মাছের রোগ প্রতিরোধ
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১৩ মার্চ ২০২৬ ১০:৫৩ এএম
গবেষকরা বলছেন, পাঙাশ মাছে উৎপাদনের অন্যতম বড় বাধা ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
নদী ও পুকুর ভরা মাছের গল্প আমাদের ঐতিহ্য। আমাদের নৃতাত্ত্বিক পরিচিতি বাঙালি। আর এই বাঙালির পরিচয় ‘মাছে-ভাতে বাঙালি হিসেবে। বাংলাদেশ নদীনালা, খাল-বিল ও জলাশয় সমৃদ্ধ। এই প্রাকৃতিক উৎসগুলোকে কাজে লাগিয়ে মৎস্য খাত দেশের অর্থনীতি ও পুষ্টি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। উল্লেখ্য, মাছ উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয় অবস্থানে বাংলাদেশ। মাছ শুধু আমাদের খাদ্যের উৎসই নয়, বরং সরাসরি লাখ লাখ মানুষের জীবিকা নির্ভর করে মৎস্য উৎপাদন ও চাষাবাদের ওপর। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশে চাষভিত্তিক মাছ উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। তবে এই অগ্রগতির পথে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে চাষকৃত মাছের বিভিন্ন রোগ। এসব রোগের কারণে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ মাছ মারা যায়, ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হন খামারি ও প্রান্তিক চাষিরা। এই বাস্তবতায় গবেষণা ও প্রযুক্তিনির্ভর সমাধানের মাধ্যমে মাছের রোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট। ময়মনসিংহে অবস্থিত এ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে কৈ, পাঙাশ, পাবদা, গুলশা ও শিংসহ নানা প্রজাতির মাছের রোগ নির্ণয় ও প্রতিরোধে গবেষণা চালাচ্ছেন। সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় এসেছে পাঙাশ মাছের রোগ প্রতিরোধে ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের বিষয়টি।
১২ মার্চ প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘মাছের রোগ প্রতিরোধে নতুন সম্ভাবনা’ শীর্ষক প্রতিবেদনে জানা যায়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষ করে ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, কিশোরগঞ্জ ও উত্তরাঞ্চলের অনেক এলাকায় পাঙাশসহ অন্যান্য চাষযোগ্য মাছে বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়াজনিত ও সংক্রামক রোগের প্রকোপ দেখা দিয়েছে। জানা গেছে, খামারের ঘন চাষব্যবস্থা, পানির গুণগত মানের অবনতি এবং অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার কারণে এসব রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। গবেষকরা বলছেন, পাঙাশ মাছে উৎপাদনের অন্যতম বড় বাধা ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ। অনেক ক্ষেত্রে খামারে হঠাৎ করে ব্যাপক হারে মাছ মারা যায়, যাকে স্থানীয় ভাষায় ‘মড়ক’ বলা হয়। এতে একটি খামারের পুরো উৎপাদনই ঝুঁকির মুখে পড়ে।
মড়কের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিএফআরআই আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে রোগ শনাক্ত ও প্রতিরোধ প্রযুক্তি উন্নয়নে কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটির গবেষকরা রোগাক্রান্ত মাছ সংগ্রহ করে তাদের কিডনি, লিভার, ব্রেন ও প্লিহা থেকে নমুনা সংগ্রহের পর বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়াল কালচার মিডিয়ায় পরীক্ষার মাধ্যমে রোগের সুনির্দিষ্ট পরিচয় নির্ধারণ করেন। এর পাশাপাশি ‘চ্যালেঞ্জ টেস্ট’ নামে একটি পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয় কোন ব্যাকটেরিয়া প্রকৃতপক্ষে রোগের জন্য দায়ী। এসব তথ্যের ভিত্তিতেই ভ্যাকসিন উন্নয়নের কাজ এগিয়ে নেওয়া হয়।
এ কথা সত্য, মাছের বিভিন্ন ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও পরজীবীজনিত রোগ দেশের মৎস্য খাতে বড় ধরনের ক্ষতি ডেকে আনে। বিশেষ করে পুকুর ও ঘেরভিত্তিক চাষে রোগ ছড়িয়ে পড়লে অল্প সময়ের মধ্যেই ব্যাপক মাছের মৃত্যু ঘটে। এতে উৎপাদন কমে, খামারিদের বিনিয়োগও ঝুঁকির মুখে পড়ে। তাই মাছের রোগ প্রতিরোধে বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা অত্যন্ত জরুরি। এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট যে ভূমিকা পালন করছে তা সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয়। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের চলমান উদ্যোগ আশার আলো দেখাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির বিজ্ঞানীরা নতুন নতুন প্রযুক্তি ও গবেষণালব্ধ তথ্য মাঠ পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে খামারিদের সচেতন করে তুলছেন।
গবেষণার মাধ্যমে ইতোমধ্যে বিভিন্ন মাছের রোগের কারণ ও প্রতিকার সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। বিশেষ করে পাঙ্গাশ, তেলাপিয়া ও কার্পজাতীয় মাছের রোগ নিয়ন্ত্রণে নানা ধরনের নির্দেশনা তৈরি হয়েছে। এসব নির্দেশনা অনুসরণ করলে মাছের রোগ অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এ ছাড়া রোগ প্রতিরোধে স্বাস্থ্যসম্মত পোনা উৎপাদন, পানির মান বজায় রাখা এবং সঠিক খাদ্য ব্যবস্থাপনার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো রোগ প্রতিরোধী মাছের জাত উন্নয়ন ও আধুনিক ল্যাবরেটরি গবেষণা। এতে ভবিষ্যতে মাছের রোগ মোকাবিলায় আরও কার্যকর প্রযুক্তি উদ্ভাবনের সম্ভাবনা তৈরি হবে। আমরা মনে করি, বিজ্ঞানীদের এসব উদ্যোগ মৎস্য খাতকে আরও টেকসই ও লাভজনক করে তুলতে সহায়ক হবে।
আমরা আরও মনে করি, গবেষণার পাশাপাশি এসব প্রযুক্তি মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় খামারিরা প্রয়োজনীয় তথ্য বা প্রশিক্ষণের অভাবে সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারেন না। তাই সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করে খামারিদের প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বাড়াতে হবে।
মনে রাখতে হবে, মৎস্য খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। দেশের মানুষের ব্যাপক কর্মসংস্থান ও পুষ্টি নিরাপত্তা এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। তাই মাছের রোগ প্রতিরোধে গবেষণা কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করা জরুরি। যদি গবেষণার ফলাফল দ্রুত মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া যায় এবং খামারিদের মধ্যে আধুনিক চাষ পদ্ধতি জনপ্রিয় করা যায় তাহলে মাছের রোগজনিত ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব। এতে দেশের মাছ উৎপাদন আরও বৃদ্ধি পাবে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখা সম্ভব হবে।
তবে সবকিছুর ওপরে একটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে। মাছের রোগ প্রতিরোধ করতে গিয়ে এমন কিছু করা যাবে না- যা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য হানিকর হয়ে দাঁড়ায়। অর্থনৈতিক ক্ষতি রোধ করতে গিয়ে মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবন কোনোভাবেই বিপন্ন করা যাবে না।