ঢাকা শহর যেন মার্কেট প্লেস
জাকির হোসেন
প্রকাশ : ১২ মার্চ ২০২৬ ১২:২৬ পিএম
আপডেট : ১২ মার্চ ২০২৬ ১২:২৬ পিএম
ঢাকার বিভিন্ন সড়কে ধীরগতির রিকশা ও দ্রুতগতির বাস-গাড়ি চলাচল করায় গতির বৈচিত্র্য তৈরি হয়, যা যানজট বাড়ায়। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
গোটা ঢাকা শহর যেন একটা মার্কেট প্লেস। সড়কের দুই ধারজুড়ে বিভিন্ন দোকান, শপিং মল, অফিস, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ নানা বাণিজ্যিক স্থাপনা। রাজধানীর কুড়িল থেকে মালিবাগ-মৌচাক, মালিবাগ থেকে বাংলামোটর, মালিবাগ থেকে কাকরাইল, ধানমন্ডির সায়েন্সল্যাব থেকে কলেজ গেট, কিংবা পান্থপথ, গ্রিনরোড, আগারগাঁও থেকে মিরপুর-১২, মিরপুর-১০ থেকে মিরপুর-১ এমন কোনো সড়ক কি পাওয়া যাবে সেখানে বাণিজ্যিক কেন্দ্র নেই। এসব বাণিজ্যিক স্থাপনায় প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের আনাগোনা থাকছে। এছাড়া এসব সড়কে যেটুকু ফুটপাত থাকে তা থাকে ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীদের দখলে। এসব ব্যবসায়ীর কারণে ফুটপাত দিয়ে মানুষ সহজে হাঁটাচলা করতে পারে না। তেমনি সড়কের কিছু অংশজুড়ে অবস্থান নেওয়ায় রাস্তা সংকুচিত হয়ে পড়ে। এরপর আছে যানবাহনের নিয়ম ভাঙার লড়াই। পাবলিক বাসগুলো যেখানে সেখানে যাত্রী ওঠানামা করছে। বাসগুলো এমনভাবে দাঁড় করিয়ে রাখে, যাতে কেউ তাকে ডিঙাতে না পারে। এর ফলে সড়কগুলোতে দিনভর যানজট লেগেই থাকে। এটা আমাদের নিত্যদিনের চিত্র। বিষয়টি এমনÑ আমরা সবাই জানি, দেখছি, বুঝছি কিন্তু পরিত্রাণ নেই।
২০২৪-২৫ সালে প্রকাশিত বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকায় যানজটের কারণে প্রতিদিন প্রায় ৮২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়। অর্থমূল্যে যা দৈনিক প্রায় ১৩৯ কোটি এবং বছরে ৫০ হাজার কোটি টাকা। এরপর আরও আছে যানজট থেকে মুক্তি পেতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ প্রকল্প। যেগুলোর পেছনেও সরকারকে গুনতে হয় কোটি কোটি টাকা। কিন্তু ফলাফল একই। তবে সরকারের উদ্যোগগুলো কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে বা হচ্ছে সেটা নিয়ে প্রশ্ন আছে। শুধু সমাধান হচ্ছে না বললে তো হবে না। সরকারের উদ্যোগ এবং বাস্তবায়ন কোনোটাই চূড়ান্তভাবে কাজ করে না। এ কারণে বিশ্বের অন্যান্য দেশে যেসব পদ্ধতি ব্যবহার করে যানজট নিরসন করা গেছে বা সুফল পাওয়া গেছে, আমরা তা পাইনি।
ঢাকা আজ বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ ও ব্যস্ত মহানগরীর একটি। দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক ও শিক্ষাকেন্দ্র হওয়ায় প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষ কাজ, শিক্ষা ও ব্যবসার প্রয়োজনে শহরের বিভিন্ন প্রান্তে চলাচল করে। কিন্তু এই বিপুল জনচাপের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গড়ে ওঠেনি কার্যকর ও সমন্বিত ট্রাফিক ব্যবস্থা। ফলে যানজট, বিশৃঙ্খলা, সময় অপচয়, পরিবেশ দূষণ এবং জনদুর্ভোগ ঢাকার নিত্যদিনের চিত্র।
ঢাকার সড়ক অবকাঠামো শহরের জনসংখ্যা ও যানবাহনের তুলনায় অত্যন্ত সীমিত। শহরের মোট আয়তনের তুলনায় সড়কের পরিমাণ আন্তর্জাতিক মানের চেয়ে কম। এর ওপর প্রতিনিয়ত বাড়ছে ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেল, সিএনজি, রিকশা ও বাসের সংখ্যা। একই সড়কে ধীরগতির রিকশা ও দ্রুতগতির বাস-গাড়ি চলাচল করায় গতির বৈচিত্র্য তৈরি হয়, যা যানজট বাড়ায়। অপরিকল্পিত নগরায়ণও বড় কারণ। আবাসিক এলাকা, বাণিজ্যিক কেন্দ্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি অফিস একই অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত হওয়ায় নির্দিষ্ট সময়ে যানবাহনের চাপ বহুগুণ বেড়ে যায়।
যানজট ও সড়কের অব্যবস্থাপনা নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। বিভিন্ন সরকার বিভিন্নভাবে এ সমস্যার সুরাহার চেষ্টা করেছে। এতে নগরীতে ফ্লাইওভার হয়েছে, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, মেট্রোরেলের মতো স্থাপনা হয়েছে। রাস্তা প্রশস্ত হয়েছে। নতুন রাস্তা তৈরি হয়েছে। কিছু ফুটপাত হয়েছে। কিন্তু সুফল পাচ্ছে না শহরবাসী। যানজট যেন নগরবাসীর নিত্যদিনের সঙ্গী।
রাজধানীর নগর পরিকল্পনা নিয়ে নানা উদ্যোগ কাজে লাগেনি। এর প্রধান কারণ জনগণ তা চাননি। আমি তো মনে করি জনগণ যদি চায় তবে যানজটের সংকট অনেকটাই কমে আসবে। সেটা হলো আইন মেনে চলা। ধরুন বাসগুলো যেখানে সেখানে যাত্রী ওঠানামা করায়। আর যাত্রীরাও যেখান সেখান থেকে বাসে উঠতে হাত বাড়ায়। একদিন যদি এমন হয় স্টপেজ ছাড়া কোনো বাস থামবে না। কোনো যাত্রী ওঠানামা করবে না। বাসগুলো রাস্তা বন্ধ করে দাঁড়াবে না। কোনো স্টপেজে এক মিনিটের বেশি অবস্থান করবে না। লেন ধরে চলাচল করবে। আশা সেদিন ঢাকার যানজট ৫০ শতাংশ কমে যাবে। এতে কারও কোনো আর্থিক ক্ষতি হবে না। যানজটের কারণে যে বাসটি দিনে তিনটি রাউন্ড ট্রিপ দেয় সে চারটি দিতে পারবে। যাত্রীরা গন্তব্যে যেতে পারবে সময়মতো। ফুটপাতে ব্যবসা করার জন্য আইনগত বৈধতা নেই। কিন্তু সরকার যখনই ফুটপাত দখলমুক্ত করার চেষ্টা করে তখনই ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীরা আন্দোলন করে। যেটা অন্যায্য ও অবৈধ।
ঢাকায় গণপরিবহন ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ন্ত্রিত ও অসংগঠিত। একই রুটে বহু কোম্পানির বাস চলাচল করে, যাদের মধ্যে সমন্বয় নেই। যাত্রী তোলার প্রতিযোগিতায় বাসগুলো রাস্তার মাঝখানে থেমে যায়, হঠাৎ লেন পরিবর্তন করে বা নিয়ম ভঙ্গ করে। এতে দুর্ঘটনা ও যানজট উভয়ই বৃদ্ধি পায়। যদি আইন মেনে চলতে তাকে বাধ্য করা যেত এই ধরুন বড় অঙ্কের জরিমানা, ৫ বার আইন ভাঙার কারণে চালকের লাইসেন্স সাময়িক সময়ের জন্য স্থগিত হতো, ১০ বার আইন ভাঙার কারণে তার লাইসেন্স বাতিল হতো, তবে হয়তো কিছুটা হলেও চালকরা আইন মানার প্রতিযোগিতা করত। ট্রাফিক সার্জেন্টদের সঙ্গে চালকরা তর্ক করেন। লাইসেন্সের মেয়াদোত্তীর্ণ হলেও লাইসেন্সের সঙ্গে কিছু টাকা গুঁজে দেন। এতে চালকরা ছাড়া পেয়ে যায়। এসব অনিয়ম রোধ করতে সার্জেন্টদেরও মনিটরিংয়ের আওতায় আনা গেলে কিছুটা উন্নতি হতে পারে যানজটের চিত্র।
যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডন বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত, ঐতিহাসিক ও বহুজাতিক মহানগর। প্রায় এক কোটিরও বেশি মানুষের এই শহরে প্রতিদিন কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসা ও পর্যটনের কারণে যাতায়াতের প্রয়োজন হয়। এত বিপুল জনচাপ সত্ত্বেও লন্ডনের পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা বিশ্বে অন্যতম দক্ষ, সমন্বিত ও প্রযুক্তিনির্ভর বলে বিবেচিত। এই ব্যবস্থার মূল শক্তি হলো পরিকল্পনা, শৃঙ্খলা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং নাগরিক সচেতনতা।
রাজধানীর বাসস্ট্যান্ডের নির্দিষ্টতা ও শৃঙ্খলার অভাবও সমস্যা। অনেক যাত্রী রাস্তার যেকোনো জায়গায় দাঁড়িয়ে বাসে ওঠানামা করে। ফলে যান চলাচল ব্যাহত হয়। যানবাহন চালকদের একটি বড় অংশ ট্রাফিক আইন যথাযথভাবে মানে না। লালবাতি অমান্য করা, উল্টো পথে গাড়ি চালানো, হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো বা ওভারলোডিংÑ এসব সাধারণ ঘটনা। আইন থাকলেও তার কার্যকর প্রয়োগে ঘাটতি রয়েছে।
ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে একাধিক সংস্থা জড়িতÑ সিটি করপোরেশন, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, ট্রাফিক পুলিশ, পরিবহন মালিক সমিতি ইত্যাদি। কিন্তু এদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রায়ই অনুপস্থিত। রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি, ড্রেন নির্মাণ বা উন্নয়নকাজ প্রায়ই সমন্বয় ছাড়া করা হয়। ফলে একই সড়কে বারবার কাজ হয় এবং দীর্ঘস্থায়ী যানজট তৈরি হয়।
আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনায় স্মার্ট ট্রাফিক সিগন্যাল, ক্যামেরা নজরদারি ও ডেটা-নির্ভর পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ঢাকায় কিছু স্থানে সিগন্যাল থাকলেও অনেক সময় তা অকার্যকর থাকে বা ম্যানুয়ালি পরিচালিত হয়। ফলে যানবাহনের প্রবাহ সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।
গণপরিবহন খাতকে রুটভিত্তিক ও কোম্পানিভিত্তিক সমন্বয়ের আওতায় আনতে হবে। নির্দিষ্ট রুটে নির্দিষ্ট সংখ্যক বাস পরিচালনা, নির্ধারিত স্টপেজে ওঠানামা বাধ্যতামূলক করা এবং ই-টিকেটিং চালু করা যেতে পারে। বড় বাস ও মানসম্মত সার্ভিস চালু করলে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমবে। একটু লক্ষ করলে দেখা যায়, রাজধানীতে চলাচল করা বাসগুলো বেশিরভাগই মিনিবাস। এতে খুব বেশি যাত্রী একটি বাসে চলাচল করতে পারে না। যদি বড় বাস বা দোতলা বাসের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করা যায়, এতে এক বাসে অধিক যাত্রী পরিবহন যেমনি সম্ভব তেমনি পরিবহন মালিকরাও বেশি ব্যবসা করার সুযোগ পাবে। মেট্রোরেল ও বিআরটি প্রকল্পগুলোর কার্যকারিতা বাড়াতে সেগুলোর সঙ্গে বাস ও রিকশা নেটওয়ার্কের সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে যাত্রীরা সহজে এক মাধ্যম থেকে অন্য মাধ্যমে যেতে পারে। ট্রাফিক আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। ডিজিটাল ক্যামেরা ও অটোমেটেড ফাইন সিস্টেম চালু করলে আইন প্রয়োগে স্বচ্ছতা বাড়বে। লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়া কঠোর করা এবং চালকদের প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা জরুরি। পথচারীদেরও সচেতন করতে গণসচেতনতামূলক কর্মসূচি প্রয়োজন। স্কুল-কলেজ পর্যায়ে ট্রাফিক শিক্ষাকে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
লন্ডনের পরিবহন ব্যবস্থা পরিচালনা করে ট্রান্সপোর্ট ফর লন্ডন। এটি একটি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা, যা বাস, আন্ডারগ্রাউন্ড, ওভারগ্রাউন্ড, ট্রাম, ডিএলআর, কিছু নৌপরিবহন এবং সাইকেল ভাড়া সেবা সমন্বিতভাবে পরিচালনা করে। একক কর্তৃপক্ষের অধীনে পরিচালিত হওয়ায় নীতিনির্ধারণ, ভাড়া কাঠামো, সময়সূচি ও প্রযুক্তি ব্যবহারে সমন্বয় বজায় থাকে। আমরা হয়তো পুরো সিস্টেমটি এখানে চালু করতে পারব না। তবে কিছু কিছু বিষয় তো নিতেই পারি, যেটা আমাদের স্বার্থে ব্যবহার করা যায়। একীভূত টিকেটিং ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। যাতে যাত্রীরা প্রবেশ ও প্রস্থানের সময় কার্ড ‘ট্যাপ ইন’ ও ‘ট্যাপ আউট’ করেন। ভাড়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে গণনা হয়।
পাবলিক বাইক-শেয়ারিং সেবা চালু করা যেতে পারে। নির্দিষ্ট স্টেশন থেকে সাইকেল নিয়ে অন্য স্টেশনে জমা দেওয়া যায়। এতে স্বল্প দূরত্বে পরিবেশবান্ধব যাতায়াত সহজ হয়েছে। যাত্রীদের পথ চলার সময় বাঁচে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মানসিকতার পরিবর্তন। আমরা যদি নিজেরা নিয়ম মানি, অন্যকেও মানতে উৎসাহিত করি, তাহলে অনেক সমস্যাই কমে আসবে।
জাকির হোসেন
সাংবাদিক ও সংবাদ বিশ্লেষক