এম, সফিউল আজম চৌধুরী
প্রকাশ : ১৪ মার্চ ২০২৬ ০৯:৪৪ এএম
জন্মনিবন্ধন সনদ প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার ও আইনি পরিচয়ের প্রথম ধাপ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি, পাসপোর্ট তৈরি, বিবাহনিবন্ধন, চাকরি, ব্যাংক হিসাব খোলাÑ মোট ১৮টি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সেবা পেতে এই সনদের বিকল্প নেই। অথচ, এই অতি প্রয়োজনীয় দলিলটি সংগ্রহ বা সংশোধনের জন্য দেশের সাধারণ মানুষকে পদে পদে যে সীমাহীন ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে, তা নাগরিক সেবার বেহাল দশাকেই ফুটিয়ে তোলে।
ভোগান্তির প্রধান কারণসমূহÑ ১. জটিল ও পরিবর্তনশীল নিয়ম : ২০০১
সালের পর জন্মগ্রহণকারী শিশুদের নিবন্ধনের জন্য বাবা-মায়ের ডিজিটাল জন্মসনদ
বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আবার, অনেকের ক্ষেত্রেই দেখা যায়, পুরনো হাতে লেখা বা ১৭
ডিজিটের কম সংখ্যার সনদগুলো বর্তমানে ব্যবহৃত অনলাইন ডেটাবেজে নেই। ফলে নিজের
সন্তানের জন্মসনদ করতে গিয়ে প্রথমে বাবা-মায়ের সনদ অনলাইনে নিবন্ধন বা সংশোধন করতে
হচ্ছে। এই জটিলতা থেকেই ভোগান্তির শুরু। এ ছাড়াও, জন্মনিবন্ধন সনদের ফরমেট বারংবার
পরিবর্তন হওয়ায় নাগরিককে অযথা সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। স্থায়ী কোনো ফরমেট না
থাকায় বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে এই সনদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
২. অনলাইন সার্ভার ও প্রযুক্তির দুর্বলতা : জন্মনিবন্ধনের
পুরো প্রক্রিয়াটি অনলাইনভিত্তিক হলেও সার্ভার জটিলতা যেন নিত্যদিনের ঘটনা।
আবেদনকারীর অভিযোগ, সার্ভার ডাউন বা মন্থর থাকার কারণে দিনের পর দিন অপেক্ষা করেও
আবেদন সম্পন্ন করা যায় না বা সনদ পাওয়া যায় না। অনেকে সাইবার ক্যাফেতে অতিরিক্ত
টাকা দিয়ে আবেদন করেও ভোগান্তির শিকার হন। আবার, পুরনো সনদগুলো অনলাইনে
অন্তর্ভুক্ত করার সময় অদক্ষ জনবল ব্যবহারের কারণে তথ্যে ভুল ( যেমন : নামের বানান
ভুল, জন্ম তারিখ ভুল, ঠিকানা ভুল) হওয়ার বহু অভিযোগ রয়েছে। একই ব্যক্তির নামে একাধিক
জন্মনিবন্ধন হয়ে যাওয়ার মতো মারাত্মক ত্রুটির ঘটনাও ঘটছে, যা ভবিষ্যতে অপরাধের
সুযোগ সৃষ্টি করছে।
৩. অপ্রতুল জনবল ও কার্যালয়ের অব্যবস্থাপনা : সিটি করপোরেশনের
মতো বড় এলাকায় একাধিক ওয়ার্ডের জন্য একটি আঞ্চলিক জোন বা কার্যালয় থাকায়
সেবাপ্রত্যাশীদের চাপ সামলাতে গিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা হিমশিম খাচ্ছেন। জনবল
স্বল্পতার কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন প্রক্রিয়াকরণ সম্ভব হচ্ছে না। অনেক
সময় দেখা যায়, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা সচিব একাধিক ওয়ার্ডের দায়িত্বে থাকায়
তিনি অফিসে অনুপস্থিত থাকেন। ফলে দূরদূরান্ত থেকে আসা সাধারণ মানুষ ঘণ্টার পর
ঘণ্টা অপেক্ষা করেও সেবা না পেয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হন। সম্প্রতি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের
কারণে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের (ওয়ার্ড কাউন্সিলর, ইউপি চেয়ারম্যান) কার্যালয়গুলোতে
সেবা কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়ায় এই ভোগান্তি আরও বেড়েছে।
৪. দুর্নীতি ও অতিরিক্ত অর্থ আদায় : সরকার নির্ধারিত ফি খুবই
কম (বিলম্বিত নিবন্ধনে ১০০ টাকা, সংশোধনীতে ২০০ টাকা), তবুও অনেক ভুক্তভোগীর
অভিযোগ, সরকারি ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ না দিলে সনদ পাওয়া কঠিন। বিশেষ করে,
সংশোধনী বা পুরনো সনদ অনলাইনে নিবন্ধনের ক্ষেত্রে অসাধু চক্র ও দালালরা সক্রিয়
হয়ে উঠেছে, যারা সাধারণ মানুষের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে
নিচ্ছে। টাকা দিলেও দিনের পর দিন ঘুরতে হচ্ছে, আবার টাকা না দিলে কাজ থেমে থাকছেÑ এমন
পরিস্থিতিই বিরাজমান।
৫. তথ্যগত ভুল সংশোধনীর দীর্ঘসূত্রতা : সনদ পাওয়া গেলেও
তথ্যের সামান্যতম ভুল সংশোধনের প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত কঠিন ও দীর্ঘসূত্রতার জালে
আবদ্ধ। নামের বানান, পিতা-মাতার নাম বা জন্ম তারিখের ভুল সংশোধনের জন্য বারবার
আবেদন করতে হয় এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে মা-বাবার
জন্মসনদের সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যের মিল না থাকলে শিশুর জন্মনিবন্ধনের জন্য
প্রথমে মা-বাবার তথ্য সংশোধন করতে হয়, যা ভোগান্তিকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
ছোটখাটো সংশোধনের জন্যও মাসের পর মাস ঘোরানো হয়, যাতে করে জরুরি কাজে জন্মনিবন্ধন সনদ
জমা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
নাগরিকের এই ভোগান্তি দূর করতে দ্রুত নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো
গ্রহণ করা জরুরি : স্থায়ী ফরমেট নির্ধারণ : জন্মনিবন্ধন সনদের জন্য একটি স্থায়ী
ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ফরমেট দ্রুত নির্ধারণ করা উচিত। সার্ভার সক্ষমতা বৃদ্ধি :
অনলাইন সার্ভারের সক্ষমতা ও স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি করা, যাতে আবেদনের চাপ সামলানো
যায়।
কার্যালয়গুলোতে পর্যাপ্ত দক্ষ জনবল নিশ্চিত করা এবং সেবাকে
আরও বিকেন্দ্রীকরণ করে ওয়ার্ড বা ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত সহজলভ্য করা। তথ্যের
সাধারণ ভুল সংশোধনের প্রক্রিয়াকে সরলীকরণ ও দ্রুততার সঙ্গে নিষ্পত্তির ব্যবস্থা
করা। জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) বা পাসপোর্টের মতো সরকারি দলিলে থাকা তথ্যকে সংশোধনের
ক্ষেত্রে মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। সেবাদান প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা
নিশ্চিত করা এবং অতিরিক্ত ফি আদায় বা দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া।
দালালদের দৌরাত্ম্য বন্ধে প্রশাসনিক নজরদারি বাড়ানো জরুরি। জন্মনিবন্ধনের গুরুত্ব
এবং সহজ প্রক্রিয়ার বিষয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালানো।
আসলে জন্মনিবন্ধন সনদ কেবল একটি কাগজ নয়, এটি রাষ্ট্রের চোখে
নাগরিকের আইনি অস্তিত্ব। এই সনদের জন্য সাধারণ মানুষের পদে পদে ভোগান্তি পোহানো
মোটেই কাম্য নয়।
এম, সফিউল আজম চৌধুরী
সাংবাদিক ও মানবাধিকার
কর্মী, চট্টগ্রাম।