নদ-নদী ড্রেজিং
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১৪ মার্চ ২০২৬ ১০:০১ এএম
নদীমেখলা দেশ আমাদের। নদীকেন্দ্রিক সভ্যতা বাংলাদেশের। নদী আমাদের অস্তিত্বের অংশ। নদীর প্রবাহ আমাদের জীবনপ্রবাহের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তাই নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ রাখতে, নদী বাঁচাতে ড্রেজিং অপরিহার্য। সহজ করে বললেÑ দেশের অর্থনীতি, কৃষি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে নদীর সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। পদ্মা, মেঘনা, যমুনাসহ অসংখ্য ছোট-বড় নদী এদেশের প্রাণপ্রবাহ। কিন্তু দুঃখজনক সত্য হলো, নানাবিধ কারণে দেশের অধিকাংশ নদনদী আজ ভরাট হয়ে যাচ্ছে, নাব্য হারাচ্ছে এবং স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। ফলে নদী রক্ষা ও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে নিয়মিত ও পরিকল্পিত খনন এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এমন
এক বাস্তবতায়, ১৩ মার্চ প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘ড্রেজিংয়ে প্রাণ ফিরছে ধরলায়’ শীর্ষক
আশা জাগানিয়া প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, ধরলা নদীতে চলমান ড্রেজিং কার্যক্রমে ইতিবাচক
পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। নদীর গভীরতা বাড়ায় ভাঙন কমছে এবং তীরবর্তী মানুষের জীবনে ফিরছে
স্বস্তি। বলা বাহুল্য, উত্তরাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নদী ধরলা দীর্ঘদিন ধরে নাব্য সংকট,
পলি জমা এবং ভাঙনের কারণে মৃতপ্রায় অবস্থায় পৌঁছে গিয়েছিল। নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায়
পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছিল এবং বর্ষা মৌসুমে বন্যা ও ভাঙনের ঝুঁকি বাড়ছিল।
তবে নদীতে ড্রেজিং কার্যক্রম শুরু হওয়ায় ধরলায় আবারও প্রাণের সঞ্চার দেখা যাচ্ছে। এই
নদীর পুনর্জাগরণ উত্তরাঞ্চলের পরিবেশ ও অর্থনীতির জন্য নিঃসন্দেহে ইতিবাচক বার্তা।
জানা
গেছে, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) বাস্তবায়নে কুড়িগ্রামের
পাটেশ্বরী থেকে উলিপুরের কালীগঞ্জ পর্যন্ত প্রায় ২৫ কিলোমিটার এলাকায় খননকাজ চলমান
রয়েছে, যার প্রায় ৬৫ শতাংশ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। উল্লেখ্য, প্রায় ৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ ও
গড়ে ১ দশমিক ২ কিলোমিটার প্রশস্ত এ নদীটি দীর্ঘদিন ধরে ভাঙন ও গতিপথ পরিবর্তনের কারণে
তীরবর্তী মানুষের জন্য উদ্বেগের কারণ ছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ড্রেজিংয়ের ফলে নদীর গভীরতা বৃদ্ধি
পাচ্ছে এবং পানির প্রবাহ স্বাভাবিক হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদীর নাব্য ধরে রাখতে
নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিকল্পিত খনন প্রয়োজন। একই সঙ্গে নদী দখল ও দূষণ বন্ধে কার্যকর
পদক্ষেপ নিতে হবে। আমরা মনে করি, চলমান প্রকল্প সফলভাবে শেষ হওয়ার পাশাপাশি পুরো ধরলা নদীজুড়ে
খনন কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হলে ভাঙন আতঙ্ক থেকে স্থায়ী মুক্তি পাবে নদীতীরবর্তী
লাখো মানুষ। শুধু ধরলাই নয়, দেশের সকল নদনদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখতে এবং বিপর্যয় রোধে নিয়মিত
ড্রেজিং বা খনন করা এখন সময়ের দাবি।
আসলে
নদীর নাব্য কমে যাওয়ার প্রধান কারণ হলো পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়া, অবৈধ দখল, দূষণ এবং
অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ। বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঢল ও উজান থেকে আসা বিপুল পলি নদীর
তলদেশে জমে নদী ভরাট হয়ে যায়। ফলে নদীর গভীরতা কমে যায় এবং পানির স্বাভাবিক প্রবাহ
বাধাগ্রস্ত হয়। আর নদীর নাব্য কমে গেলে বর্ষাকালে পানি ধারণক্ষমতা কমে যায়। ফলে সামান্য
বৃষ্টিতেই নদীর পানি উপচে পড়ে এবং বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
এমন
পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের অন্যতম কার্যকর উপায় হলো নদী খনন বা ড্রেজিং করা। নিয়মিত ও
পরিকল্পিতভাবে নদী খনন করলে নদীর গভীরতা বাড়ে এবং পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরে আসে।
এতে বর্ষার পানি সহজে প্রবাহিত হতে পারে এবং বন্যার ঝুঁকি কমে যায়। একই সঙ্গে শুষ্ক
মৌসুমেও নদীতে পর্যাপ্ত পানি থাকে, যা কৃষি ও পরিবেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আশার
কথা, সরকার দেশের বিভিন্ন নদী খনন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে, যা অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে
বাস্তবতা হলো, অনেক ক্ষেত্রে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি, অনিয়ম ও সমন্বয়হীনতা দেখা
যায়। অনেক নদী আংশিক খনন করা হলেও তা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর থাকে না। তাই নদী খননের ক্ষেত্রে
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, সঠিক তদারকি এবং বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জরুরি।
তবে কেবল খনন করলেই হবে নাÑ নদী দখল ও দূষণ রোধেও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। নদীর তীর
দখল করে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে শিল্পকারখানা ও নগর
বর্জ্য নদীতে ফেলা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
মনে
রাখতে হবে, নদী রক্ষা মানে শুধু একটি জলাধার রক্ষা নয়Ñ এটি দেশের পরিবেশ, অর্থনীতি
এবং মানুষের জীবন-জীবিকার সুরক্ষা। তাই নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখতে এবং নদীকে
জীবন্ত রাখতে নিয়মিত খনন ও সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য। নদী বাঁচলে দেশ বাঁচবেÑ
এই উপলব্ধি থেকেই সরকার, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং জনগণকে একযোগে নদী রক্ষার উদ্যোগ
নিতে হবে।