× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ফেসবুক আসক্তি

যুবসমাজের মধ্যে সংকট তৈরি করছে

ড. মুনীরউদ্দিন আহমদ

প্রকাশ : ১১ মার্চ ২০২৬ ১৪:৪৮ পিএম

ড. মুনীরউদ্দিন আহমদ; প্রফেসর, ফার্মেসি বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি এবং সাবেক ডিন, ফার্মেসি অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

ড. মুনীরউদ্দিন আহমদ; প্রফেসর, ফার্মেসি বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি এবং সাবেক ডিন, ফার্মেসি অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

২০১৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত বিশ্বে প্রতি মাসে ফেসবুক ব্যবহারকের (ইউজার) সংখ্যা ছিল ১.৪০ বিলিয়ন বা ১৪০ কোটি। ২০২৫ সালের প্রথম দিকের হিসাব মতে, এই সংখ্যা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৩.০৭ বিলিয়ন বা ৩০৭ কোটিতে। এর মধ্যে ৯৮ শতাংশই মোবাইল ফেসবুক ব্যবহারক। এক হিসাব মতে, ফেসবুকে প্রতিদিন আনুমানিক ৩০ থেকে ৩৫ কোটি ছবি, ৪ থেকে ৮০০ কোটি স্ট্যাটাস ও ভিডিও আপলোড করা হয়। প্রতিদিন ব্যবহারকরা ফেসবুকে ১০ কোটি ঘণ্টা ব্যয় করে। গুগলে যত সময় ব্যয় করা হয়, মানুষ ফেসবুকে তার চেয়ে দ্বিগুণ সময় ব্যয় করে থাকে। ফেসবুকের মাধ্যমে ব্যবহারকরা ছবি, লিংক, ভিডিও, বিভিন্ন স্ট্যাটাস আপলোড, শেয়ার ও কমেন্ট করতে পারে। এ ছাড়াও ফেসবুকে বিভিন্ন খেলাধুলার ব্যবস্থা রয়েছে, রয়েছে হরেক রকম অ্যাপ্লিকেশন যার মাধ্যমে পরিবারের সদস্য, আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে বার্তা আদান-প্রদান ও খোশগল্প বা চ্যাট করার ব্যবস্থা। 

ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যার দিক থেকে শীর্ষস্থানে রয়েছে ভারত। ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৬০ কোটির বেশি। ২৮ কোটি ফেসবুক ব্যবহারকারী নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইন্দোনেশিয়ায় ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২০ কোটি। চতুর্থ ও পঞ্চম স্থানে রয়েছে ব্রাজিল ও মেক্সিকো, ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা যথাক্রমে ১৮ ও ১১ কোটি। ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যার দিক থেকে দশটি শীর্ষস্থানীয় দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান অষ্টম। ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা আনুমানিক ৫ থেকে ৭ কোটি। এ ছাড়াও দশটি শীর্ষস্থানীয় দেশের মধ্যে রয়েছে ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও পাকিস্তান।

২০০৪ সালে বন্ধু ডাস্টিন ও ক্রিসের সঙ্গে মার্ক জাকারবার্গ (জার্মানরা বলেন সুকারবার্গ) ফেসবুক চালু করেন। সীমিত সংখ্যক বন্ধুবান্ধব ও স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে এই মাধ্যম সীমাবদ্ধ রাখা ছিল জাকারবার্গের প্রাথমিক ইচ্ছা। কিন্তু উদ্বোধনের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বারোশ ছাত্রছাত্রী ফেসবুকে ‘সাইন আপ’ করে ফেলল। 

তার পরের ঘটনা শুধু ইতিহাস। সারা বিশ্বে ফেসবুক ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে পড়ল। ফেসবুক বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সামাজিক গণসংযোগ মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। বন্ধুত্ব, যোগাযোগ স্থাপন ও বিনোদনের জন্য যে মাধ্যমটি একসময় চালু করা হয়েছিল তা আজ বিশ্বের লাখো কোটি মানুষের জন্য ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও স্বাস্থ্য সমস্যার এক বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত বলে ইদানীং আমার মনে একটি প্রাসঙ্গিক প্রশ্নের উদয় হয়েছে। অবশ্য এই প্রশ্ন নতুন নয়। বহুদিন আগ থেকেই মনোবিজ্ঞানী ও চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা এই প্রশ্ন নিয়ে ভাবছেন এবং উত্তর খুঁজতে চেষ্টা করছেন। বিশ্বের বর্তমান প্রেক্ষাপট চিন্তা করলে ফেসবুক ব্যবহার কী আসক্তির পর্যায়ে পড়ে? কারও কারও জন্য না হলেও অসংখ্য উঠতি বয়সী ছেলে-মেয়েদের জন্য ফেসবুক ব্যবহার অবশ্যই আসক্তির পর্যায়ে পড়ে বলে চিকিৎসা বিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীরা ইদানীং মনে করছেন। এই প্রশ্নের জবাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের অসংখ্য যুবক-যুবতি ও বয়স্ক মানুষ খোলামেলা জবাব দিয়েছেন। 

দক্ষিণ আমেরিকার রড্রিগেজ বলেন, আমি স্বীকার করি, আমি শতভাগ ফেসবুকে আসক্ত। আমি বুঝি ফেসবুক আমার জন্য প্রচণ্ড ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইউরোপের যুবতি ন্যান্সির মতে, সামাজিক যোগযোগ মাধ্যম ফেসবুক অবশ্যই আসক্তির পর্যায়ে পড়ে। আমি ফেসবুক নিয়ে বসলে কখন দিন কেটে যায় টের পাই না। এতে আমার মন ও স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব পড়ছে। ইন্টারনেট সম্পর্কিত একটি ম্যাগাজিন উল্লেখ করেছে, ফেসবুক এমন এক পরিবেশ তৈরি করে, যা ছেড়ে ইচ্ছা করলেই কেউ চলে যেতে পারে না। এটি জুয়া খেলার মতো একটি আসক্তি সৃষ্টিকারী মাধ্যম। একজন ফেসবুক ইউজার ‘ফেসবুক চক্র’ আখ্যায়িত করে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস উপস্থাপন করেছে। চক্রে ইউজার দেখিয়েছে, ফেসবুকে বসলে সময় নষ্ট, সময় নষ্ট করার কারণে যথাসময়ে কাজ শেষ না হওয়া, কাজ জমে গেলে কাজের চাপ বৃদ্ধি পাওয়া, কাজের চাপ বৃদ্ধির ফলে ফেসবুকে লগ অন করা এবং ফেসবুকে লগ অন করলে আবার সময় নষ্ট। এভাবে চলতে থাকে ফেসবুক চক্র। তার মতে, এই গোলকধাঁধায় অধিকাংশ ফেসবুক ইউজার বা ব্যবহারক ঘুরপাক খাচ্ছে। এ ধরনের গোলকধাঁধা থেকে বের হয়ে আসার সহজ কোনো পথ নেই। একজন আমেরিকান মনোবিজ্ঞানী মনে করেন, বর্তমান প্রেক্ষিতে ফেসবুক আসক্তিকে অস্বীকার করার আর কোনো উপায় নেই। এই মনোবিজ্ঞানী এই সমস্যাকে শুধু আসক্তিতে সীমাবদ্ধ রাখতে চান না। তিনি মনে করেন, ফেসবুক ব্যবহার এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে এবং এই প্রবণতা এমনসব জটিল সমস্যা তৈরি করছে যে, এই অবস্থাকে ডিস-অর্ডারের পর্যায়ে ফেলে সংজ্ঞায়িত করতে হবে। শারীরিক ও মানসিক অবস্থার এই অবনতিকে বলা হয় ফেসবুক অ্যাডিকশন ডিসঅর্ডার (Facebook Addiction Disorder) বা ফেসবুক আসক্তি সংকট। 

বাংলাদেশে পরিচালিত এক বড় ধরনের জরিপে দেখা গেছে, ফেসবুক ব্যবহারকারীদের ১৭ শতাংশ স্বাভাবিক ব্যবহারক, ৫২ শতাংশ সমস্যাজনক ব্যবহারক এবং ৩০ শতাংশ ব্যবহারক আসক্তির পর্যায়ে চলে গেছে। ফেসবুক আসক্তি সংকট এমন এক অবস্থা যখন কেউ এত বেশি সময় ফেসবুকে কাটায় যে তার স্বাভাবিক জীবন ও স্বাস্থ্যের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। এক হিসাবে বলা হয়েছে যে, বর্তমানে পৃথিবীর আনুমানিক ৩৫ কোটি মানুষ  ফেসবুক আসক্তি সংকটে ভুগছে। কেউ এই সংকটে ভুগছে কি না তা বোঝা যায় কতগুলো উপসর্গ থেকে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপসর্গ হলো ধৈর্য। এই শব্দটি ব্যবহার করা হয় ফেসবুক আসক্ত ব্যবহারকের বেপরোয়া আচরণ বর্ণনা করার জন্য। এরা তত বেশি সময় ফেসবুকে কাটায় যতক্ষণ পর্যন্ত না তাদের পরিপূর্ণ তৃপ্তি আসে। কিন্তু এতে এদের ব্যক্তিগত জীবনে প্রচন্ত বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন ও মা-বাবারা এই শ্রেণির মানুষকে এক কথায় আসক্ত বলে অভিহিত করেন। এইসব আসক্ত মানুষকে দৈনন্দিন জীবনের কাজকর্ম করার জন্য যদি ফেসবুক ব্যবহার করা থেকে বিরত রাখা হয় বা প্রতিহত করা হয়, তবে তাদের মধ্যে দুশ্চিন্তা, অস্থিরতা, হতাশা প্রচণ্ডরূপ ধারণ করে। 

ফেসবুক আসক্তির কারণে এরা অনেক সময় দরকারি টেলিফোন কল পর্যন্ত গ্রহণ করে না। অনেক  ফেসবুক ইউজার সময়মতো ও ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া করে না, সময়মতো ঘুমাতে যায় না, রাত জেগে ফেসবুক চর্চা করে, যার ফলে এদের শরীর ও মনের ওপর প্রচণ্ড ক্ষতিকর প্রভাব সৃষ্টি হয়। সুতরাং অনেকেই মনে করেন, নেটের প্রতি আসক্তি অন্যান্য ভয়াবহ আসক্তির মতোই একটি খারাপ আসক্তি এবং এটা সাবধানে ও যত্নসহকারে ঠিক করা দরকার। কিন্তু  ফেসবুক নিয়ে বদ্ধসংস্কার আসলে কত বড় সংকট বা ফেসবুক অ্যাডিকশন ডিস-অর্ডার (FAD) এক ধরনের সর্বশেষ খামখেয়ালি বা খেপামি (fad) কি না তা নিয়েও কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন। যে যাই বলুক,  ফেসবুক বদ্ধসংস্কার (obsession) বর্তমান সমাজে জটিল ও আজগুবি সব সমস্যা তৈরি করছে। এটা সংকট কী সংকট নয় তা নিয়ে বিতর্ক চলতেই পারে। কিন্তু ফেসবুকের কারণে ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক যেসব সমস্যা তৈরি হচ্ছে, তা দূর করা দরকারÑ এ নিয়ে কারও দ্বিমত নেই। অসংখ্য মানুষ বিশেষ করে, উঠতি বয়সী ছেলেমেয়েরা অনলাইনে অনেক মূল্যবান সময় নষ্ট করছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে প্রোফাইল, ছবি ও স্ট্যাটাস আপলোড করতে ও দেখতে গিয়ে যে সময় নষ্ট হচ্ছে, তাতে করে তাদের জীবনের ওপর প্রভাব পড়ছে। 

অনেক ক্ষেত্রেই ফেসবুক অনেক দরকারি ও আনন্দদায়কÑ এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তারপরও ফেসবুক বিশ্বব্যাপী মানুষের দৈনন্দিন জীবনের আচার-আচরণ ও জীবন পদ্ধতির ওপর প্রচণ্ড ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। অনলাইনে মানুষ আজকাল এত বেশি সময় ব্যয় করছে যে, তার ফলশ্রুতিতে দৈনন্দিন জীবনের অপরাপর প্রয়োজনীয় ও মূল্যবান কাজে বেশি আগ্রহ, যত্ন ও সময় দেওয়া যাচ্ছে না। মানুষের আসল জীবনের চেয়ে অনলাইন জীবন যেন অনেক বেশি অর্থবহ ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েছে। কিন্তু এই সমস্যার সমাধান কোথায়? আমরা কীভাবে এতবড় সমস্যার সমাধান খুঁজব যখন পৃথিবীর এক তৃতীয়াংশের বেশি সময় মানুষ অনলাইন কাজকর্মে জড়িয়ে পড়েছে। এর উত্তর দেওয়া হয়তো তত সহজ হবে না। তবে উঠতি বয়সী ছেলে-মেয়েদের মা-বাবারা সম্ভবত এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। কারণ বয়স্ক মানুষের চেয়ে উঠতি বয়সী ছেলে-মেয়েরাই  ফেসবুক নিয়ে তাদের অধিকাংশ সময় কাটাচ্ছে। ফেসবুক নিয়ে এত বেশি সময় কাটানো উঠতি বয়সী ছেলে-মেয়েদের উপকারের চেয়ে অপকারই করছে বেশি। তাই কম বয়সী ছেলে-মেয়েদের ফেসবুক আসক্তি থেকে রক্ষা করার জন্য আমাদের অবশ্যই কোনো না কোনো প্রতিকার খুঁজে বের করতে হবে।


ড. মুনীরউদ্দিন আহমদ

প্রফেসর, ফার্মেসি বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি এবং সাবেক ডিন, ফার্মেসি অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা