সরকারের চ্যালেঞ্জ
মো. মোয়াজ্জেম হোসেন বাদল
প্রকাশ : ১২ মার্চ ২০২৬ ১২:১৫ পিএম
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথগ্রহণকালে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ছবি: বিএনপি মিডিয়া সেল
সরকার পরিচালনার প্রথম শর্তই হলো স্থিতিশীলতা। নির্বাচনের পরপরই অনেক সময় প্রতিহিংসা, সহিংসতা বা প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করার প্রবণতা দেখা যায়। এই পরিস্থিতি যদি নিয়ন্ত্রণে না আনা যায়, তবে উন্নয়ন ও সংস্কারের এজেন্ডা বাধাগ্রস্ত হবে। সবার আগে প্রয়োজন প্রশাসনকে নিরপেক্ষ ও পেশাদারভাবে কাজে লাগানো, দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখা এবং স্পষ্ট বার্তা দেওয়াÑ আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। এই ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সহনশীলতা ও আলোচনার সংস্কৃতি গড়ে তোলাও জরুরি। বিরোধী মতকে দমন নয়, বরং গণতান্ত্রিক পরিসরে স্থান দেওয়াÑ এটাই একটি দায়িত্বশীল সরকারের পরিচয়।
এ কথা সত্য যে, নতুন সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছে এক জটিল অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা এবং দীর্ঘদিনের নীতি-অসামঞ্জস্যের প্রভাবে অর্থনীতির ওপর বহুমুখী চাপ তৈরি হয়েছে। এর সবচেয়ে বড় প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে মূল্যস্ফীতিতে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠেছে। ফলে সরকারের প্রথম ও প্রধান চ্যালেঞ্জÑ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা এবং অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা।
বর্তমানে খাদ্য ও জ্বালানি খাতে মূল্য বৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে। বাজারে চাল, ডাল, তেল, সবজি থেকে শুরু করে প্রায় সব পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে। আয় বৃদ্ধি না পেয়ে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাস্তব আয় কমে যাচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ডলারের সংকট, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং ব্যাংকিং খাতে তারল্য সমস্যা। বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংক মুদ্রানীতি কঠোর করার মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। সুদের হার সমন্বয়, বাজারে তারল্য নিয়ন্ত্রণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে শুধু মুদ্রানীতির মাধ্যমে এই সংকট পুরোপুরি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়; প্রয়োজন সমন্বিত রাজস্ব ও বাণিজ্যনীতি।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সঙ্গে ঋণচুক্তি বাস্তবায়নের শর্তও অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে। ভর্তুকি কমানো, কর আদায় বাড়ানো এবং আর্থিক খাতে সংস্কারের মতো পদক্ষেপগুলো দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক হলেও স্বল্পমেয়াদে জনগণের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। তাই সরকারকে ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল নিতে হবেÑ একদিকে সংস্কার, অন্যদিকে সামাজিক সুরক্ষা। রাজস্ব ঘাটতি ও উন্নয়ন ব্যয়ের চাপও বড় সমস্যা। মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং অবকাঠামো উন্নয়নে বিপুল অর্থ প্রয়োজন। কিন্তু রাজস্ব আহরণ কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়ছে না। কর ফাঁকি, অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতি এবং দুর্বল প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা রাজস্ব ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে ডিজিটালাইজেশন ও স্বচ্ছতা জরুরি।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাজার তদারকি জোরদার করা প্রয়োজন। কৃত্রিম সংকট, মজুদদারি ও সিন্ডিকেট ভাঙতে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে কৃষি উৎপাদন বাড়ানো, সরবরাহ চেইন উন্নত করা এবং ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিতরণ কার্যক্রম বিস্তৃত করা দরকার। নিম্ন-আয়ের মানুষের জন্য টিসিবি কার্যক্রম ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি আরও কার্যকর করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আস্থা পুনর্গঠন। বিনিয়োগকারীদের আস্থা, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা এবং নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত না হলে অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আসবে না। নতুন সরকারের সামনে তাই দ্বৈত চ্যালেঞ্জÑ একদিকে তাৎক্ষণিক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কার।
অর্থনৈতিক চাপ কাটিয়ে উঠতে সুসমন্বিত পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা অপরিহার্য। মূল্যস্ফীতি যদি নিয়ন্ত্রণে আনা যায় এবং বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসে, তবে নতুন সরকার জনগণের আস্থা অর্জনে সক্ষম হবে। আর সেই আস্থাই হবে টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি। তাই, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বাজার তদারকি জোরদার, কৃষি উৎপাদনে প্রণোদনা এবং দুর্নীতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে থাকা সিন্ডিকেট ভাঙার কার্যকর উদ্যোগ এখনই নিতে হবে। অর্থনীতিতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম, খেলাপি ঋণ ও সুশাসনের ঘাটতি বহু দিনের সমস্যা। একটি শক্তিশালী অর্থনীতি গড়তে হলে আর্থিক খাতকে সুসংগঠিত ও স্বচ্ছ করতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা, জবাবদিহিতা বৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নীতিনির্ধারণÑ এসব বিষয়ে দৃশ্যমান পদক্ষেপ প্রয়োজন। খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার, দুর্নীতিবিরোধী অভিযান এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা সম্ভব নয়।
জনগণের অন্যতম প্রত্যাশা দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স। শুধু বক্তব্যে নয়, বাস্তবে কঠোরতা দেখাতে হবে। ক্ষমতার পরিবর্তন যেন কেবল মুখ বদলের রাজনীতি না হয়, বরং ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটে। দুর্নীতি একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন, ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য বড় বাধা। এটি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই করে না, মানুষের আস্থা নষ্ট করে এবং সামাজিক বৈষম্য বাড়ায়। তাই টেকসই উন্নয়ন ও কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য দুর্নীতি দমন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য।
সুশাসনের মূল ভিত্তি হলো স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও আইনের শাসন। সরকারি ক্রয়, নিয়োগ, উন্নয়ন প্রকল্প ও ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ডিজিটাল পদ্ধতি সম্প্রসারণ জরুরি। ই-গভর্ন্যান্স ও অনলাইন সেবা বাড়ালে মধ্যস্বত্বভোগী কমে এবং অনিয়মের সুযোগ সংকুচিত হয়। একই সঙ্গে তথ্য অধিকার আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করলে নাগরিকদের নজরদারি বাড়ে।
বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার বড় অংশই তরুণ। এই বিশাল যুবশক্তি দেশের উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি হতে পারে, যদি তাদের জন্য পর্যাপ্ত ও টেকসই কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা যায়। কিন্তু শিক্ষিত বেকারত্ব, দক্ষতার ঘাটতি এবং সীমিত শিল্পায়ন আজ যুব সমাজের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক তরুণ উচ্চশিক্ষা শেষ করেও উপযুক্ত চাকরি পাচ্ছেন না। আবার শিল্প ও প্রযুক্তি খাতে প্রয়োজনীয় দক্ষতা না থাকায় কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হয়ে যাচ্ছে। তাই শিক্ষাব্যবস্থাকে বাজারচাহিদার সঙ্গে সমন্বয় করা জরুরি। কারিগরি ও প্রযুক্তিভিত্তিক প্রশিক্ষণ, স্টার্টআপ সহায়তা এবং উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ বাড়াতে হবে।
আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাস্তবতায় ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অপরিহার্য। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখা প্রয়োজন। বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তা, ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও বৈদেশিক বিনিয়োগের চ্যালেঞ্জÑ এসব মোকাবিলায় কূটনৈতিক দক্ষতা এখন বড় পরীক্ষা।
নির্বাচনের সময় দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোই এখন সরকারের প্রতি জনগণের প্রত্যাশার মানদণ্ড। অবাস্তব প্রতিশ্রুতি বা সময়ক্ষেপণ আস্থার সংকট তৈরি করবে। তাই অগ্রাধিকারভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা, সময়সীমা নির্ধারণ এবং নিয়মিত অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রকাশের মাধ্যমে জনগণকে সম্পৃক্ত রাখা জরুরি। আমি মনে করি, এখন সময় রাষ্ট্রগঠনের, রাজনৈতিক সংঘাতের নয়। এখন সময় কথার নয়, কাজের। বিএনপির সামনে চ্যালেঞ্জ বড় কিন্তু সঠিক দিকনির্দেশনা ও দৃঢ় সদিচ্ছা থাকলে সেই চ্যালেঞ্জই হতে পারে সাফল্যের ভিত্তি।
মো. মোয়াজ্জেম হোসেন বাদল
কলাম লেখক ও শিল্পোদ্যোক্তা