সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১১ মার্চ ২০২৬ ১৪:৪৮ পিএম
আপডেট : ১১ মার্চ ২০২৬ ১৪:৪৯ পিএম
দেশের নারীসমাজের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং দলের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আগামী ৫ বছরের মধ্যে দেশের ৪ কোটি পরিবারের নারীপ্রধানদের হাতে পর্যায়ক্রমে এই কার্ড তুলে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
১০ মার্চ, মঙ্গলবার রাজধানীর বনানী টিঅ্যান্ডটি মাঠে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে রাজধানীর কড়াইল, ভাসানটেক এবং সাততলা এলাকার প্রায় ১৫ হাজার নারীকে এই কার্ডের আওতায় আনা হয়েছে। অনুষ্ঠানে নারীদের ক্ষমতায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকই নারী। এই অর্ধেক জনসংখ্যাকে পেছনে রেখে, তাদের শিক্ষা ও আর্থিকভাবে ক্ষমতায়ন না করে দেশকে কোনোভাবেই সামনে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।
এ কথা সত্য যে, বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও দারিদ্র্যবিমোচনের
ক্ষেত্রে নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি পরিবার তখনই সত্যিকার
অর্থে সচ্ছল হয়, যখন সেই পরিবারের নারী সদস্যরাও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ
করতে পারে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নারীদের অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’
চালুর উদ্যোগ সময়োপযোগী ও কার্যকর একটি পদক্ষেপ বলে আমরা মনে করি।
উল্লেখ
করা প্রয়োজন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে প্রতিটি পরিবারকে ফ্যামিলি
কার্ড দেওয়ার অঙ্গীকার করা হয়েছিল বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে। দেশের সর্বস্তরে
তখন আলোচিত হয়েছিল নারীর ক্ষমতায়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচনকারী এই নির্বাচনী
অঙ্গীকার। সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের মাধ্যমে একধাপ এগোলো দলটি। জানা গেছে, পাইলট
কর্মসূচির প্রথম ধাপে দেশের বিভিন্ন এলাকার ৩৭ হাজার ৫৬৪টি পরিবারের নারী প্রধান
এই কার্ড পাবেন। প্রতিটি কার্ডের বিপরীতে ভাতা দেওয়া হবে মাসিক ২৫০০ টাকা হারে। সরকার
প্রাথমিকভাবে দেশের ১৩ জেলার ১৩ সিটি করপোরেশন/ইউনিয়নের ১৫টি ওয়ার্ডে ফ্যামিলি
কার্ডের পাইলটিং কার্যক্রম শুরু করছে। প্রথম ধাপে হতদরিদ্র ও দরিদ্রশ্রেণির পরিবার
এ কার্ড পাবে। এসব পরিবার বাছাই করতে সরকার সারা দেশে ৬৭ হাজার ৮৫৪টি
পরিবারপ্রধানের তথ্য সংগ্রহ করে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পরিবারগুলোকে
হতদরিদ্র, দরিদ্র, নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তসহ মোট ৫টি শ্রেণিতে বিভক্ত
করা হয়েছে। কার্যত, ফ্যামিলি কার্ড কেবল একটি নগদ সাহায্যের মাধ্যম নয়। এটি দরিদ্র
পরিবারগুলোকে দক্ষতা উন্নয়ন, ক্ষুদ্রঋণ এবং কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত করার একটি
মাধ্যম বা উন্নয়নের সিঁড়ি। যার মাধ্যমে দেশ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দারিদ্র্যসীমার
ওপরে উঠে আসতে সক্ষম হবে।
বলা
বাহুল্য, ফ্যামিলি কার্ডের উৎস মূলত সংবিধানের ১৫(ঘ) অনুচ্ছেদ; যেখানে বলা হয়েছে
যে, বার্ধক্য, পঙ্গুত্ব, অকাল বৈধব্য বা অনুরূপ অন্যান্য পরিস্থিতির কারণে
অভাবগ্রস্ততার ক্ষেত্রে সরকারি সাহায্য লাভের অধিকার নাগরিকের একটি মৌলিক
মানবাধিকার। এই সাংবিধানিক অঙ্গীকার পূরণের লক্ষ্যে এবং একটি বৈষম্যহীন সমাজ
বিনির্মাণের প্রত্যয়ে রাষ্ট্র বিভিন্ন সময় নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। ফ্যামিলি
কার্ড কার্যক্রম মূলত এই সাংবিধানিক দায়বদ্ধতাকে একটি সুসংগঠিত এবং আধুনিক ডিজিটাল
কাঠামোর রূপ দেওয়ার প্রয়াস।
এ কথা সত্য যে, বাংলাদেশে এখনও অনেক পরিবারে নারীরা আর্থিকভাবে
স্বনির্ভর নন। তারা সংসারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করলেও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের
ক্ষেত্রে অনেক সময় পিছিয়ে থাকেন। বিশেষ করে, নিম্ন-আয়ের পরিবারগুলোতে নারীরা সংসারের
খরচ সামলাতে গিয়ে নানা সংকটে পড়েন। তাই ফ্যামিলি কার্ড চালু করার মাধ্যমে তারা সরাসরি
সরকারি সহায়তা, ভর্তুকি কিংবা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন।
আমরা মনে করি, ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে নিম্ন-আয়ের পরিবারগুলোকে খাদ্যসহায়তা, নিত্যপ্রয়োজনীয়
পণ্য, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা শিক্ষাসহ বিভিন্ন সুবিধা প্রদান করা সম্ভব। আর কার্ডের মালিকানা
নারীদের হাতে থাকায় সংসারের প্রয়োজন অনুযায়ী তারা ব্যয় করতে পারবেন এবং পরিবার পরিচালনায়
তাদের ভূমিকা আরও শক্তিশালী হবে। নারীদের আত্মবিশ্বাসও বাড়বে।
আমাদের গ্রামীণ বাস্তবতায় দেখা যায়, অনেক নারী ক্ষুদ্র
উদ্যোগ, কৃষিকাজ, হাঁস-মুরগি পালন, হস্তশিল্প কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসার মাধ্যমে পরিবারকে
সহায়তা করেন। কিন্তু প্রয়োজনীয় পুঁজি ও সহায়তার অভাবে তাদের উদ্যোগ অনেক সময় বড় আকার
ধারণ করতে পারে না। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে যদি প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্রঋণ বা ভর্তুকি
দেওয়া যায়, তাহলে এসব নারী উদ্যোক্তা আরও এগিয়ে যেতে পারবেন। এতে শুধু কোন একক পরিবার
নয়, সামগ্রিক অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
তবে ফ্যামিলি কার্ড ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে হলে সঠিকভাবে
উপকারভোগী নির্বাচন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। অতীতে দেখা গেছে, এই
ধরনের প্রকল্পে প্রকৃত দরিদ্ররা বঞ্চিত হন এবং প্রভাবশালীরা সুবিধা নিয়ে যান। তাই এই
ধরনের অনিয়ম দূর করতে ডিজিটাল ডেটাবেজ, স্থানীয় প্রশাসনের তদারকি এবং নাগরিক অংশগ্রহণ
নিশ্চিত করা প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে, নারীর ক্ষমতায়ন কেবল সামাজিক ন্যায্যতার বিষয়
নয়, এটি একটি দেশের টেকসই উন্নয়নেরও প্রধান শর্ত। তাই ফ্যামিলি কার্ডের মতো উদ্যোগকে
নারীকেন্দ্রিক করে বাস্তবায়ন করা গেলে তা হবেÑ দারিদ্র্য হ্রাস ও নারী উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ
পদক্ষেপ।