× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ঈদ বাজার

অর্থনীতি গতিশীল করতে ভূমিকা রাখে

সাদেকুর রহমান

প্রকাশ : ১৩ মার্চ ২০২৬ ১০:৩৮ এএম

জমতে শুরু করেছে ঈদের বাজার।

জমতে শুরু করেছে ঈদের বাজার।

মুসলিম বিশ্বের দুইটি বড় ধর্মীয় উৎসব রয়েছে। ঈদুল ফিতর এর মধ্যে একটি। এটি উদযাপিত হয় আরবি শাওয়াল মাসের প্রথম দিন। এক মাস সিয়াম সাধনার পরে এই দিনটি মুসলিমদের মাঝে আনন্দের বন্যা নিয়ে আগমন করে। শুধু বাংলাদেশের মুসলিমদের জন্য নয়, সারা বিশ্বের মুসলিমদের কাছে এটি আনন্দ ও ভ্রাতৃত্বের প্রতীক। ঈদুল ফিতরের ধর্মীয় ও সামাজিক প্রভাবের সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রভাব রয়েছে। বাংলাদেশের মতো উৎসবপ্রবণ দেশে ঈদ শুধু আনন্দের উপলক্ষ হয়েই আসে না, অর্থনীতির চাকাকে গতিশীল করতেও ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশে প্রতিবছর ঈদ উপলক্ষে বিভিন্ন খাতে লাখো কোটি টাকা খরচ হয়। 

ঈদ অর্থনীতি বলতে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বোঝায়। সাধারণত পুরো রমজান মাস ধরেই এটি চলমান থাকে। তবে রমজানের শেষের দশ দিন থেকে শুরু হয়ে ঈদের পরের কয়েক দিন পর্যন্ত গতি বেশি থাকে। এই সময়ে ভোগ্যপণ্যের চাহিদা অনেক বেড়ে যায়। তবে ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে দেশে বিপুল অর্থনৈতিক লেনদেন হয়। এই বিপুল লেনদেনের পেছনে রয়েছে বিভিন্ন উৎস। এগুলো হলোÑ ১। উৎসব ভাতা, ২। প্রবাসী আয়, ৩। জাকাত ও ফিতরা, ৪। সঞ্চয় ভাঙানো। 

পোশাক খাতকে ঈদের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশে ঈদ উপলক্ষে নতুন পোশাক কেনা একটি সামাজিক রীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। সাধারণত সকল শ্রেণির পরিবারই এই সময় নতুন জামা ক্রয় করে থাকে। এই সময় পোশাক খাতে কত টাকার পোশাক বিক্রি হয়, এটি নিয়ে কোনো সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। কিন্তু অনুমান করা হয় যে, ২০২৫ সালে প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকার তৈরি পোশাক বিক্রি হয়েছে। পোশাক খাত শুধু বিপণিবিতান ও ব্র্যান্ডেড দোকান দিয়ে বিবেচনা করলে হবে না। রাস্তার পাশের ছোট দোকান, হাটবাজার ও অনলাইন প্লাটফর্মও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই সময় শুধু শহরের দোকানগুলোতে নয়, পাশাপাশি সারা দেশের গ্রামের বাজারগুলোতে নতুন পোশাক কেনার ধুম পড়ে যায়।

ঈদুল ফিতরের সময় প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। প্রবাসীরা ঈদ উপলক্ষে পরিবারের কাছে বেশি পরিমাণ অর্থ প্রেরণ করেন। সরকারের হিসাবেও এটি দেখা যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের ৮ মার্চের তথ্য অনুযায়ী চলতি মাসের (মার্চ) প্রথম সাত দিনে রেমিট্যান্স এসেছে ১০৬ কোটি ৯০ লাখ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৩ হাজার ৪১ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এর মধ্যে গত ৩ দিনেই (৫ থেকে ৭ মার্চ) এসেছে ৩ হাজার ৮৪৩ কোটি টাকা। এই বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করবে। একই সঙ্গে এটি ডলারের সংকট কমাতে সাহায্য করবে। 

রমজান মাস ও ঈদ ঘিরে খাদ্যপণ্যের বাজারেও বিপুল লেনদেন হয়। ঈদের সময় ইফতার ও সেহরির বাজার, মসলার বাজার এবং মিষ্টান্নের বাজার বিশেষভাবে জমজমাট থাকে।

বাংলাদেশের মানুষ ভোজনরসিক। ইফতারের সময় ছোলা, মুড়ি, খেজুর, জিলাপি, পেঁয়াজু, বেগুনি, হালিম, চপ ইত্যাদি কেনার ধুম লেগে যায়। এর ফলে দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। অনেকের ধারণা দেশে ইফতার সামগ্রীর বাজারই শতকোটি টাকার বেশি। বাংলাদেশে ঈদের দিন সকালে সেমাই, পায়েস, বিভিন্ন ধরনের পিঠাপুলি ও মিষ্টিজাতীয় খাবার প্রতিটি পরিবারেই খাবার টেবিলে দেখা যায়। এগুলোর পাতে আসার পেছনে কাজ করেছে বিভিন্নজন। 

প্রতি ঈদে রাজধানী ঢাকা জনশূন্য হয়ে পড়ে। ঈদ সামনে রেখে ঢাকাতে বসবাসরত মানুষের একটি বড় অংশ গ্রামে চলে যায়। কিছুদিন পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য ও শেকড়ের টানে। এই যাতায়াতকে শুধু আবেগ দিয়ে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। এই আবেগের পিছনে আছে, বিশাল অর্থনৈতিক বিনিয়োগও। মানুষের এই যাত্রার কারণে , যাত্রী পরিবহন খাতে হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়। পরিবহন বিশ্লেষক এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. হাদীউজ্জামানের ২০২৩ সালের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, ঈদের আগের চার দিনে ঢাকা ছাড়েন অন্তত ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ। বিপুলসংখ্যক মানুষ ঢাকা ত্যাগের কারণে পরিবহনের সকল জায়গায় এর প্রভাব পড়ে। লাখ লাখ মানুষ বাস, ট্রেন, লঞ্চ, মাইক্রোবাস, প্রাইভেট কার, মোটরসাইকেল ও অন্যান্য যানবাহনে করে নিজ নিজ গন্তব্যে পৌঁছেন। এই যাত্রাপথে প্রতি জনের খরচ পড়ে কয়েকশ থেকে কয়েক হাজার টাকা। ঈদের সময় যাতায়াত ভাড়া বাবদ কয়েক হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়। 

ঈদের সময় অনেক পরিবার গ্রামের বাড়ি যাওয়ার পাশাপাশি পর্যটন কেন্দ্রগুলোতেও ভ্রমণ করতে যায়। এর ফলে পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। এর ফলে পর্যটকরা স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। 

বর্তমান ডিজিটাল যুগে ঈদের কেনাকাটায় ইলেকট্রনিক্স ও প্রযুক্তি পণ্যের চাহিদা ক্রমশ বাড়ছে। মানুষজন স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, টেলিভিশন, রেফ্রিজারেটর, এসি ইত্যাদি পণ্যে ক্রয়ের ব্যাপারে আগ্রহী থাকে। বর্তমানে বাংলাদেশে অনলাইন কেনাকাটার প্রবণতা বহুগুণ বেড়েছে। ই-কমার্স প্লাটফর্মগুলো ক্রেতাদের আকর্ষণ করার জন্য বিভিন্ন অফার দিয়ে থাকে। অনলাইন কেনাকাটার পাশাপাশি ডিজিটাল পেমেন্টের ব্যবহারও বেড়েছে। এর ফলে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে যেমনÑ বিকাশ, নগদের পরিচিতি সাধারণ মানুষদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। এতে করে আর্থিক খাতের সক্রিয়তা বাড়ছে।

ঈদের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় অংশীদার হলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা। ঈদে নকশিকাঁথা, কুটিরশিল্পের পণ্য, হস্তশিল্প, মৃৎশিল্প, বাঁশ ও বেতের তৈরি পণ্যের চাহিদা বেড়ে যায়। এই পণ্যগুলোর বিপণন গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ঈদ উপলক্ষে বিভিন্ন খাতে সাময়িক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। পোশাকের দোকানে অতিরিক্ত বিক্রয়কর্মী নিয়োগ, পরিবহন খাতে অতিরিক্ত চালক ও হেলপার নিয়োগ, ইফতার ও খাদ্যের দোকানে অতিরিক্ত শ্রমিক নিয়োগ ইত্যাদির মাধ্যমে বহু মানুষের সাময়িক কর্মসংস্থান হয়। সরকারি-বেসরকারি কর্মচারীদের বোনাস, জাকাত ও ফিতরা প্রদানের মাধ্যমে সমাজে সম্পদের পুনর্বণ্টন হয়। ধনীদের কাছ থেকে সংগৃহীত জাকাত ও ফিতরা দরিদ্র মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হয়। এর ফলে তাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ে। এতে বাজারে চাহিদা সৃষ্টি হয়। 

ঈদের সময় পণ্যের চাহিদা বেড়ে যাওয়ার ফলে সাধারণত পণ্যের দাম বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে ভোগ্যপণ্য, কাঁচাবাজার ও পরিবহন খাতে দাম বেড়ে যায়। সরকার দাম নিয়ন্ত্রণের জন্য বিভিন্ন সময় বাজার মনিটরিং ও নিত্যপণ্যের আমদানি শুল্ক হ্রাস করে থাকে। ঈদ উপলক্ষে ব্যাংকিং লেনদেনে গতি আসে। বিপুল পরিমাণ অর্থ উত্তোলন, বিনিময় ও জমা হয় ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে। এ ছাড়া প্রবাসী আয়ের বিপুল অংশ ব্যাংকিং মাধ্যমে আসে। ডিজিটাল ব্যাংকিং ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের লেনদেনও বহুগুণ বেড়ে যায়।

ঈদযাত্রার সময় পরিবহন টিকিটের কালোবাজারি একটি পুরনো সমস্যা। যাত্রীরা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি দামে টিকিট কিনতে বাধ্য হন। সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এই সমস্যা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলেও সম্পূর্ণ প্রতিরোধ করা সম্ভব হয় না। ঈদ অর্থনীতি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বড় সম্ভাবনা তৈরি করেছে। নারী উদ্যোক্তারা ঘরে বসে বিভিন্ন পণ্য তৈরি করে অনলাইনে বিক্রি করছেন। ঈদ উপলক্ষে তাদের পণ্যের চাহিদা বাড়ছে।

বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনা অপরিসীম। ঈদের সময় পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে দেশি-বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা বাড়ছে। এই খাতের অবকাঠামো ও সেবার মান উন্নত করা গেলে ঈদ অর্থনীতিতে এর অবদান আরও বাড়বে।


সাদেকুর রহমান

গবেষণা কর্মকর্তা, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড

ঈদুল ফিতর বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। এটি শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখার একটি বড় মাধ্যম। পোশাক খাত থেকে শুরু করে খাদ্য, পরিবহন, পর্যটন, ইলেকট্রনিক্স ও সেবা খাতÑ সবকিছু মিলিয়ে ঈদ উপলক্ষে হাজার হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়, যা দেশের জিডিপিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে। 

ঈদুল ফিতর ও বাংলাদেশের অর্থনীতি একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ধর্মীয় মূল্যবোধ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের এই সেতুবন্ধন বাংলাদেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোতে এক অনন্য বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচিত। আগামী দিনে ঈদ অর্থনীতির এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে একটি সমৃদ্ধ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তোলাই আমাদের  প্রত্যাশা।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা