রক্তাক্ত মানচিত্র
শাহাব উদ্দিন মাহমুদ
প্রকাশ : ১৫ মার্চ ২০২৬ ০৯:৩২ এএম
আকাশপথে চলা নিরবচ্ছিন্ন হামলার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের জনপদগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছে।
২০২৬ সালের মার্চ মাস। বিশ্ব-রাজনীতি আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে একটি ভুল পদক্ষেপ ডেকে আনতে পারে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পদধ্বনি। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান এবং আমেরিকা-ইসরায়েল জোটের মধ্যকার সরাসরি সংঘাত কেবল একটি আঞ্চলিক লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন বৈশ্বিক পরাশক্তিদের দাবার চালে পরিণত হয়েছে। এই জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির ঠিক পাশেই অবস্থিত পাকিস্তান আজ তার ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন ‘অগ্নিপরীক্ষার’ সম্মুখীন। একদিকে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক দেউলিয়াপনা, অন্যদিকে আফগান সীমান্তে ‘উন্মুক্ত যুদ্ধ’Ñ এই দ্বিমুখী সংকটের মাঝে চীন, রাশিয়া এবং ভারতের ভূমিকা পাকিস্তানের ভবিষ্যৎকে এক নতুন সমীকরণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি আর কেবল ছায়াযুদ্ধের মধ্যে নেই। ২০২৬ সালের শুরু থেকে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র বিনিময় এবং আমেরিকার অত্যাধুনিক নৌবহরের উপস্থিতি এই অঞ্চলকে রণক্ষেত্রে পরিণত করেছে। ইরান ও ইসরায়েল দীর্ঘদিনের ‘ছায়াযুদ্ধ’ ভেঙে এখন সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় লিপ্ত। ইসরায়েল ইরানের কৌশলগত তেল শোধনাগার এবং পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করায় ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি এবং ইরাকের মিলিশিয়ারা একযোগে ইসরায়েল ও এই অঞ্চলে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালাচ্ছে। ইরান তার ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ ব্যবহার করে লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল প্রায় অচল করে দিয়েছে। এর ফলে বিশ্ব সরবরাহ লাইন ভেঙে পড়েছে, যার প্রভাব পড়ছে দক্ষিণ এশিয়ার বাজারেও। এর ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে বহু আগে, যা পাকিস্তানের মতো আমদানি-নির্ভর অর্থনীতির জন্য এক মারণফাঁদ।
আকাশপথে চলা নিরবচ্ছিন্ন হামলার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের জনপদগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছে। কয়েক মিলিয়ন মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে ইউরোপ ও এশিয়ার দিকে পাড়ি জমাচ্ছে, যা এক নজিরবিহীন শরণার্থী সংকট তৈরি করেছে।
পাকিস্তানের চিরস্থায়ী বন্ধু চীন এই সংকটে এক অত্যন্ত সতর্ক কিন্তু প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করছে। পাকিস্তান যখন জ্বালানি সংকটে ধুঁকছে, তখন চীন সিপেক প্রকল্পের মাধ্যমে পাকিস্তানের অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ খাতকে সচল রাখার চেষ্টা করছে। তবে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধে চীনের কৌশল হলো ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে সমর্থন দেওয়া, যাতে আমেরিকার একক আধিপত্য খর্ব হয়। চীন মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য ‘নীরব কূটনীতি’র ওপর জোর দিচ্ছে। বেইজিং চায় না এই যুদ্ধ তাদের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর পথকে বাধাগ্রস্ত করুক। পাকিস্তানের জন্য চীনের এই ভূমিকা একাধারে স্বস্তির ও চাপের।
ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়া এখন মধ্যপ্রাচ্যে তার প্রভাব পুনরুদ্ধারে মরিয়া। মস্কো বর্তমানে ইরানকে উন্নত রাডার ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ করছে, যা আমেরিকা-ইসরায়েল জোটের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। পাকিস্তান রাশিয়ার সঙ্গেও সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করছে, বিশেষ করে সস্তায় জ্বালানি আমদানির জন্য। রাশিয়া চায় দক্ষিণ এশিয়ায় একটি স্থিতিশীল পরিবেশ থাকুক, যাতে তারা তাদের জ্বালানি রপ্তানির নতুন বাজার তৈরি করতে পারে। তবে পাকিস্তান যদি সরাসরি আমেরিকা ব্লকে ঝুঁকে পড়ে, তবে রাশিয়ার সঙ্গে ইসলামাবাদের দূরত্ব বাড়তে পারে।
দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান শক্তি ভারত এই সংকটে এক অত্যন্ত কৌশলী অবস্থান নিয়েছে। ভারত একদিকে ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বজায় রাখছে, অন্যদিকে ইরানের চাবাহার বন্দরের মাধ্যমে মধ্য এশিয়ায় প্রবেশের পথ খোলা রাখতে চায়। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় পাকিস্তান যখন কোণঠাসা, ভারত তখন নিজেকে বিশ্বের ‘স্থিতিশীল উৎপাদন কেন্দ্র’ হিসেবে তুলে ধরছে। আফগান সীমান্তে পাকিস্তানের ব্যস্ততা এবং অর্থনৈতিক সংকটকে ভারত তার নিরাপত্তা কৌশলের অংশ হিসেবে পর্যবেক্ষণ করছে। ভারতের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক শক্তি পাকিস্তানকে আঞ্চলিক রাজনীতিতে আরও বেশি প্রান্তিক করে তুলছে।
পাকিস্তানের বর্তমান অবস্থা ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’-এর মতো। তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে পাকিস্তানে মূল্যস্ফীতি আকাশচুম্বী। মাসিক জ্বালানি আমদানি ব্যয় ৬০০ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোয় দেশটিতে জরুরি অবস্থা বিরাজ করছে। গেল ফেব্রুয়ারি থেকে আফগানিস্তানের সঙ্গে শুরু হওয়া ‘উন্মুক্ত যুদ্ধ’ পাকিস্তানের সামরিক সক্ষমতাকে খাদের কিনারায় নিয়ে গেছে। তালেবানদের সঙ্গে এই সংঘাত পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। ২০২৫ সালের সৌদি-পাকিস্তান প্রতিরক্ষা চুক্তির কারণে পাকিস্তান এখন এক কূটনৈতিক সংকটে রয়েছে। ইরানের প্রতিবেশী হয়েও সৌদি আরবকে রক্ষার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা পাকিস্তানের জন্য এক অসম্ভব জ্যামিতিক সমীকরণ।
এই বহুমুখী সংকটের প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি। ইরান যদি কোণঠাসা হয়ে পড়ে, তবে তারা তাদের পারমাণবিক কর্মসূচিকে চূড়ান্ত রূপ দিয়ে পাল্টা আঘাতের হুমকি দিতে পারে। এটি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে পারমাণবিক প্রতিযোগিতার জন্ম দেবে। এই যুদ্ধ বিশ্বকে দুটি ব্লকে ভাগ করে দিচ্ছে। একদিকে আমেরিকা-ইউরোপ-ইসরায়েল, অন্যদিকে ইরান-রাশিয়া-চীন। রাশিয়া ও চীনের সরাসরি হস্তক্ষেপ পরিস্থিতিকে ‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের’ দিকে ঠেলে দেওয়ার প্রবল ঝুঁকি তৈরি করছে। দীর্ঘমেয়াদি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং তেল স্থাপনা থেকে নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়া ও রাসায়নিকের ফলে এই অঞ্চলের জলবায়ু ও জনস্বাস্থ্য অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। এতে দক্ষিণ এশিয়া এক নতুন মেরুকরণের দিকে এগোচ্ছে, যেখানে চীন-রাশিয়া ব্লক এবং আমেরিকা-ভারত-ইসরায়েল ব্লকের মধ্যে পাকিস্তান এক দোদুল্যমান রাষ্ট্র।
উত্তরণের পথ কী? পাকিস্তানের জন্য এবারের অগ্নিপরীক্ষা কেবল টিকে থাকার নয়, বরং নিজের অস্তিত্ব রক্ষার। চীন ও রাশিয়ার সমর্থন যেমন প্রয়োজন, তেমনি আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করাও পাকিস্তানের জন্য আত্মঘাতী হবে। পাকিস্তানের নেতৃত্বকে এখন এমন এক ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি গ্রহণ করতে হবে, যা একদিকে দেশের অর্থনীতিকে বাঁচাবে এবং অন্যদিকে আঞ্চলিক যুদ্ধের দাবানল থেকে দেশকে দূরে রাখবে।
পাকিস্তানের এই সংকটে আইএমএফ ও চীনের ঋণসহায়তা কি পাকিস্তানের ভেঙে পড়া অর্থনীতিকে শেষ পর্যন্ত রক্ষা করতে পারবে, নাকি রাজনৈতিক অস্থিরতা দেশটিকে আরও বড় বিপদের দিকে নিয়ে যাবে?
শাহাব উদ্দিন মাহমুদ
শিক্ষাবিদ ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক