× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সংকটের মুখে দেশের পোল্ট্রি খামারিরা

নয়ন বিশ্বাস রকি

প্রকাশ : ১১ মার্চ ২০২৬ ১৪:৩০ পিএম

বর্তমানে বাংলাদেশে পোল্ট্রি শিল্প একটি বৃহৎ কৃষি-ভিত্তিক শিল্পে পরিণত হয়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশে পোল্ট্রি শিল্প একটি বৃহৎ কৃষি-ভিত্তিক শিল্পে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশে পোল্ট্রি শিল্পের ইতিহাস খুব বেশি পুরনো নয়, তবে অল্প সময়ের মধ্যেই এটি দেশের কৃষি অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে পরিণত হয়েছে। গ্রামীণ বাংলায় বহু আগে থেকেই পারিবারিকভাবে হাঁস-মুরগি পালন প্রচলিত ছিল। মূলত বাড়ির আঙিনায় স্বল্প পরিসরে দেশি মুরগি পালন করে পরিবারগুলো ডিম ও মাংসের চাহিদা পূরণ করত এবং অতিরিক্ত উৎপাদন স্থানীয় বাজারে বিক্রি করত। তবে এটি ছিল সম্পূর্ণ ঐতিহ্যভিত্তিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা।

ইতিহাসের পাঠ থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে আধুনিক পোল্ট্রি শিল্পের যাত্রা শুরু হয় মূলত ১৯৬০-এর দশকে, যখন সরকারি উদ্যোগে উন্নত জাতের মুরগি আমদানি এবং খামারভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থা চালু করা হয়। সে সময় সরকারি বিভিন্ন খামার ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান পোল্ট্রি উন্নয়নে কাজ শুরু করে। স্বাধীনতার পর ১৯৭০-৮০-এর দশকে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, প্রশিক্ষণ এবং কিছু বেসরকারি উদ্যোগের মাধ্যমে পোল্ট্রি খাত ধীরে ধীরে সম্প্রসারিত হতে থাকে।

৯০-এর দশকে বেসরকারি খাতের ব্যাপক অংশগ্রহণের মাধ্যমে পোল্ট্রি শিল্পে নতুন গতি আসে। এ সময় আধুনিক হ্যাচারি, ফিড মিল, ব্রয়লার ও লেয়ার খামার দ্রুত বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে গ্রামাঞ্চলে অসংখ্য ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খামারি এই খাতের সঙ্গে যুক্ত হন। ফলে পোল্ট্রি শিল্প একদিকে যেমন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, অন্যদিকে দেশের প্রাণিজ প্রোটিনের ঘাটতি পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে শুরু করে।

বর্তমানে বাংলাদেশে পোল্ট্রি শিল্প একটি বৃহৎ কৃষি-ভিত্তিক শিল্পে পরিণত হয়েছে। সারা দেশে লক্ষাধিক খামার, হাজারো উদ্যোক্তা এবং বিপুলসংখ্যক শ্রমিক এই খাতের সঙ্গে যুক্ত। ডিম ও মুরগির মাংস এখন দেশের মানুষের পুষ্টির অন্যতম প্রধান উৎস। তবে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, বাজার অস্থিরতা ও রোগবালাইসহ নানা চ্যালেঞ্জ এখনও এই শিল্পের সামনে বিদ্যমান। যথাযথ নীতিসহায়তা ও পরিকল্পনার মাধ্যমে পোল্ট্রি শিল্প ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে।

সাম্প্রতিক সময়ে উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারদর কমে যাওয়ায় দেশের প্রান্তিক পোল্ট্রি খামারিরা চরম সংকটে পড়েছেন। ডিম বা মাংস বিক্রি করে মুরগির খাবার খরচই তুলতে পারছেন না তারা। উৎপাদন খরচ যা পড়ছে তার চেয়ে কম দামে খামারিদের বিক্রি করতে হচ্ছে। এভাবে ক্রমাগত লোকসান, ঋণের চাপ, বিদ্যুৎ বিলসহ অন্যান্য খরচ সব মিলিয়ে প্রান্তিক খামারিদের জীবন এখন অনিশ্চয়তার দোলাচলে। অনেকে খামার গুটিয়েছেন, কেউ কেউ ঋণগ্রস্ত হয়ে পরিবার ছাড়া অন্য স্থানে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

অথচ বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো পোল্ট্রি খাত। দেশের প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র খামারিদের বড় একটি অংশ মুরগি পালন করে জীবিকা নির্বাহ করেন। গ্রামাঞ্চলের বহু পরিবার এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। পুষ্টি চাহিদা পূরণে ডিম ও মুরগির মাংস যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখতেও পোল্ট্রি খাতের ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে প্রান্তিক পোল্ট্রি খামারিরা চরম সংকটের মধ্যে পড়েছেন। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, বাজারে অস্থিরতা, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং নীতিগত সহায়তার ঘাটতির কারণে অনেক খামারি টিকে থাকার লড়াই করছেন।

পোল্ট্রি খামার পরিচালনার প্রধান উপাদান হলো খাদ্য, বাচ্চা (চিক), ওষুধ এবং বিদ্যুৎ। গত কয়েক বছরে এসব উপকরণের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে মুরগির খাদ্যের দাম বৃদ্ধি খামারিদের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভুট্টা, সয়াবিন মিলসহ খাদ্যের কাঁচামালের দাম বাড়ার ফলে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে। কিন্তু বাজারে সেই অনুপাতে ডিম ও মুরগির ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না খামারিরা। ফলে উৎপাদন ব্যয় ও বিক্রয়মূল্যের মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে।

এদিকে পোল্ট্রি খাতে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের আধিপত্যও প্রান্তিক খামারিদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। বড় কোম্পানিগুলো উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে। এতে ক্ষুদ্র খামারিরা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছেন না। অনেক সময় কোম্পানিগুলো নির্দিষ্ট দামে বাচ্চা ও খাদ্য সরবরাহ করলেও ডিম বা মুরগি বিক্রির সময় খামারিদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হয় না। ফলে লাভের পরিবর্তে অনেক সময় লোকসান গুনতে হয়।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো রোগবালাই। সময়মতো সঠিক ওষুধ ও টিকা না পাওয়া এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শের অভাবে অনেক খামারে মুরগির মৃত্যুহার বাড়ছে। এতে খামারিরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। অনেক ক্ষেত্রে পশু চিকিৎসাসেবা গ্রামাঞ্চলে সহজলভ্য নয়। ফলে রোগ ছড়িয়ে পড়লে খামারিরা অসহায় হয়ে পড়েন।

বাজার ব্যবস্থাপনাও প্রান্তিক খামারিদের জন্য বড় সমস্যা। খামার থেকে ডিম বা মুরগি বাজারে পৌঁছানোর পথে একাধিক মধ্যস্বত্বভোগী জড়িত থাকে। এই মধ্যস্বত্বভোগীরা অনেক সময় বাজারকে অস্থিতিশীল করে তোলে। ফলে ভোক্তারা উচ্চমূল্যে ডিম ও মুরগি কিনলেও খামারিরা সেই লাভের অংশ পান না। বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি কিংবা মজুদদারির অভিযোগও প্রায়ই ওঠে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

এই পরিস্থিতিতে অনেক প্রান্তিক খামারি বাধ্য হয়ে তাদের খামার বন্ধ করে দিচ্ছেন। কেউ কেউ ঋণের বোঝা নিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন। পোল্ট্রি খাত থেকে যদি ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খামারিরা হারিয়ে যান, তাহলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ অর্থনীতির ওপর তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। কারণ দেশের মোট পোল্ট্রি উৎপাদনের বড় একটি অংশ আসে এসব ক্ষুদ্র খামার থেকেই।

তাই এই সংকট থেকে উত্তরণে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ জরুরি। পোল্ট্রি খাদ্যের বাজারে স্বচ্ছতা ও নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, পোল্ট্রি খাতকে একটি কৌশলগত কৃষি খাত হিসেবে বিবেচনা করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। এতে প্রান্তিক খামারিদের স্বার্থ রক্ষা করা গেলে এই খাত আরও শক্তিশালী হবে এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সার্বিকভাবে বলা যায়, প্রান্তিক পোল্ট্রি খামারিরা বর্তমানে কঠিন সময় পার করছেন। তাদের সংকট শুধু একটি খাতের সমস্যা নয়; এটি গ্রামীণ অর্থনীতি ও দেশের পুষ্টি নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িত। তাই সময়মতো সঠিক নীতি ও কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করতে পারলে এই খাত আবারও ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হবে।


নয়ন বিশ্বাস রকি

সমাজসেবক ও সংগঠক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা