নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি
আহসান হাবিব বরুন
প্রকাশ : ১৬ মার্চ ২০২৬ ১৩:১৯ পিএম
সরকারের গৃহীত গুরুত্বপূর্ণ তিনটি পদক্ষেপের অন্যতমÑ ফ্যামিলি কার্ড, যা সামাজিক নিরাপত্তার নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
অর্থনৈতিক চাপ, আইনশৃঙ্খলার চ্যালেঞ্জ এবং দীর্ঘদিনের সামাজিক সমস্যার মধ্যেও মানুষ একটি নতুন সম্ভাবনার বাংলাদেশ দেখতে চায়। সাধারণ মানুষের এই স্বপ্ন পূরণে একটি নিরাপদ, স্থিতিশীল ও মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্র গড়ে তুলতে চায় সরকার। এজন্য সরকারপ্রধান তারেক রহমান ইতোমধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বিশেষ করে সামাজিক নিরাপত্তা জোরদারে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি, অপরাধ দমনে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ স্বাভাবিক করতে চাঁদাবাজদের সুনির্দিষ্ট তালিকা তৈরির উদ্যোগÑ সব মিলিয়ে একটি স্বপ্নিল বাংলাদেশের যাত্রা বলেই মনে হচ্ছে। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকারের এমন আন্তরিক উদ্যোগ আগে খুব একটা দেখা যায়নি।
সরকারের গৃহীত গুরুত্বপূর্ণ তিনটি পদক্ষেপের অন্যতমÑ ফ্যামিলি কার্ড, যা সামাজিক নিরাপত্তার নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি প্রায়ই জনগণের কাছে আশার আলো জাগালেও অনেক ক্ষেত্রে তা বাস্তবে রূপ নিতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ তৈরি হয়েছেÑ নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বাস্তবায়নের পথে এগিয়েছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত সরকারের এই পদক্ষেপ অনেকের কাছে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের একটি শক্তিশালী বার্তা হিসেবে ধরা পড়েছে।
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির মূল লক্ষ্যÑ দেশের নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য একটি ন্যূনতম অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা। দ্রব্যমূল্যের চাপের মধ্যে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। সেই বাস্তবতায় এই উদ্যোগ তাদের জন্য একধরনের স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য ও পণ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে সহায়তা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হলে পরিবারগুলো দৈনন্দিন জীবনে কিছুটা হলেও স্থিতিশীলতা ফিরে পেতে পারে। এই কর্মসূচির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাষ্ট্রের সামাজিক দায়বদ্ধতার ধারণাকে শক্তিশালী করা। আধুনিক কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলোÑ অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়ানো। ফ্যামিলি কার্ড সেই দর্শনেরই প্রতিফলন হতে পারে, যদি এটি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সঙ্গে বাস্তবায়িত হয়।
বাংলাদেশে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সংখ্যা কম নয়, তবে অনেক ক্ষেত্রেই সঠিক সুবিধাভোগী নির্বাচন এবং স্বচ্ছ বণ্টনের প্রশ্ন সামনে আসে। ফলে এই কর্মসূচির সফলতা নির্ভর করবে প্রশাসনিক দক্ষতা ও সঠিক বাস্তবায়নের ওপর। যদি তা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে ফ্যামিলি কার্ড শুধু একটি সরকারি প্রকল্প নয়Ñ বরং এটি হতে পারে একটি মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতীক।
দ্বিতীয়তÑ সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান, যা নিরাপদ সমাজের ভিত্তি। একটি দেশের উন্নয়নের পথে সবচেয়ে বড় শর্তগুলোর একটি হলো নিরাপত্তা। নাগরিকরা যদি নিজেদের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন, তাহলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন কিংবা সামাজিক স্থিতিশীলতা কোনোটিই দীর্ঘস্থায়ী হয় না। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সন্ত্রাস ও সহিংসতা দীর্ঘদিন ধরে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে সরকার সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানকে গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটকে সক্রিয় করা হয়েছে এবং অপরাধী চক্রগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার বার্তা দেওয়া হয়েছে। এই ধরনের উদ্যোগ কেবল অপরাধ দমনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি সামাজিক আস্থা পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। যখন মানুষ দেখে যে রাষ্ট্র অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিচ্ছে, তখন তাদের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ বাড়ে। ব্যবসা-বাণিজ্যও তখন আরও স্বাভাবিক পরিবেশে পরিচালিত হতে পারে।
বাংলাদেশের শহর ও গ্রামÑ উভয় ক্ষেত্রেই নিরাপত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ছোটখাটো অপরাধ থেকে শুরু করে সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডÑ সবই সাধারণ মানুষের জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান যদি ধারাবাহিকভাবে পরিচালিত হয় এবং আইনের শাসনের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, তাহলে তা দেশের সামাজিক স্থিতিশীলতাকে আরও শক্তিশালী করবে। এতে কোনো সন্দেহ নেই।
নিরাপদ সমাজ কেবল পুলিশের উপস্থিতির মাধ্যমে তৈরি হয় না; বরং এর জন্য প্রয়োজন একটি সুসংগঠিত রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং অপরাধের বিরুদ্ধে স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান। সেই অবস্থান যদি দৃঢ়ভাবে বজায় থাকে, তাহলে বাংলাদেশের উন্নয়নের পথ আরও মসৃণ হতে পারে।
তৃতীয়তÑ চাঁদাবাজদের তালিকা সংগ্রহ, যা আমাদের অর্থনৈতিক মুক্তির লড়াই হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে যে সমস্যাটি বারবার সামনে এসেছে, তার মধ্যে অন্যতম চাঁদাবাজি। ছোট দোকান, ফুটপাতের ব্যবসা, পরিবহন খাত কিংবা বড় বাজারÑ অনেক ক্ষেত্রেই চাঁদাবাজির কারণে উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত চাপের মুখে পড়েন। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে সরকার চাঁদাবাজদের সুনির্দিষ্ট তালিকা সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা তথ্য সংগ্রহে মাঠে নেমেছে। এর মধ্যে রয়েছে ডিজিএফআই, এনএসআই এবং পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট। তাদের কাজ হচ্ছেÑ চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা এবং নেপথ্যের গডফাদারদের চিহ্নিত করা।
বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক স্পষ্টভাবে বলেছেনÑ চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’। এই ঘোষণা শুধু প্রশাসনিক নির্দেশনা নয়; বরং এটি একটি শক্তিশালী বার্তা যে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে রাষ্ট্র প্রস্তুত। চাঁদাবাজি বন্ধ হলে তার প্রভাব কেবল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে দেশের অর্থনৈতিক পরিবেশ। ব্যবসায়ীরা যদি চাঁদাবাজির ভয় থেকে মুক্ত হন, তাহলে বিনিয়োগ বাড়বে, বাজারে পণ্যের দাম স্থিতিশীল থাকবে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে। বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় একটি অংশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ওপর নির্ভরশীল। এই উদ্যোক্তারা যদি নিরাপদ পরিবেশে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন, তাহলে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতি আরও দ্রুত হতে পারে।
ফ্যামিলি কার্ড, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান এবং চাঁদাবাজদের তালিকা সংগ্রহÑ এই তিনটি উদ্যোগকে যদি একসঙ্গে দেখা যায়, তাহলে একটি বৃহত্তর রাষ্ট্রদর্শনের চিত্র স্পষ্ট হয়। এটি এমন একটি রাষ্ট্র গঠনের প্রচেষ্টা, যেখানে সামাজিক নিরাপত্তা, নাগরিক নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতাÑ এই তিনটি বিষয় সমান গুরুত্ব পায়। বাংলাদেশের মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন একটি নিরাপদ, ন্যায়ভিত্তিক এবং সম্ভাবনাময় রাষ্ট্র। যদি সরকারের এই উদ্যোগগুলো ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং সুশাসনের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, তাহলে সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিতে পারে। সুতরাং প্রিয় বাংলাদেশের স্বপ্নিল যাত্রা সফল হোকÑ এমনটিই সকলের প্রত্যাশা।
আহসান হাবিব বরুন
সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক