× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ইমেইল থেকে

সংসদে প্রথম দিন ও আগামীর পূর্বাভাস

ড. মো. আনোয়ার হোসেন

প্রকাশ : ১৪ মার্চ ২০২৬ ০৯:৫৮ এএম

সংসদে প্রথম দিন ও আগামীর পূর্বাভাস

১২ মার্চ ২০২৬ তারিখটি বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে কেবল একটি তারিখ নয়, বরং এক নতুন অধ্যায়ের সূচনাবিন্দু হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর অস্থিরতার অবসান ঘটিয়ে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের সেই বিশাল অট্টালিকাটি যেন ঘটন-অঘটনের এক পুনর্জন্মের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সংসদ কক্ষের ভেতরে প্রবেশ করতেই সবার নজর কেড়েছিল স্পিকারের সেই শূন্য চেয়ারটি। একটি আসন যখন শূন্য থাকে, তখন তা কেবল আসবাবের অভাব বোঝায় না, বরং একটি যুগের অবসান ও নতুনত্বের আবাহনকে নির্দেশ করে। গণতন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দুতে এই শূন্যতা যেন গত কয়েক বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও পালাবদলের এক নীরব ভাষ্যকার হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।

অধিবেশনের শুরুতেই গ্যালারি ও সংসদ সদস্যদের আসনে এক অদ্ভুত উত্তেজনা বিরাজ করছিল, যা এক পর্যায়ে ‘কার্ড’ প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত রূপ নেয়। সংসদীয় ঐতিহ্যের অন্যতম অনুষঙ্গ ‘ওয়াক আউট’ এই প্রথম দিনেই তার উপস্থিতি জানান দিয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট ইস্যুতে মতভিন্নতা থেকে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের কক্ষ ত্যাগ করার ঘটনাটি গণতন্ত্রের প্রাণবন্ত রূপকেই ফুটিয়ে তোলে। এটি কেবল বের হয়ে যাওয়া নয়, বরং ভিন্নমতের একটি গণতান্ত্রিক বহিঃপ্রকাশ। এই ওয়াক আউট যেন কবি জীবনানন্দ দাশের ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতার সেই বিপন্ন বিস্ময়ের মতো, যেখানে মানুষ তার অধিকারের প্রশ্নে অবিচল থেকে প্রতিবাদ জানায়। সংসদীয় বিতর্ক যে একপেশে হবে না এবং বিরোধী কণ্ঠস্বর যে প্রবল বিক্রমে ফিরে এসেছে, এটি ছিল তারই এক বলিষ্ঠ সংকেত।

সভার সভাপতিত্ব নিয়ে যে অনিশ্চয়তা ছিল, তা দূর করে যখন প্যানেল স্পিকারের মাধ্যমে অধিবেশন পরিচালিত হচ্ছিল, তখন তা ছিল এক অনন্য মুহূর্ত। কে বসবেন সেই আসনে, তা নিয়ে যে জল্পনা ছিল তার অবসান ঘটে এক বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। সংসদ ভবনের ভেতর ও বাইরে আজ স্লোগানের জয়ধ্বনি শোনা যাচ্ছিল।

নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার মনোনয়ন ঘিরে সংসদের ভেতরে এক ধরনের গম্ভীর ও উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। নিরপেক্ষতা আর প্রজ্ঞার মিশেলে তারা সংসদকে কতটুকু কার্যকর রাখতে পারেন, তার ওপরই নির্ভর করছে আগামীর স্থিতিশীলতা। জন স্টুয়ার্ট মিলের লিবার্টি তত্ত্ব অনুযায়ী, যেখানে প্রত্যেকের কথা বলার সমান সুযোগ থাকে, সেখানেই প্রকৃত গণতন্ত্র বিকশিত হয়। নতুন মনোনীত এই অভিভাবকরা সেই সুযোগটি কতটুকু নিশ্চিত করবেন, তা দেখার অপেক্ষায় দেশবাসী। তবে রাজনৈতিক মেরুকরণের এক অনন্য দৃষ্টান্ত তৈরি হয়েছে জামায়াতে ইসলামীর ডেপুটি স্পিকার পদ প্রত্যাখ্যানের মাধ্যমে। এই প্রত্যাখ্যান সংসদীয় রাজনীতিতে এক ধরনের ভারসাম্য রক্ষা করবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে।

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন যখন তার ভাষণে গত সরকারের তীব্র সমালোচনা করলেন, তখন পুরো সংসদ স্তম্ভিত হয়ে শুনছিল। একজন রাষ্ট্রপ্রধানের মুখে এ ধরনের কঠোর সমালোচনা সচরাচর দেখা যায় না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভাষণ ছিল এই অধিবেশনের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত মুহূর্ত। দীর্ঘ নির্বাসন আর রাজনৈতিক সংগ্রামের পর তার এই বক্তব্য ছিল অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ ও দিকনির্দেশনামূলক। কোনো প্রতিহিংসার পথে না গিয়ে বরং জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়ে তিনি এক নতুন নেতৃত্বের পরিচয় দিয়েছেন।

এবারের সংসদের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল ‘আওয়ামী লীগবিহীন’ এক দৃশ্যপট। দেশের অন্যতম প্রাচীন ও বড় দলটির অনুপস্থিতি সংসদের চেহারাই বদলে দিয়েছে। এটি যেমন এক নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে, তেমনি এক বিশাল রাজনৈতিক শূন্যতারও ইঙ্গিত দেয়। ইতিহাসে দেখা যায়, কোনো বড় শক্তির পতন বা অনুপস্থিতি নতুন শক্তির উত্থান ঘটায়।

সংসদের সমালোচনা সূচক বক্তব্যগুলো ছিল অত্যন্ত ধারালো। অধিকাংশ বক্তব্য একপেশে হলেও, একাধিক সংসদ সদস্য কোনো ভুলকে আড়াল করার চেষ্টা না করে বরং তা সাহসের সঙ্গে স্বীকার করে নেওয়ার এক সংস্কৃতি আজ দেখা গেল। এই সমালোচনাগুলো ছিল অনেকটা সার্জনের ছুরির মতো, যা পচনশীল অংশ বাদ দিয়ে শরীরকে সুস্থ করার চেষ্টা করে।

সংসদ যখন ভেতরে তর্ক-বিতর্কে মত্ত, তখন বাইরে ছিল সাধারণ নাগরিকদের বিক্ষোভ। এই বিক্ষোভ সরকারের বিরুদ্ধে নয়, বরং তাদের অধিকার আদায়ের দাবিতে এক জাগ্রত পাহারাদারের মতো। নাগরিক সমাজ আজ সজাগ, তারা কেবল ভোট দিয়েই দায়িত্ব শেষ করতে চান না, বরং প্রতিটি পদক্ষেপে জবাবদিহিতা চান।

তর্কবাগিসের সেই কিংবদন্তি সংসদীয় বাগ্মিতার প্রসঙ্গ আলোচনায় এসেছে। মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগিসের মতো তেজস্বী ও যুক্তিবাদী নেতৃত্বের অভাব আজ যেন অনেক সংসদ সদস্য অনুভব করছেন। অধিবেশন কক্ষে যখনই কোনো প্রস্তাব আসছিল, মনঃপূত হলেই সংসদ সদস্যরা তখন টেবিল চাপড়ে সেটিকে স্বাগত জানাচ্ছিলেন। এটি কেবল শব্দ ছিল না, বরং এটি ছিল এক সম্মিলিত হৃদস্পন্দন, তবে যা আগামী দিনগুলোতে বোঝা যাবে যে এই সংসদ জনগণের নাড়ির স্পন্দন বুঝতে সক্ষম কি না।

সংসদের গ্যালারিতে ও ভেতরে প্রতীকী প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন ছিল এক অভিনব দৃশ্য। প্রেসিডেন্টের ভাষণ নিয়ে এটি যেন পাবলো পিকাসোর সেই আঁকা ছবির মতো, যা হাজারো শব্দের চেয়েও শক্তিশালী বার্তা বহন করে। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন ওয়াক আউট যথেষ্ট ছিল, পূর্ব হতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে আসার প্রয়োজন ছিল না।

শোক প্রস্তাব উত্থাপনের সময় পুরো সংসদে এক পিনপতন নীরবতা নেমে এসেছিল। জুলাই বিপ্লবে যারা প্রাণ দিয়েছেন তাদের স্মরণে এই শ্রদ্ধা নিবেদন ছিল অত্যন্ত আবেগঘন। তবে এই শোক প্রস্তাব অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের দৃষ্টিতে বিতর্কিত বিষয় ছিল, যা গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় বয়ে বেড়াচ্ছে। মৃত্যু যে কেবল শেষ নয়, বরং ত্যাগের মাধ্যমে মানুষ অমর হয়ে থাকে, এই শোক প্রস্তাবটি ছিল তারই স্বীকৃতি।

এই অধিবেশনের মাধ্যমে বাংলাদেশ যেন সংসদীয় গণতন্ত্রের এক নতুন যাত্রাপথে পা রাখল। দীর্ঘ বিরতি ও আঠারো মাসের বৈরী পরিবেশের পর এই সংসদীয় পরিবেশটি ছিল অনেকটা মরুভূমিতে বৃষ্টির মতো। আজ সংসদের প্রতিটি কার্যক্রমে সেই রাজনৈতিক চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।

 

ড. মো. আনোয়ার হোসেন

প্রেসিডেন্ট, আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী সংগঠন, ফ্রিডম ইন্টারন্যাশনাল এন্টি অ্যালকোহল

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা