× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

তেলের লাইফলাইন দখলের লড়াই

খার্গ দ্বীপ, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও তৃতীয় বিশ্বের ভবিষ্যৎ

হাবিব বাবুল

প্রকাশ : ১৬ মার্চ ২০২৬ ১৩:২৪ পিএম

ইরানের তেল রপ্তানির প্রধান কেন্দ্র খার্গ দ্বীপ। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

ইরানের তেল রপ্তানির প্রধান কেন্দ্র খার্গ দ্বীপ। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি বারবার প্রমাণ করেছেÑ এই অঞ্চলের কোনো সংঘাত কখনোই কেবল আঞ্চলিক থাকে না। বিশেষ করে যখন সেই সংঘাত জড়িয়ে পড়ে তেল, জ্বালানি রুট এবং বৈশ্বিক শক্তির প্রতিযোগিতার সঙ্গে, তখন তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে পুরো পৃথিবীতে। সাম্প্রতিক ইরান-মার্কিন উত্তেজনা এবং পারস্য উপসাগরকে ঘিরে সামরিক তৎপরতা আবারও সেই বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে।

ইরানের তেল রপ্তানির প্রধান কেন্দ্র খার্গ দ্বীপে মার্কিন হামলার খবর আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রশ্ন উঠছে এটি কি কেবল সামরিক চাপ সৃষ্টি করার কৌশল, নাকি মধ্যপ্রাচ্যের তেলের লাইফলাইনকে নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক পরিকল্পনার অংশ?

খার্গ দ্বীপ আকারে ছোটÑ মাত্র কয়েক মাইল দীর্ঘ একটি দ্বীপ। কিন্তু এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব অসামান্য। ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ তেল রপ্তানি এই দ্বীপ থেকেই পরিচালিত হয়। অর্থাৎ এটি কেবল একটি তেল টার্মিনাল নয়; বরং ইরানের অর্থনীতির কেন্দ্রীয় ধমনী। এই অবকাঠামোতে বড় ধরনের আঘাত মানে ইরানের অর্থনীতিকে সরাসরি চাপে ফেলা।

তবে বিষয়টি শুধু ইরানের অর্থনীতি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়। খার্গ দ্বীপকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা মূলত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। কারণ এখনও পর্যন্ত বিশ্বের শিল্প, পরিবহন ও কৃষি ব্যবস্থার বড় অংশ জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার ঘটলেও বাস্তবতা হলোÑ বিশ্ব অর্থনীতির চালিকাশক্তি এখনও তেল ও গ্যাস।

মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রতিদিন কোটি কোটি ব্যারেল তেল বিশ্ববাজারে প্রবেশ করে। এই সরবরাহ ব্যবস্থায় সামান্য বিঘ্ন ঘটলেও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়তে পারে। ইতিহাস দেখায়, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বা রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিলেই বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম অস্বাভাবিকভাবে ওঠানামা করতে শুরু করে।

খার্গ দ্বীপের কার্যক্রম ব্যাহত হলে সেই পরিস্থিতিই আবার তৈরি হতে পারে। ইরানের তেল রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেলে বিশ্ববাজারে সরবরাহের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। তখন তেলের দাম দ্রুত বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হবেÑ আর সেই চাপ শেষ পর্যন্ত এসে পড়বে বিশ্বের সাধারণ মানুষের ওপর।

এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ে উন্নয়নশীল বা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো। কারণ এসব দেশের অধিকাংশই তেল আমদানির ওপর নির্ভরশীল। তাদের বৈদেশিক মুদ্রার বড় অংশ ব্যয় হয় জ্বালানি আমদানিতে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লেই এসব দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দ্রুত কমতে থাকে।

বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল কিংবা আফ্রিকার বহু দেশ ইতোমধ্যেই অর্থনৈতিক চাপে রয়েছে। বৈদেশিক ঋণ, মুদ্রাস্ফীতি এবং রিজার্ভ সংকটÑ সব মিলিয়ে তাদের অর্থনীতি নাজুক অবস্থায় আছে। এই সময়ে তেলের দাম বড় আকারে বেড়ে গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। সরকারগুলোর সামনে তখন দুটি কঠিন সিদ্ধান্ত দাঁড়ায়Ñ ভর্তুকি বাড়ানো বা জ্বালানির দাম বাড়ানো। ভর্তুকি বাড়ালে বাজেট ঘাটতি বাড়ে, আর দাম বাড়ালে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যায়। দুই ক্ষেত্রেই সামাজিক চাপ বৃদ্ধি পায়।

তেলের দাম বৃদ্ধির আরেকটি গুরুতর প্রভাব পড়ে খাদ্য নিরাপত্তায়। কৃষি উৎপাদনের অনেক ধাপই জ্বালানিনির্ভরÑ সেচ ব্যবস্থা, সার উৎপাদন, পরিবহন সবকিছুতেই জ্বালানি লাগে। ফলে জ্বালানির দাম বাড়লে খাদ্যের দামও বাড়তে থাকে। উন্নয়নশীল দেশে যেখানে মানুষের আয়ের বড় অংশই খাদ্যে ব্যয় হয়, সেখানে এটি সামাজিক অস্থিরতার কারণ হতে পারে।

এই সংঘাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথের নিরাপত্তা। পারস্য উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। যদি এই রুটে সামরিক উত্তেজনা বাড়ে বা চলাচলে বাধা সৃষ্টি হয়, তাহলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। এর প্রভাব পড়বে শুধু তেলের দামে নয়; জাহাজ চলাচলের বীমা খরচ, পরিবহন ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সামগ্রিক ব্যয়ও বেড়ে যাবে। এতে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন চাপ তৈরি হবে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত লক্ষ্য নিয়ে নানা বিশ্লেষণ রয়েছে। অনেকের মতে, ইরানের তেল অবকাঠামো দুর্বল করে দিলে দেশটির অর্থনৈতিক সক্ষমতা কমে যাবে এবং আঞ্চলিক রাজনীতিতে তার প্রভাব সীমিত করা সম্ভব হবে। আবার অন্য বিশ্লেষকদের মতে, এমন পদক্ষেপ সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি বরাবরই জটিল। এখানে জ্বালানি সম্পদ, সামরিক শক্তি এবং আন্তর্জাতিক শক্তির স্বার্থ গভীরভাবে জড়িত। ফলে একটি সামরিক পদক্ষেপের প্রভাব কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা অর্থনীতি, কূটনীতি এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও ছড়িয়ে পড়ে।

বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতিও খুব স্থিতিশীল অবস্থায় নেই। মহামারির পরবর্তী পুনরুদ্ধার, বৈশ্বিক ঋণ সংকট, মুদ্রাস্ফীতি এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনাÑ সব মিলিয়ে বিশ্ব অর্থনীতি এখনও নাজুক অবস্থায় রয়েছে। এই সময়ে যদি বড় ধরনের জ্বালানি সংকট দেখা দেয়, তাহলে তা বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধিকে আরও ধীর করে দিতে পারে।

তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। তেলের দাম বাড়লে তাদের বাজেট ঘাটতি বাড়বে এবং নতুন ঋণের প্রয়োজন দেখা দেবে। ফলে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা আরও সংকুচিত হয়ে পড়তে পারে। এই প্রেক্ষাপটে একটি বড় প্রশ্ন সামনে আসেÑ জ্বালানি নিরাপত্তা কি আবারও বড় শক্তিগুলোর কৌশলগত প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে ফিরে যাচ্ছে? যদি তাই হয়, তবে তার প্রভাব আগামী কয়েক দশক ধরে বিশ্ব রাজনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে।

অন্যদিকে এই সংকট নবায়নযোগ্য জ্বালানির গুরুত্বও নতুন করে সামনে আনতে পারে। অনেক দেশ ইতোমধ্যেই সৌর ও বায়ুশক্তির দিকে ঝুঁকছে। জ্বালানি সরবরাহে ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি যত বাড়বে, বিকল্প জ্বালানির দিকে বিশ্ব তত দ্রুত এগিয়ে যেতে পারে। তবে বাস্তবতা হলোÑ এই পরিবর্তন একদিনে সম্ভব নয়। আগামী কয়েক দশক পর্যন্ত তেল ও গ্যাস বিশ্ব অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়েই থাকবে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো বড় সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।

খার্গ দ্বীপকে ঘিরে বর্তমান উত্তেজনা তাই কেবল একটি সাময়িক ঘটনা নয়। এটি বিশ্ব জ্বালানি রাজনীতি, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়নশীল বিশ্বের ভবিষ্যতের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।

শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হতে পারে সেই দেশগুলোকেই, যাদের এই সংঘাতে সরাসরি কোনো ভূমিকা নেইÑ তৃতীয় বিশ্বের সাধারণ মানুষকে। তাদের জন্য তেলের দাম বৃদ্ধি মানে শুধু জ্বালানি সংকট নয়; এটি খাদ্য, পরিবহন এবং জীবনযাত্রার প্রতিটি ক্ষেত্রে নতুন চাপের সূচনা।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ইতিহাস আমাদের একটি বিষয় বারবার মনে করিয়ে দেয়Ñ যুদ্ধের ময়দান যত দূরেই হোক, তার অর্থনৈতিক ঢেউ পৌঁছে যায় বিশ্বের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত। খার্গ দ্বীপকে ঘিরে বর্তমান উত্তেজনাও সেই বাস্তবতারই আরেকটি সতর্ক সংকেত।


হাবিব বাবুল

জার্মানিভিত্তিক সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা