েছেÑ যার নাম দধীচি। কথিত আছে পৃথিবী থেকে অসুরের রাজত্ব ধ্বংস করার জন্য তিনি নিজের অস্থিকে বজ্র হিসেবে তৈরি করে ইন্দ্রকে সহায়তা করেছিলেন। ইন্দ্র দধীচির সে অস্থি নির্মিত শরের মাধ্যমে বহুসংখ্যক অসুরের বিনাশ সাধনে সক্ষম হয়েছিলেন। প্রাচীন ভারতের সে পৌরাণিক কাহিনীর দধীচি-পরবর্তী সময়ে এই অঞ্চলের সাহিত্য-সংস্কৃতিতে প্রাসঙ্গিক হিসেবেই উপস্থাপিত হয়েছে। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার ‘কুলি-মজুর’ কবিতায় দধীচির উল্লেখ করে লিখেছেন ‘যে দধীচিদের হাড় দিয়ে ওই বাষ্প-শকট চলে/ বাবু সা’ব এসে চড়িল তাহাতে কুলিরা পড়িল তলে।’ কবি নজরুল এখানে এ দেশের কুলি-মজুর তথা খেটে খাওয়া মানুষকে দধীচির সঙ্গে তুলনা করেছেন, যাদের রক্ত পানি করা শ্রমের ফসল ভোগ করে ওপর তলার মানুষেরা। মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে দধীচির সঙ্গে তুলনা করেছিলন প্রখ্যাত গণসংগীত শিল্পী ফকির আলমগীর। হুজুর ভাসানীর ইন্তেকালের পরে তিনি ‘আবদুল হামিদ খান ভাসানী সংগ্রামেরই একটি নাম’ যে গানটি গেয়েছিলেন তার এক স্তবকে বলা হয়েছÑ ‘হে দধীচি সংগ্রামী বীর/ বিপ্লবী হে উন্নত শির/ তোমার নামে দীক্ষা নিয়ে সংগ্রামে শপথ নিলাম...।’

খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন। জন্ম: ১ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৩, মৃত্যু: ১৬ মার্চ ২০১১

প্রাচীন ভারতের পৌরাণিক কাহিনী ছাড়া দধীচি নামে আদতে কেউ ছিল কি না সে সত্যতা যাচাইয়ের কোনো উপায় নেই। তবে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা বিশ্বাস করে, দধীচি ছিলেন এবং এই পৃথিবী থেকে অসুররূপী সব অন্যায়-অবিচার দূর করার জন্য ইন্দ্রকে তার হাড় দিয়েছিলেন অস্ত্র তৈরি করতে। আক্ষরিক অর্থে এ যুগে দধীচিদের আবির্ভাব না ঘটলেও তাদের মতো আত্মোৎসর্গকারী মানুষ বিরল নয়। ফকির আলমগীর তার গানে মওলানা ভাসানীকে দধীচি সম্বোধন করে তার প্রতি যথাযথ সম্মানই দেখিয়েছেন। মজলুম জননেতা তার পুরো জীবনই ব্যয় করেছেন এ দেশের কৃষক শ্রমিক মেহনতি মানুষের ন্যায্য অধিকার আদায়ের সংগ্রামে। তিনি ছিলেন মজলুম মানুষের নেতা, তাদের ভরসাস্থল। তার জীবনী পাঠ করলে দধীচির মতো নিজের শরীরের হাড় দিয়ে বজ্র-তীর তৈরি করে শোষকদের সিংহাসন তছনছ করে দেওয়ার সাযুজ্য মেলে। 

তবে আজ আমার এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য মওলানা ভাসানীর জীবনী আলোচনা নয়। আজ কথা বলব এমন একজন রাজনীতিবিদকে নিয়ে যিনি এ দেশের রাজনীতির এক ঘোরতর দুর্দিনে দধীচির মতো আবির্ভূত হয়েছিলেন। ২০১১ সালের ১৬ মার্চ তিনি পরলোকগমন করেছেন। আজ তার ১৫তম মৃত্যুবার্ষিকী। তিনি খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন, বিএনপির দুর্দিনের মহাসচিব। দল ও গণতন্ত্রের এক ঘোরতর অমানিশার রাতে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া তাকে মহাসচিব নিযুক্ত করেছিলেন। খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন এ নিযুক্তিকে নিয়েছিলেন দলীয় প্রধান কর্তৃক তার ওপর অর্পিত এক পবিত্র দায়িত্ব হিসেবে। যে কারণে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের জীবন ও নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে থাকা সত্ত্বেও তিনি দায়িত্ব পালনের অবস্থান থেকে এতটুকু টলেননি। একজন বিশ্বস্ত সিপাহসালার হিসেবে খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন ওয়ান-ইলেভেনের দুঃসময়ে দায়িত্ব পালন করেছেন। এক্ষেত্রে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন মরহুমা খালেদা জিয়ার বিচক্ষণতার প্রশংসা করতেই হবে। দলের নেতাকর্মী ও দেশবাসীর কাছে প্রায় অপরিচিত খোন্দকার দেলোয়ারকে মহাসচিব নিযুক্ত করে তিনি যে সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছিলেন, পরবর্তী সময়ে তা প্রমাণিত হয়েছে। যে সময়ে অনেক ডাকসাইটে নেতা পিঠটান দিয়েছিলেন, গা-ঢাকা দিয়ে থেকেছেন, কেউবা কথিত স্থায়ী কমিটির বিতর্কিত সভার ততোধিক বিতর্কিত সিদ্ধান্তের সুবাদে দলের ‘ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান’, কেউ আবার ‘অস্থায়ী মহাসচিব’ সাজার চেষ্টা করেছেন, তখন খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়িয়েছিলেন সে চক্রান্তের বিরুদ্ধে। সেটা ছিল এক অসম লড়াই। একদিকে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র, তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল দলের একটি অংশ। অন্যদিকে মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে অল্প সংখ্যক নেতা ও তৃণমূলের প্রায় সব কর্মী। 

জীবনের অনেক দিন-রাতের কথাই হয়তো ভুলে যাব। তবে সে ভয়ংকর রাতের স্মৃতি কখনোই ভুলতে পারব না। ২০০৭ সালের ৩০ অক্টোবর মধ্যরাতে সাবেক অর্থমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এম সাইফুর রহমানের গুলশানস্থ বাসায় বিএনপিকে হাইজ্যাক করার অপচেষ্টা হয়েছিল। গভীর রাতে যখন দেখলাম সাইফুর রহমানকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও মেজর হাফিজকে (অব.) অস্থায়ী মহাসচিব ঘোষণা করা হলো, আমি যোগাযোগ করলাম রিজভী আহমেদের সঙ্গে। তিনি বললেন, মহাসচিবের বরাতে যে কয়টা সম্ভব পত্রিকা ও টিভি চ্যানেলে বলে দিতে যে, এটা বিএনপির সিদ্ধান্ত নয়। এটা অবৈধ সভা। দলের নেতাকর্মীরা এ সিদ্ধান্ত মানে না। আমি বলে দিতে থাকলাম। একপর্যায়ে পেয়ে গেলাম চ্যানেল আইয়ের তৎকালীন বিশেষ সংবাদদাতা (বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব) সালেহ শিবলীকে। তিনি বললেন, এ কথাটি রিজভী আহমদের স্বকণ্ঠে শোনানোর ব্যবস্থা করেন। তৎক্ষণাৎ যোগাযোগ করলাম রিজভী আহমেদের সঙ্গে। তারপর টেলিফোনে তার বক্তব্য রেকর্ড করে সালেহ শিবলী চ্যানেল আইয়ে তা প্রচার করেন। পরে অনেকেই আমাকে বলেছেন, তারা ভেবেছিলেন দল থেকে ম্যাডাম জিয়াকে বাদ দেওয়া হলো। কিন্তু টেলিভিশনের ওই ঘোষণার পরই তারা বুঝতে পারেন, ওটা ছিল ‘কাশিমবাজার কুঠির’ ষড়যন্ত্র। পরদিন সকালে বারডেম হাসপাতালে মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন রোগশয্যায় শুয়ে যখন বললেন, গুলশানের সেই ‘কম্পালসারি’ সভায় উপস্থিত থাকার জন্য সরকারের বিশেষ সংস্থার লোকেরা তাকে হত্যার হুমকি দিয়েছিল, তখন দেশবাসী ও বিএনপি নেতাকর্মীদের কাছে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। সে রাতে খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন যদি কৌশলে আত্মগোপন করে সাইফুর রহমানের বাসার সভায় অনুপস্থিত না থাকতেন, তাহলে বিএনপির ইতিহাস আজ অন্যভাবে লিখতে হতো। 

বস্তুত ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা জারির পর বিএনপি যে বিপর্যয়ে পড়েছিল, তা থেকে উদ্ধার পাওয়া সহজ হতো না, যদি খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মতো একজন সাহসী মানুষ দলটির হাল না ধরতেন। তৎকালীন সদ্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সহকারী প্রেস সচিব হিসেবে সে আপৎকালীন সময়ে দল ও নেত্রীর পক্ষে কিছুটা দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেয়েছিলাম। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমরা কয়েকজন তখন দল ও জিয়া পরিবারকে রক্ষায় কাজ করেছি। ফখরুদ্দীন-মইন ইউ’র আধা-সামরিক সরকারের কোপানলে পড়ার ভয়ে সে সময় অনেকেই রাজনীতির ময়দান থেকে উধাও হয়ে গিয়েছিলেন। ম্যাডামের প্রেস সংক্রান্ত বিষয়ে কাজ করার পাশাপাশি আমি তখন দৈনিক দিনকালের সহকারী সম্পাদকেরও দায়িত্ব পালন করছিলাম। ওই দুঃসময়ে সহাসী ভূমিকা পালন করেছেন পত্রিকাটির তৎকালীন নির্বাহী সম্পাদক মারুফ কামাল খান সোহেল (বর্তমানে দৈনিক প্রতিদিনের বাংলাদেশ সম্পাদক)। সে সময় দেশের কয়েকটি বড় দৈনিক বিএনপি ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চরিত্র হননের লক্ষ্যে উদ্দেশ্যমূলক বানোয়াট গালগল্প ছাপানো শুরু করে। পত্রিকাগুলোর প্রচার সংখ্যা ছিল আমাদের পত্রিকার চেয়ে অনেক বেশি। সেসব বানোয়াট গল্পের বিপরীতে আমরাও প্রতিবেদন, নিবন্ধ ইত্যাদি ছাপা শুরু করি। এ কাজে সর্বাত্মক সহযোগিতা করতেন দৈনিক দিনকালের কমার্শিয়াল ম্যানেজার মাহবুবুর রহমান। দৈনন্দিন কাজের ফাঁকে ফাঁকে আমরা পরিকল্পনা করতাম কোন বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদন করা যায়, কাকে দিয়ে তা লেখানো যায়। এ বিষয়ে মারুফ কামাল খান ছিলেন পারদর্শী। তার পরামর্শে আমি বেশ কয়েকটি নিবন্ধ লিখে বিএনপি, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনাকারীদের জবাব দেওয়ার চেষ্টা করি। সেসব ঘটনার বিস্তারিত এখানে উল্লেখ করার সুযোগ নেই। আমার লেখা ‘জরুরি অবস্থা, বিএনপি ও কিছু না বলা কথা’ বইয়ে সবিস্তারেই বলেছি। এখন অনেকেই হয়তো সে দুঃসময়ের কথা বিস্মৃত হয়েছেন। কারণ রাজনীতি এমনই একটি কর্মকাণ্ড যে, অনেক সময় জেনেশুনে বিষ পান করতে হয়। 

অনেকে বলতে পারেন, বিএনপির যখন সুদিন, তখন উনিশ বছর আগের দুঃসহ স্মৃতির কথা কেন স্মরণ করছি। কেউ কেউ এটাকে পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটাও বলতে পারেন। তবে এটা তো ঠিক যে, রাজনীতির প্রয়োজনে অতীতের কিছু বিষয় ভুলে থাকার চেষ্টা করলেও সত্যি কখনও মিথ্যা হয়ে যায় না। ওয়ান-ইলেভেনের কুশীলবরা চেয়েছিল বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে জিয়া পরিবারকে মাইনাস করে দিতে। তাদের সঙ্গে কোমর বেঁধে নেমেছিলেন বিএনপিরই কতিপয় নেতা, যারা কথিত সংস্কারবাদী হিসেবে আজও নেতাকর্মীদের কাছে চিহ্নিত। প্রকৃতির খেলা এমনই যে, যারা সেদিন জিয়া পরিবারকে এ দেশের রাজনীতি থেকে মাইনাস করতে চেয়েছিল, তারাই শেষ পর্যন্ত মাইনাস হয়ে গেছে। তবে বিস্ময়কর হলেও সত্যি যে, সে মাইনাস ফর্মুলা বাস্তবায়নের বেশ কয়েকজন ক্রীড়নক বিএনপিতে তাদের অবস্থান পোক্ত করে নিতে সক্ষম হয়েছেন। পক্ষান্তরে বিএনপি ও জিয়া পরিবারের পক্ষে শক্ত অবস্থান গ্রহণকারী অনেকেই হারিয়ে গেছেন। রাজনীতির পরিহাস বোধকরি এটাই। 

মূলত বিএনপির সাবেক মহাসচিব মরহুম খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনকে নিয়ে লিখতে গিয়ে প্রাসঙ্গিকভাবে অনেক কথা বলা হলো। কেউ কেউ এটাকে ধান ভানতে শিবের গীত বলতে পারেন। তবে এটা স্বীকার করতেই হবে, খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন ওয়ান-ইলেভেনের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন নিবিড়ভাবে। একটি আলোচনা করতে গেলে প্রাসঙ্গিকভাবেই আরেকটি চলে আসবে। ব্যক্তিগত লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে থেকে এবং সমস্ত ভয়ভীতিকে উপেক্ষা করে খোন্দকার দেলোয়ার নেত্রীর দেওয়া দায়িত্ব পালন করেছেন বিশ্বস্ত সেনাপতির মতো। মৃত্যুবার্ষিকীতে তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। 


মহিউদ্দিন খান মোহন

সাংবাদিক ও কলাম লেখক


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা