আধিপত্যবাদের নগ্নরূপ
ড. মাহরুফ চৌধুরী
প্রকাশ : ১৫ মার্চ ২০২৬ ০৯:৩৯ এএম
ড. মাহরুফ চৌধুরী, ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
আধুনিক বিশ্বব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘ সনদ ও মানবাধিকারের নীতিকে সামনে রেখে নিজেকে এক ‘সভ্যতার অগ্রযাত্রার ধারক’ হিসেবে উপস্থাপন করে আসছে। ১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠিত জাতিসংঘের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল শক্তির বদলে ন্যায়ের ভিত্তিতে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা, সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান এবং বিশ্বব্যাপী রাষ্ট্রীয় আগ্রাসন রোধ। একইভাবে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার প্রধান অভিভাবক হিসেবে কাজ করার কথা। কিন্তু বাস্তবতার আলোকে প্রশ্ন জাগে এই বিশ্বব্যবস্থা কি আদৌ ন্যায় ও নীতির ভিত্তিতে পরিচালিত, নাকি শক্তির রাজনীতিই এর প্রকৃত নিয়ন্ত্রক?
মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক উত্তেজনা এবং ইরানকে ঘিরে পশ্চিমা শক্তির কৌশলগত আগ্রাসন সেই প্রশ্নকে নতুন তীব্রতায় সামনে নিয়ে এসেছে। আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি, জ্বালানি সম্পদের নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা-আশঙ্কার ভাষ্য এবং গণতন্ত্র রক্ষার বুলি এসবের সমন্বয়ে এমন এক বয়ান নির্মিত হয়েছে, যা বাহ্যত নৈতিকতার দাবিদার হলেও গভীরে অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রাধান্য বিস্তারের নানা কলাকৌশল ব্যবহৃত হয়ে আসছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় এটি ‘হেজিমনি’ বা আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া, যেখানে প্রভাবশালী শক্তি কেবল সামরিক বলেই নয়, বরং কূটনৈতিক চাপ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ন্ত্রণ এবং মতাদর্শিক প্রচারণার মাধ্যমে অন্য রাষ্ট্রের নীতি ও সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। এর ফলে আন্তর্জাতিক আইন ও সার্বভৌমত্বের নীতিমালা ধীরে ধীরে শক্তিধর রাষ্ট্রের সুবিধামতো ব্যাখ্যা করা হতে থাকে আর সেখানেই উন্মোচিত হয় আধিপত্যবাদের নগ্নরূপ, যা কেবল একটি দেশের জন্য নয়, গোটা মানবসভ্যতার নৈতিক ভিত্তির জন্যও গভীর সংকটের ইঙ্গিত বহন করে।

ইরানের ওপর পারমাণবিক শক্তি অর্জনের অজুহাতে চাপ প্রয়োগের বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার-রোধের নীতি থাকলেও বাস্তবে তা প্রায়ই দ্বৈত মানদণ্ডের শিকার। একদিকে কিছু রাষ্ট্রের পারমাণবিক সক্ষমতা ‘নিরাপত্তার নিশ্চয়তা’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়, অন্যদিকে অন্য রাষ্ট্রের একই আকাঙ্ক্ষা ‘আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা’ এবং ‘বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা’র জন্য হুমকি হিসেবে চিত্রিত হয়। এই দ্বৈত মানদণ্ড আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। বাস্তবতায় অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য হলো আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য এমনভাবে পুনর্গঠন করা, যাতে মধ্যপ্রাচ্যসহ মুসলিম বিশ্বের ওপর ইসরায়েল তার একক সামরিক ও কৌশলগত প্রাধান্য অক্ষুণ্ন রাখতে পারে। উদ্বেগের বিষয়, ‘জোর যার, মুল্লুক তার’ এই নীতিই যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালনার অঘোষিত ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়, তবে বিশ্ব মোড়ল হিসেবে তার সভ্যতার ধারক ও বাহক হওয়ার নৈতিক দাবি অনিবার্যভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
ইরান জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রতিরক্ষা গবেষণা ও সমরপ্রযুক্তিতে যে আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনের পথে এগিয়েছে, তা নিছক প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নয়; বরং চলমান বিশ্বব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করে একটি রাজনৈতিক বার্তা যে, নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জনই আধিপত্য মোকাবিলার কৌশল। দীর্ঘমেয়াদি অবরোধ ও অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেও কোনো রাষ্ট্র যদি নিজস্ব মানবসম্পদ, গবেষণা অবকাঠামো ও কৌশলগত প্রযুক্তি উন্নয়নে সাফল্য দেখায়, তবে তা বিদ্যমান আধিপত্যবাদী কাঠামোর বিরুদ্ধে এক ধরনের বৈপ্লবিক দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের নির্ভরতা তত্ত্ব (ডিপেন্ডেন্সি থিওরি) বলছে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামো এমনভাবে নির্মিত যে প্রান্তিক রাষ্ট্রগুলো বিশ্বব্যবস্থার কেন্দ্রের শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর ওপর নির্ভরশীল থাকবে। সেই নির্ভরতার শৃঙ্খল ভাঙার চেষ্টা স্বাভাবিকভাবেই প্রভাবশালী শক্তির অস্বস্তির কারণ হয়। পশ্চিমা শক্তিগুলোর উদ্বেগের পেছনে কেবল সামরিক হিসাব নয়, বরং ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যের প্রশ্নও জড়িত। একটি রাষ্ট্র যখন নিজস্ব প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি করে, তখন তা কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন অর্জন করে অর্থাৎ তার নীতিনির্ধারণে বাইরের চাপ কম কার্যকর হয়। ফলে প্রচার-প্রপাগান্ডা, অর্থনৈতিক অবরোধ, আর্থিক লেনদেনে প্রতিবন্ধকতা এবং কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার মাধ্যমে ইরানকে দুর্বল করার দীর্ঘ প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
সমালোচকদের মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল-ঘনিষ্ঠ জোটের অংশীদাররা এখন ইরানের শাসকগোষ্ঠীকে অস্থিতিশীল বা ক্ষমতাচ্যুত করার সম্ভাব্য পথ খুঁজছে, যাতে রাষ্ট্র হিসেবে ইরানের কৌশলগত সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। ইতিহাসে আমরা দেখেছি, শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের প্রচেষ্টা (রেজিম চেইঞ্জ) প্রায়ই আঞ্চলিক অস্থিরতা, রাষ্ট্রে অভ্যন্তরীণ সংঘাত ও দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে, যার মূল্য পরিশোধ করতে হয় দেশটির সাধারণ জনগণকে।
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন পুতুল সরকারকে কবজায় রেখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাববলয় সেখানে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসেছে। এটা কোনো নতুন অভিযোগ নয়; পুরাতন ভূ-রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ। শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বে কৌশলগত ঘাঁটি, জ্বালানি নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষার নামে যে সামরিক ও কূটনৈতিক উপস্থিতি এ অঞ্চলসহ বিশ্বের অনেক জায়গায়ই গড়ে তোলা হয়েছে, তা অনেক বিশ্লেষকের চোখে ‘নিরাপত্তা স্থাপত্য’ নয়, বরং আধিপত্যের অবকাঠামো। এই প্রেক্ষাপটে ইরাক, লিবিয়া বা আফগানিস্তানে শাসক বদলানোর ‘রেজিম চেইঞ্জ’ অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে আলোচিত। এসব দেশে সামরিক শক্তির জোরে শাসক পরিবর্তন করা হলেও টেকসই গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি; বরং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভাঙন, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-সংঘাত, জঙ্গিবাদ ও দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা বিস্তার লাভ করেছে। রাজনৈতিক সমাজতত্ত্ব আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, গণতন্ত্র কেবল নির্বাচন আয়োজনের নাম নয়; এর জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন, সামাজিক ব্যবস্থায় আস্থা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিকাশ।
বাস্তবতা হলো, বাইরের শক্তির সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত সরকারগুলো প্রায়ই নীতিনির্ধারণে ও কর্মকাণ্ড পরিচালনায় স্বায়ত্তশাসন হারায় এবং কৌশলগতভাবে পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ফলে বাইরের শক্তির প্ররোচনায়, নির্দেশনায় ও নিয়ন্ত্রণে শাসন কাজ পরিচালনা করে। সমালোচকদের ভাষায়, এতে সার্বভৌম রাষ্ট্রের নেতৃত্ব ‘অনুগত অংশীদার’ থেকে ক্রমে ‘সেবাদাস’ চরিত্রে রূপ নেয়। আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতি অন্য রাষ্ট্রের ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা’র অঙ্গীকার এই প্রক্রিয়ায় দুর্বল হয়ে পড়ে। এমন প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যে ‘শান্তি’ বা ‘স্থিতিশীলতা’ প্রতিষ্ঠার নামে নতুন কৌশল গ্রহণের কথাও সামনে এসেছে। সমালোচকেরা অভিযোগ করেন, কিছু উদ্যোগ বাস্তবে শান্তির চেয়ে নির্দিষ্ট ভূ-রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা, বিশেষত ইসরায়েলকেন্দ্রিক নিরাপত্তা বলয় বিস্তারের মাধ্যমে যায়েনবাদী স্বপ্ন পূরণে বেশি মনোযোগী।
ইতিহাস বলছে, বিশেষ কোনো রাষ্ট্রজোটের শক্তির বলয়ে আবদ্ধ কৃত্রিম স্থিতিশীলতা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয় না। যখন একটি রাষ্ট্রের উন্নয়নে পরিকল্পনায় জনগণের অংশগ্রহণ, ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক সাম্য উপেক্ষিত থাকে, তখন বাহ্যিকভাবে প্রতিষ্ঠিত শাসনব্যবস্থা ভেতর থেকে দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে সামরিক আধিপত্য হয়তো স্বল্পমেয়াদে প্রভাব বিস্তার করতে পারে, কিন্তু তা কোনো অঞ্চলের রাজনৈতিক আত্মনির্ধারণ বা স্থায়ী শান্তির নিশ্চয়তা দিতে পারে না। বরং এই প্রক্রিয়া সভ্যতার নৈতিক ভিত্তিকেই আরও ক্ষয়িষ্ণু করে তোলে।
অতএব সভ্যতার প্রকৃত অগ্রযাত্রা নির্ভর করে মানবিক মূল্যবোধের লালন ও বিস্তারের ওপর। ন্যায়বিচার, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক সম্মান যদি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও রাষ্ট্রীয় রীতিনীতির কেন্দ্রে স্থান না পায়, তবে উন্নয়নের বাহ্যিক চাকচিক্য টেকসই হবে না। শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষমতার উল্লাস যতই উচ্চকিত হোক, ক্ষমতার নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হলে সভ্যতা সামনে এগোয় না; বরং ইতিহাসের বহু উদাহরণের মতোই একসময় মুখ থুবড়ে পড়ে।
আমাদের জন্য ইতিহাসের শিক্ষা সুস্পষ্ট যে, কোনো রাষ্ট্র, জোট বা সাম্রাজ্যের শক্তি চিরন্তন নয়। প্রাচীন সাম্রাজ্য থেকে আধুনিক পরাশক্তি সবাই সময়ের পরীক্ষায় পরিবর্তিত ও ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। শক্তির কেন্দ্র স্থানান্তরিত হয়েছে, কিন্তু ন্যায় ও মানবিকতার প্রশ্ন অম্লান থেকেছে। রাজনৈতিক দর্শনের আলোচনায় মার্কিন চিন্তক জন রলসের (১৯২১-২০০২) ‘ন্যায়ভিত্তিক সমাজ’ ধারণা কিংবা জার্মান চিন্তক ইমানুয়েল কান্টের (১৭২৪-১৮০৪) ‘চিরস্থায়ী শান্তি’র স্বপ্ন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় টেকসই শান্তি কেবল সামরিক ভারসাম্যে নয়, বরং ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে। অতএব ন্যায়ভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলার দায় কোনো একক রাষ্ট্রের নয়; এটি সমগ্র মানবজাতির নৈতিক দায়িত্ব। নাগরিক সমাজ, বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও দায়িত্বশীল রাষ্ট্রসমূহ সবার সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এই অবক্ষয়িত বিশ্বব্যবস্থার পুনর্গঠন সম্ভব নয়। অন্যথায় শক্তির উন্মত্ততা ও প্রতিশোধের চক্র মানবসভ্যতাকে এমন এক অন্ধকার যুগে ঠেলে দিতে পারে, যেখানে নীতি-নৈতিকতা ইতিহাসের পাতায় বন্দি স্মারকে পরিণত হবে। সভ্যতার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে বিশ্ব-নাগরিক হিসেবে আমরা কোন পথ অনুসরণ করছিÑ ভয় ও আধিপত্যের, নাকি ন্যায় ও সহমর্মিতার।
ড. মাহরুফ চৌধুরী
ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য