× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বিএনপির ম্যান্ডেট এবং আগামীর রূপরেখা

আবু জুবায়ের

প্রকাশ : ১৫ মার্চ ২০২৬ ০৯:২৮ এএম

বিএনপির সর্বশেষ নির্বাচনি জনসভায় হাজার হাজার মানুষের সমাগম। ফাইল ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

বিএনপির সর্বশেষ নির্বাচনি জনসভায় হাজার হাজার মানুষের সমাগম। ফাইল ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

১২ মার্চ, ২০২৬। শেরেবাংলা নগরের জাতীয় সংসদ ভবনের স্থপতি লুই আই কানের নকশা করা সেই চিরচেনা গম্বুজের নিচে আজ যা ঘটল, তা কেবল ক্ষমতার সাধারণ হাতবদল নয়। এটি দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী অন্ধকারের পর জাতির আলোর দিশা খুঁজে পাওয়ার দিন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থান যে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা তৈরি করেছিল, ব্যালট পেপারের মাধ্যমে দেশের আপামর জনসাধারণ সেই আকাঙ্ক্ষার চূড়ান্ত আইনি ও রাজনৈতিক বৈধতা প্রদান করেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন কেবল একটি দলের বিজয় নয়, বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামো পুনর্গঠনে জনগণের আস্থার ঐতিহাসিক রায়।

রাজনৈতিক ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, যখনই এই বদ্বীপে গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ করা হয়েছে, সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়েছে কিংবা অর্থনীতি খাদের কিনারায় পৌঁছেছে, তখনই বিএনপি ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিএনপি বরাবরই গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সমার্থক একটি নাম। বর্তমান বিজয়কে বুঝতে হলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে অতীতের দিকে, যেখানে বার বার ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখির মতো উড়ে দাঁড়িয়েছে এই দলটি :

১. প্রথম পুনরুদ্ধার (বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তন)

১৯৭৫ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশের সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে যখন একদলীয় শাসনব্যবস্থা (বাকশাল) কায়েম করা হয়েছিল, তখন জাতির বাকস্বাধীনতা ও রাজনৈতিক অধিকার সম্পূর্ণ ভূলুণ্ঠিত হয়। সেই শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা থেকে জাতিকে মুক্ত করে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রবর্তন করেছিলেন। রাজনীতিতে ফিরে এসেছিল ভিন্নমতের অধিকার। 

২. দ্বিতীয় পুনরুদ্ধার (সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা)

আশির দশকের সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ৯ বছরের আপসহীন সংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতৃত্ব দিয়েছিলেন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। ১৯৮৬ সালের প্রহসনের নির্বাচন বয়কট করে তিনি যে আপসহীনতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, তারই চূড়ান্ত ফল ছিল ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান। ১৯৯১ সালের অবাধ নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করে এবং সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে পুনরায় সংসদীয় গণতন্ত্র বা প্রধানমন্ত্রী শাসিত সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করে। সংসদ ফিরে পায় তার হারানো গৌরব।

৩. তৃতীয় পুনরুদ্ধার (ফ্যাসিবাদ-পরবর্তী পুনর্গঠন)

২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ পনেরো বছর দেশ এক নজিরবিহীন ‘হাইব্রিড রেজিম’ বা মিশ্র স্বৈরতন্ত্রের কবলে ছিল। গুম, খুন, মানবাধিকার লঙ্ঘন, আয়নাঘর এবং নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেওয়ার মাধ্যমে যে প্রাতিষ্ঠানিক ধ্বংসস্তূপ তৈরি হয়েছিল, তার ওপর দাঁড়িয়ে আজ তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি পুনরায় রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে। 

ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম ভাষণটি ছিল রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও পরিপক্বতার এক অনবদ্য দলিল। দীর্ঘ সতেরো বছর তিনি দেশের বাইরে নির্বাসিত ছিলেন। তিনি সংসদে দাঁড়িয়ে যখন বলেন, এই সংসদ হবে ‘যুক্তিতর্ক এবং জাতীয় সমস্যা সমাধানের মূল কেন্দ্র’, তখন তা স্পষ্টতই প্রমাণ করে যে, বিএনপি অতীতের সংঘাতময় রাজনীতির বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গঠনমূলক সংসদীয় রীতির সূচনা করতে বদ্ধপরিকর। এত নিপীড়নের শিকার হয়েও ক্ষমতায় এসে বিরোধী দল দমনের পুরনো পথে না হেঁটে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ এবং অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার যে ডাক তারেক রহমান দিয়েছেন, তা এক দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়কেরই প্রতিচ্ছবি। 

প্রথমত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউরোপ পুনর্গঠনের জন্য, অথবা ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে যেমন শক্তিশালী ও স্থিতিশীল সরকার প্রয়োজন ছিল, আজকের বাংলাদেশের পরিস্থিতি তার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। ৫২.৫ বিলিয়ন ডলারের খেলাপি ঋণ, ৫ শতাংশের নিচে নেমে যাওয়া প্রবৃদ্ধি এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত বিচার, প্রশাসন ও পুলিশ ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হলে সংসদে একটি শক্তিশালী, ঐক্যবদ্ধ ও একক সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী শক্তির প্রয়োজন। 

দ্বিতীয়ত, বিগত সরকারের সময়ে তৈরি হওয়া প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষতগুলো সারাতে এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রেখে যাওয়া ১৩৩টি অত্যন্ত সংবেদনশীল অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই করে আইনে পরিণত করতে বিএনপির এই নিরঙ্কুশ ম্যান্ডেট একটি রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে সাংবিধানিক গণভোটে ‘জুলাই সনদ’ পাস হলেও, এর একটি বড় প্রস্তাবনা আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব নিয়ে বিএনপির আপত্তির জায়গাটি সম্পূর্ণ ইতিহাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও যুক্তিনির্ভর।

বিএনপি এই ব্যবস্থার বিরোধিতা করে মূলত দেশের শাসনতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা এবং স্থানীয় প্রান্তিক ভোটারদের অধিকারকেই সমুন্নত রেখেছে। একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি ও বহুমুখী ভূ-রাজনৈতিক চাপের মধ্যে থাকা বাংলাদেশের পক্ষে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের নামে রাজনৈতিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানোর মতো বিলাসিতা এই মুহূর্তে ভয়ংকর আত্মঘাতী হতে পারে।

অতীতের সংসদগুলোতে (বিশেষ করে ২০১৪-২০২৪ মেয়াদে) আমরা দেখেছি স্পিকাররা কীভাবে ক্ষমতাসীন দলের রাবার-স্ট্যাম্প বা দলীয় কর্মীর মতো কাজ করেছেন। বিরোধী দলের মাইক বন্ধ করে দেওয়া বা কথা বলতে না দেওয়ার অপসংস্কৃতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছিল। কিন্তু ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম দিনেই নবনির্বাচিত স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ দলীয় সর্বোচ্চ পদ (বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য) থেকে পদত্যাগ করে নিরপেক্ষতার যে ধ্রুপদী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা বিএনপির রাজনৈতিক সদিচ্ছার এবং উদারতার এক অনন্য প্রমাণ। তিনি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ । এটি কেবল স্পিকারের ব্যক্তিগত অবস্থান নয়, এটি তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপির নতুন রাজনৈতিক দর্শনেরই সুস্পষ্ট প্রতিফলন, যেখানে দলের চেয়ে রাষ্ট্র অনেক বড়।

বাংলাদেশ আজ এক ঐতিহাসিক ও বিপজ্জনক অর্থনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে ২০২৬ সালের শেষে এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জ (যার ফলে রপ্তানি খাতে শুল্কমুক্ত সুবিধা বাতিল হবে), অন্যদিকে চরম মূল্যস্ফীতি ও আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা। এই অবস্থায় কেবল আবেগ বা স্লোগান দিয়ে রাষ্ট্র চলে না; প্রয়োজন প্রশাসনিক দক্ষতা, দেশপ্রেম এবং শক্তিশালী জনসমর্থন।

বিএনপির ইতিহাস হলো অর্থনৈতিক সংকটের ছাইভস্ম থেকে অর্থনীতিকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করানোর ইতিহাস।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশে ভ্যাট (VAT) ব্যবস্থা প্রবর্তন করে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি। অবৈতনিক নারী শিক্ষা চালু করে সামাজিক বিপ্লব। মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রসার এবং গার্মেন্টস শিল্পের অভাবনীয় বিকাশ। ২০০১-২০০৬ মেয়াদে টেলিকম খাতের বিপ্লব এবং প্লাস্টিক, ফার্মাসিউটিক্যালস খাতের যে ভিত্তি বিএনপি সরকার গড়ে দিয়েছিল, তার সুফল জাতি আজও ভোগ করছে।

সেই অভিজ্ঞতাই আজ দেশের সবচেয়ে বড় ভরসা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বর্তমান ৪৫০ বিলিয়ন ডলার থেকে দ্বিগুণ করে এক ট্রিলিয়ন (এক লাখ কোটি) ডলারে উন্নীত করার যে রূপরেখা দিয়েছেন, এই বিপুল জনসমর্থন এবং সংসদে ২০৯ আসনের শক্তিশালী ম্যান্ডেট সেই লক্ষ্য অর্জনের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে।

ত্রয়োদশ সংসদ কেবল আইন প্রণয়নের জায়গা নয়; এটি একটি জাতির পুনর্জন্মের সূতিকাগার। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে বিএনপি আজ যে জায়গায় দাঁড়িয়েছে, তা কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতার মসনদ নয়, লাখো শহীদের রক্তের প্রতি দায়বদ্ধতার এক পবিত্র বেদি। অতীত ইতিহাস স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, বিএনপি কেবল একটি গতানুগতিক রাজনৈতিক দল নয়, বাংলাদেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা, সার্বভৌমত্ব, বহুদলীয় গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক মুক্তির সবচেয়ে বড় এবং পরীক্ষিত পাহারাদার।

আগামীর দিনগুলো কণ্টকাকীর্ণ হতে পারে, ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ কঠিন হতে পারে, কিন্তু একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি এবং একটি শক্তিশালী ও ভিশনারি রাজনৈতিক নেতৃত্বের সমন্বয়ে বাংলাদেশ এই গভীর খাদ থেকে উঠে আসবেই, ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম দিনটি সেই আত্মবিশ্বাসেরই এক উজ্জ্বল স্বাক্ষর।


আবু জুবায়ের 

কবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা