ব্যাংকিং খাত
নিরঞ্জন রায়
প্রকাশ : ১৩ মার্চ ২০২৬ ১০:৪৭ এএম
নিরঞ্জন রায়, সার্টিফায়েড অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা
ব্যাংকিং নিয়ে লেখালেখি করার কারণে অনেক পাঠক, বিশেষ করে অনেক ব্যাংকার ‘হোল্ডার ইন ডিউ কোর্স’ নিয়ে লেখার জন্য অনুরোধ করেছেন। অনেক পাঠক, বিশেষ করে ব্যাংকে চাকরি করেন এমন পাঠক ব্যাংকিং কার্যক্রমের অনেক বিষয় নিয়ে লিখতে বলেন। পাঠকদের অনুরোধের অধিকাংশ বিষয় ব্যাংকের সাধারণ কার্যক্রম এবং এন-আই অ্যাক্ট (নেগোসিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট অ্যাক্ট ১৮৮১) সংক্রান্ত, যা একদিকে যেমন জটিল ও দুর্বোধ্য, অন্যদিকে তেমনি সাধারণ পাঠকদের জন্য বুঝে ওঠা অনেক ক্ষেত্রেই বেশ কষ্টকর। তা ছাড়া এই বিষয়গুলো কলাম লেখার জন্য খুব একটা উপযুক্ত হয় না। প্রায় ক্ষেত্রেই লিখে বোঝানো বেশ কঠিন। বিষয়গুলো মূলত একাডেমিক আলোচনা বা শ্রেণিকক্ষে প্রশিক্ষণের বিষয়। তবুও আগ্রহী পাঠকদের কথা বিবেচনা করে আগেও এরকম কিছু বিষয় নিয়ে লিখেছি এবং আজকেও চেষ্টা করব।
ব্যাংকিং লেনদেনে যে তিনটি হস্তান্তরযোগ্য দলিল বা নেগোসিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট ব্যবহৃত হয়, সেগুলো হচ্ছে চেক, বিনিময় বিল বা বিল অব এক্সচেঞ্জ এবং প্রমিসরি নোট। এর মধ্যে চেক হচ্ছে বহুল প্রচলিত এবং খুবই সাধারণ লেনদেনের মাধ্যম। ‘হোল্ডার ইন ডিউ কোর্স’ মূলত এই তিন ধরনের নেগোসিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টের লেনদেনের সঙ্গে জড়িত। যেহেতু ব্যাংকের অধিকাংশ লেনদেনের মাধ্যম হচ্ছে চেক, তাই প্রত্যেক ব্যাংকার এবং অধিকাংশ গ্রাহক চেকের মতো এই ‘হোল্ডার ইন ডিউ কোর্সের’ সঙ্গেও পরিচিত। তবে ‘হোল্ডার ইন ডিউ কোর্সের’ ব্যাপারে ব্যাংকারদের এবং গ্রাহকদের জানার মধ্যে পার্থক্য আছে। ব্যাংকারদের এই বিষয়ে ভালোভাবে জেনে, বুঝে চেকের লেনদেন করতে হয়। পক্ষান্তরে গ্রাহক এই ‘হোল্ডার ইন ডিউ কোর্সের’ নামই শুনেছে, কিন্তু বিষয়টি কখনও বোঝার চেষ্টা করে না এবং তার প্রয়োজনও হয় না।
গ্রাহকরা এই বিষয় ভালোভাবে না বুঝলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে চেষ্টা করে তাদের কাছ থেকে চেক গ্রহণ করতে, যারা ‘হোল্ডার ইন ডিউ কোর্স’। এক কথায় গ্রাহকরা ভালোভাবে না বুঝেও ‘হোল্ডার ইন ডিউ কোর্সের’ মাধ্যমে চেকের লেনদেন করে থাকে। অপরপক্ষে ব্যাংকাররা আগে ‘হোল্ডার ইন ডিউ কোর্স’ বিষয়ে ভালোভাবে জানে, নিশ্চিত হয় এবং পরে চেকের লেনদেন সম্পন্ন করে। এর কারণ হচ্ছে ব্যাংকাররা নেগোসিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট অ্যাক্ট ১৮৮১-এর অধীনে তখনই সুরক্ষা বা প্রটেকশন পাবে, যখন সে ‘হোল্ডার ইন ডিউ কোর্স’ নিশ্চিত করে চেক বা কোনো নেগোসিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টের অর্থ প্রদান করবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে প্রত্যেক ব্যাংকার এই ‘হোল্ডার ইন ডিউ কোর্সের’ সঙ্গে পরিচিত হলেও, সকল ব্যাংকার যে বিষয়টি ভালোভাবে জানে এবং তাদের এ ব্যাপারে স্বচ্ছ ধারণা আছে, তেমনটা মোটেই নয়। অধিকাংশ ব্যাংকারের এ বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা নেই। এটা অবশ্য ব্যাংকারদের দোষ নয়। বিষয়টি নিয়ে তাদের জানার সুযোগ বেশ সীমিত। কেননা নেগোসিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট অ্যাক্টে বিষয়টি যেভাবে ব্যাখ্যা করা আছে, সেখান থেকে এ বিষয়ে সঠিক ধারণা পাওয়া সম্ভব নয়।
নেগোসিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট অ্যাক্ট ১৮৮১-এর ৯ ধারায় ‘হোল্ডার ইন ডিউ কোর্স’-এর সংজ্ঞা দেওয়া আছে। তবে ‘হোল্ডার ইন ডিউ কোর্স’ নিয়ে কথা বলতে হলে, তার আগে ‘হোল্ডার’ এবং ‘হোল্ডার ফর ভ্যালু’ সম্পর্কে জানতে হবে। এন-আই অ্যাক্টের ৯ ধারায় অবশ্য শুধু ‘হোল্ডার ইন ডিউ কোর্স’ সম্পর্কে বলা আছে। কিন্তু চেকের লেনদেনের যে বৈশিষ্ট্য তা বিশ্লেষণ করলে প্রাসঙ্গিকভাবেই ‘হোল্ডার’ এবং ‘হোল্ডার ফর ভ্যালু’ চলে আসে। এ কারণেই ‘হোল্ডার ইন ডিউ কোর্স’ সম্পর্কে ভালোভাবে জানতে হলে ‘হোল্ডার’ এবং ‘হোল্ডার ফর ভ্যালু’ সম্পর্কেও ভালো ধারণা থাকতে হবে। বিষয়টা শহরের স্থানীয় সড়ক এবং মহাসড়কে গাড়ি চালানোর মতো। মহাসড়কে ভালোভাবে গাড়ি চালাতে হলে শহরের স্থানীয় রাস্তার ভালো গাড়ি চালানোর অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। কোনো ব্যক্তি যদি শহরের স্থানীয় রাস্তায় গাড়ি না চালিয়ে সরাসরি মহাসড়কে গাড়ি চালাতে শুরু করে, তাহলে সে কোনো অবস্থাতেই স্বাচ্ছন্দ্যে গাড়ি চালাতে পারবে না। তেমনি কেউ যদি ‘হোল্ডার’ এবং ‘হোল্ডার ফর ভ্যালু’ সম্পর্কে ভালোভাবে না জেনে সরাসরি ‘হোল্ডার ইন ডিউ কোর্স’ সম্পর্কে জানতে যায়, তাহলে বিষয়টা তার জন্য জটিল এবং দুর্বোধ্য হবে।
একটি চেকের ‘হোল্ডার’ হচ্ছে সেই ব্যক্তি, যার কাছে চেকটি থাকে। যার কাছে চেক থাকবে, সেই হচ্ছে ‘হোল্ডার’ বা বাহক। এই চেক পাওয়ার জন্য সেই ব্যক্তি উপযুক্ত মূল্য পরিশোধ করেছে কি না এবং চেকের সত্যতা (জেনুইননেস) যাচাই করেছে কি না, সেটি এখানে মুখ্য নয়। চেক কাছে থাকলেই একজন ব্যক্তি চেকের হোল্ডার। যেমন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যখন একটি চেক তার পিয়নকে দেয় ব্যাংক থেকে টাকা উঠিয়ে আনার জন্য, তখন পিয়ন হয়ে যায় সেই চেকের ‘হোল্ডার’। এই ‘হোল্ডার’ নিয়েও কিছু কথা আছে। যেমন, কেউ যদি চেক চুরি করে কাছে রাখে অথবা কেউ যদি হারানো চেক পেয়ে নিজের কাছে রাখে, তাহলে তারাও কি সেই চেকের ‘হোল্ডার’ হিসেবে গণ্য হবে। একটি কথা সবার আগে বিবেচনায় নিতে হবে, তা হচ্ছে যেকোনো লেনদেন হতে হবে আইনের চোখে বৈধ। কোনোরকম অবৈধ লেনদেন আইনের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়, বরং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। যেহেতু চুরি করা চেক অবৈধ, তাই কোনো ব্যক্তি চুরি করা চেক কাছে রাখলেও সে ‘হোল্ডার’ হিসেবে গণ্য হবে না। একইভাবে হারানো চেক যদি কেউ পেয়ে চেকের প্রকৃত মালিককে ফেরত দেওয়ার উদ্দেশ্যে নিজের কাছে রাখে, সে ক্ষেত্রে মালিকের কাছে ফেরত না দেওয়া পর্যন্ত সেই ব্যক্তি ‘হোল্ডার’ হিসেবে গণ্য হবে। কিন্তু চেক পেয়ে কেউ যদি চেকের টাকা আত্মসাৎ করার জন্য রেখে দেয়, তাহলে সেই ব্যক্তি আর ‘হোল্ডার’ হিসেবে গণ্য হবে না।
‘হোল্ডার ফর ভ্যালু’ হচ্ছে সেই ব্যক্তি যিনি উপযুক্ত মূল্য দিয়ে চেকটা পেয়েছেন। অর্থাৎ একজন ব্যক্তি শুধু চেক তার নিজের কাছেই রাখেন না, সেই সঙ্গে এই চেক পাওয়ার জন্য উপযুক্ত মূল্য পরিশোধ করেন, তখন সেই ব্যক্তি ‘হোল্ডার ফর ভ্যালু’ হিসেবে গণ্য হবে। একজন ‘হোল্ডার ফর ভ্যালু’ চেকের মালিকানা বা সত্যতা যাচাই করে নিশ্চিত হন না। ‘হোল্ডার’ এবং ‘হোল্ডার ফর ভ্যালু’-এর মধ্যকার পার্থক্য হচ্ছে প্রথমজন কোনোরকম মূল্য না দিয়ে চেকের মালিক হয়েছেন, আর দ্বিতীয়জন উপযুক্ত মূল্য পরিশোধ করে চেকের মালিক হয়েছেন। ‘হোল্ডার ইন ডিউ কোর্স’ হচ্ছে চেকের এমন মালিকানা, যা অর্জন করার জন্য চেকের মালিক হতে হবে, উপযুক্ত মূল্য পরিশোধ করতে হবে এবং চেকের সত্যতা শতভাগ নিশ্চিত হতে হবে। একজন ব্যক্তি যখন লেনদেনের উপযুক্ত মূল্য পরিশোধ করার পাশাপাশি সেই চেকের সত্যতা শতভাগ নিশ্চিত করে, অর্থাৎ সেই চেকে যে কোনোরকম সমস্যা নেই এবং চেকের অর্থ পাওয়ার সম্পূর্ণ নিশ্চয়তা আছে, সেটা নিশ্চিত করে চেকের মালিক হবেন, তখনই একজন ব্যক্তি চেকের ‘হোল্ডার ইন ডিউ কোর্স’ হিসেবে গণ্য হবেন।
‘হোল্ডার’ হওয়ার জন্য একটি শর্ত পূরণ করলেই চলে, তা হচ্ছে চেকটা প্রাপকের নিজের অধিকারে রাখা। ‘হোল্ডার ফর ভ্যালু’ হওয়ার জন্য দুটো শর্ত পূরণ করলেই হবে, অর্থাৎ প্রাপকের কাছে চেক থাকবে এবং চেকের উপযুক্ত মূল্য পরিশোধ করতে হবে। ‘হোল্ডার ইন ডিউ কোর্স’ হিসেবে গণ্য হতে হলে যুগপৎ তিনটি শর্ত পূরণ করতে হবে এবং সেগুলো হচ্ছে, চেকটা কাছে থাকতে হবে, চেকের উপযুক্ত মূল্য পরিশোধ করতে হবে এবং চেক গ্রহণের আগে শতভাগ নিশ্চিত হতে হবে যে চেকের সত্যতা নিয়ে বিন্দুমাত্র প্রশ্ন বা সংশয় নেই। এটা নিশ্চিত করার জন্য যা যা করা প্রয়োজন এবং যতগুলো পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ আছে, তার সবই করতে হবে। চেকের ক্ষেত্রে ‘হোল্ডার ইন ডিউ কোর্স’ হচ্ছে সর্বশ্রেষ্ঠ মালিকানা।
‘হোল্ডার ইন ডিউ কোর্স’-এর মালিকানা নিয়ে কোনোরকম প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। এ কারণেই একটা কথা বহুল প্রচলিত আছে যে, কোনো ব্যক্তি যদি ‘হোল্ডার ইন ডিউ কোর্স’ হিসেবে গণ্য হন, তাহলে তিনি নিজের চেয়েও উন্নত মালিকানা হস্তান্তর করতে পারেন (‘হোল্ডার ইন ডিউ কোর্স’ ক্যান ট্রান্সফার বেটার টাইটেল দ্যান হোয়াট হি ওর শি হ্যাজ)। এটা কীভাবে হতে পারে, তা ব্যাখ্যা করতে গেলে আরেক ধরনের আলোচনার প্রয়োজন, যার সুযোগ এখানে নেই। তাই অন্য কোনো পরিসরে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার চেষ্টা করব। হোল্ডার ইন ডিউ কোর্স-এর এমন বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণেই ব্যাংকাররা এই ধরনের মালিকানা আছেন এমন ব্যক্তিকে চেকের অর্থ প্রদানে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন এবং এই ধরনের পেমেন্টের ক্ষেত্রে ব্যাংকার আইনের দৃষ্টিতে সুরক্ষা পেয়ে থাকে।
আমি জানি, এই লেখাপড়ার পর অনেক বিদগ্ধ পাঠক, বিশেষ করে ব্যাংকারদের মনে নানামুখী প্রশ্নের অবতারণা হবে। অনেকেরই থাকবে আরও অনেক প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন এবং পাল্টা প্রশ্ন। সব প্রশ্নের সন্তোষজনক ব্যাখ্যাও আছে। কিন্তু সেসব প্রশ্নের বিষয় তো আর একটি পত্রিকার কলাম লেখার মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা সম্ভব নয়। বিষয়টা ভালোভাবে জানতে হলে নেগোসিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট অ্যাক্ট মনোযোগ দিয়ে পড়তে হবে একাধিকবার এবং এই আইনের ধারা ব্যাখ্যা করে যেসব বই প্রকাশিত হয়েছে, সেই বই পড়তে হবে। পাশাপাশি চেক প্রত্যাখ্যান এবং নেগোসিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট নিয়ে বিভিন্ন সময় দেওয়া উচ্চ আদালতের রায় পড়তে হবে। তাহলে যদি বিষয়টি সম্পর্কে একটা ভালো ধারণা পাওয়া যায়। লেখার শুরুতেই উল্লেখ করেছি যে, ‘হোল্ডার ইন ডিউ কোর্স’ বিষয়টি যেমন জটিল, তেমনি কঠিন এবং দুর্বোধ্য হচ্ছে নেগোসিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট অ্যাক্ট। তারপরও চেষ্টা করেছি, যতটা সম্ভব সহজ করে বিষয়টা আলোচনা করার। এতে যদি পাঠক এবং আগ্রহী ব্যাংকাররা বিষয়টা সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা পেতে পারেন, তাহলে চেষ্টা সার্থক।
নিরঞ্জন রায়
সার্টিফায়েড অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা