× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ইরানে আগ্রাসন

খামেনির শাহাদত: নীরব মুসলিম বিশ্ব

এম. গোলাম মোস্তফা ভুইয়া

প্রকাশ : ১১ মার্চ ২০২৬ ১৪:৩৯ পিএম

খামেনির শাহাদত: নীরব মুসলিম বিশ্ব

গোটা মধ্যপ্রাচ্যে চলছে সংঘর্ষ, সংঘাত, হামলা-পাল্টাহামলা, যার জন্য মূলত দায়ী হচ্ছে ‘মধ্যপ্রাচ্যের ক্যান্সার’ নামে পরিচিত ইসরায়েল ও তাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক আমেরিকা। ইরানের সার্বভৌম ভূখণ্ডে চলমান ইঙ্গ-মার্কিন হামলাকে আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘ সনদ ও মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং বিশ্বশান্তির জন্য হুমকি। কোনো আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা করছে না দেশটি। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল ও ইরানের ছায়াযুদ্ধ নতুন নয়। কিন্তু গত কয়েক মাসে উত্তেজনা এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে সরাসরি মুখোমুখি সংঘর্ষের আশঙ্কা অস্বীকার করা যায় না। গাজা, লেবানন, সিরিয়াÑ প্রতিটি ফ্রন্টে আগুন জ্বলছে। আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘ সনদসহ রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের সব নীতিমালাকে পদদলিত করে ইঙ্গ-মার্কিন আগ্রাসী শক্তি মুসলিম রাষ্ট্র ইরানের ওপর হামলা করে এবং দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আলি খোমেনিকে নিজ বাসভবনে শাহাদতের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত বিশ্বব্যবস্থার প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করছে। 

রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইঙ্গ-মার্কিন অশুভশক্তি ইরান আক্রমণের পেছনে বড় কারণ হচ্ছে, ইরানের প্রথম সারির নেতাদের হত্যা করে নেতৃত্বশূন্য করা। ইরানে ইঙ্গ-মার্কিন আগ্রাসী শক্তির সরাসরি সামরিক হামলা যে ভয়াবহ পরিণতি দেখা যাচ্ছে, তা শুধু দুই রাষ্ট্রের দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি গোটা মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম বিশ্বের ভঙ্গুর অবস্থান, কূটনৈতিক দুর্বলতা এবং নীতিহীনতার নগ্ন প্রকাশ। যখন গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসন মাসের পর মাস ধরে চলছে, যখন সিরিয়ায় নাগরিকদের জীবন ছিন্নভিন্ন হয়েছে এবং যখন আজ ইরানের বিভিন্ন শহরে বোমা পড়ে মানুষ নিহত হচ্ছে তখন মুসলিম দেশগুলোর অধিকাংশ সরকার কেবল মৌনদর্শক কিংবা দ্বিমুখী বিবৃতির আশ্রয় নিয়েছে। এই নিষ্ক্রিয়তা শুধু দুঃখজনক নয়, এটি ঐতিহাসিকভাবে মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক ব্যর্থতারই জ্বলন্ত প্রমাণ। বর্তমান পরিস্থিতি শুধু ইসরায়েল ও ইরানের বিষয় নয়Ñ এটা পুরো মুসলিম বিশ্বের জন্য একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব ব্যর্থ হচ্ছে।

ইরান ইসলামী প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র হলেও বহু মুসলিম দেশের কাছে রাজনৈতিকভাবে একঘরে। সুন্নি-শিয়া বিভাজন, পারস্য-আরব বৈরিতা এবং ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের কৌশল তাকে এক ঘোরতর একাকিত্বে ঠেলে দিয়েছে। কিন্তু আজ যখন ইসরায়েল তার মূল ভূখণ্ডে আক্রমণ করছে, তখন ইরানের প্রতিরোধ-চেতনা একটি বৈশ্বিক প্রতীক হয়ে উঠছে, যদিও এটি দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এই প্রতিক্রিয়া মুসলিম দেশগুলোর নয়, বরং ইরানের একক প্রতিক্রিয়া। ইরান যদি একটি পশ্চিমা মিত্র দেশ হতো, তাহলে ইসরায়েলের এই হামলাকে জাতিসংঘে ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে ঘোষণা করা হতো। কিন্তু বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের নীতিমালা শুধু শক্তিশালী রাষ্ট্রের জন্য প্রযোজ্য নয়। এখানেই মুসলিম বিশ্বের দুর্ভাগ্যÑ তারা নিজেদের জনসংখ্যা, অর্থনীতি ও ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী এক বড় শক্তি হওয়া সত্ত্বেও রাজনৈতিকভাবে একবারেই তুচ্ছ। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও ফ্রান্স ইসরায়েলের পক্ষেই অবস্থান গ্রহণ করেছে, যদিও ইউক্রেন যুদ্ধের সময় এরাই রাশিয়াকে আন্তর্জাতিক আইন ভাঙার জন্য দায়ী করেছিল। মুসলিম রাষ্ট্রগুলো তাদের এই দ্বিচারিতার বিরুদ্ধে কথা বলতে পারছে না এবং সম্মিলিতভাবে বিশ্ব ফোরামে প্রশ্ন ছুড়ে দিতে পারছে না।

ইরানের বিরুদ্ধে এ ধরনের আক্রমণ শান্তিপ্রিয় মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। এসব সামরিক পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা আরও বাড়াবে এবং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করবে। এই হামলার মাধ্যমে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র আবারও তাদের আগ্রাসী মনোভাবের প্রকাশ ঘটিয়েছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড গোটা মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিতে পারে। সম্প্রতি ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি হত্যাকাণ্ড মানবতা ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। আলি খামেনিকে হত্যার মধ্য দিয়ে ইরানকে দুর্বল করে দেওয়ার ইঙ্গ-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তির চেষ্টা কি সফল হবে তার জন্য আমাদের আরও কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে। আয়তুল্লাহ আলি খামেনি ছিলেন সমকালীন বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইসলামিক স্কলার এবং আপসহীন নেতা। এই মহান পুরুষ সারাজীবন ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব এবং মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের জন্য লড়ে গেছেন। শাহী শাসনের জুলুম থেকে ইরানকে মুক্ত করা এবং ইসলামী বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে বহুমুখী বৈশ্বিক ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ইরানকে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত করার মূল কারিগর ছিলেন। তার লক্ষ্য ছিল অত্যন্ত স্পষ্টÑ একটি ইনসাফভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা এবং মুসলিম বিশ্বের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা। 

মুসলিম বিশ্বের নীরবতা এক কলঙ্কিত আত্মসমর্পণ। সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক হলো তথাকথিত ‘মুসলিম পরাশক্তি’ দেশগুলোর নীরবতা। সৌদি আরব, কাতার, ওমান কিংবা কুয়েত তাদের এই নিস্পৃহতা কেবল রাজনৈতিক দ্বিধা নয়, এটি একটি চরম নৈতিক সংকট। ইতিহাস সাক্ষী, যখনই মুসলিম দেশগুলো শক্তিশালী আগ্রাসীর সামনে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়েছে, তখনই সাম্রাজ্যবাদীরা তাদের ওপর নিজেদের ইচ্ছা চাপিয়ে দিয়েছে। এই নীরবতা আসলে আগ্রাসীদের আরও উগ্র হতে উৎসাহিত করছে। ওআইসিকে কাগজের পুতুল না রেখে ঢেলে সাজাতে হবে, শুধু বিবৃতিমুখী নয়, বরং সিদ্ধান্ত কার্যকর করার ক্ষমতাসম্পন্ন একটি সংগঠনে রূপ দিতে হবে। তুরস্ক, ইরান, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, পাকিস্তান ও কাতারÑ এই দেশগুলো মিলে একটি বিকল্প কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক জোট গঠন করার বিষয়টি ভাবতে পারে। মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে যেকোনো যুদ্ধ ও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সম্মিলিত অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের প্রত্যাশা, বৈশ্বিক সংকটময় পরিস্থিতি এড়াতে ইসরায়েলের মিত্র হিসেবে পরিচিত পশ্চিমা শক্তিগুলো এই যুদ্ধ বন্ধে তৎপর হবে। ইরানের সঙ্গে ইসরায়েলের উত্তেজনা নিরসনে তো বটেই, ফিলিস্তিন ইস্যুতেও পশ্চিমা শক্তি ইতিবাচক ভূমিকার রাখবে। তবেই মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে।

যদি আজ আমরা ইরানের পাশে না দাঁড়াই, তবে কাল এই আগুনের আঁচ থেকে মক্কা-মদিনা কিংবা কায়রো কোনোটিই নিরাপদ থাকবে না। সময়ের দাবি হলো সম্মিলিত রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। মুসলিম বিশ্বকে স্মরণ রাখতে হবে, ফিলিস্তিনে জাতিগত নিধন প্রায় সম্পন্ন, এবার ইরানের পালা! অথচ পাশে নেই মুসলিম বিশ্ব! বিশ্বের অশান্তিকামী ইরানেও কথিত পরিবর্তনে আরব বসন্তের সূচনা করার ষড়যন্ত্র করছে। ইরাক সেই কবেই হারিয়েছে তার সম্ভ্রান্ত জাতি সত্তার গৌরব। লিবিয়ার গাদ্দাফি সরব হয়েছিলেন আফ্রিকার দেশে দেশে পশ্চিমাদের সাম্রাজ্যবাদের নখর ওপরে দিতে। আফ্রিকান ইউনিয়নভক্তু দেশগুলোকে নিয়ে অভিন্ন মুদ্রা ‘স্বর্ণ দিনার’ চালুর কথা জোরেশোরে ঘোষণা দিয়ে মাঠেও নামেন তিনি। যার পরিণতি তাকে ভোগ করতে হয়েছে মুসলিম বিশ্বের অসহযোগিতার কারণে। সিরিয়ার ভাগ্যেও ব্যতিক্রম হয়নি। কথিত আরব বসন্তের নামে বাশার আল আসাদের ক্ষমতাচ্যুতি নিকট অতীতের ঘটনা। বাশার আল আসাদ প্রাণে বেঁচেছেন বটে। তবে সিরিয়া আজ ক্ষুধা, দারিদ্র্য আর গৃহযুদ্ধ কবলিত এক জনপদে পরিণত হয়েছে। এবার মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিধর ইরানকেও মুছে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তবুও যদি মুসলিম বিশ্বের টনক না নড়ে তাহলে বিশ্বের মুসলানদের করুণ পরিণতি ভোগ করতে হবে। মুসলিম বিশ্বের সুদৃঢ় ঐক্য গড়ে তুলে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। এই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারলে ভবিষ্যতে আরও কঠিন মাসুল গুনতে হবে। 


এম. গোলাম মোস্তফা ভুইয়া

রাজনীতিক ও কলাম লেখক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা