প্রসঙ্গ বাংলাদেশ
হাবিব বাবুল
প্রকাশ : ১০ মার্চ ২০২৬ ১৩:২৩ পিএম
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতের যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা শুধু আঞ্চলিক নয়Ñ বিশ্ব-রাজনীতির জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সংকট। এই সংকটের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়েও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলে আলোচনা ও সমালোচনা দেখা যাচ্ছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, কেন বাংলাদেশ সরাসরি ইরানের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে না। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, বাংলাদেশের নীরব বা কূটনৈতিকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নৈতিকতার প্রশ্নে দুর্বলতা প্রকাশ করে। কিন্তু বাস্তবতা এবং রাষ্ট্রের স্বার্থের নিরিখে বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের অবস্থান আসলে একটি বাস্তববাদী কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত, যেখানে আবেগ নয়, জাতীয় স্বার্থই প্রধান বিবেচ্য হওয়া উচিত।
বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ, যার অর্থনীতি এখনও বহুলাংশে নির্ভরশীল প্রবাসী আয়ের ওপর। বিশেষ করে, মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলোÑ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ও ওমান বাংলাদেশি শ্রমবাজারের প্রধান গন্তব্য। আনুমানিক এক কোটি বাংলাদেশি নাগরিক এসব দেশে কাজ করছেন। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস এবং দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার একটি বড় ভিত্তি। প্রতিবছর যে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসে, তার একটি বড় অংশই এই উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আসে। ফলে এই অঞ্চলগুলোর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই বাস্তবতার আলোকে যখন ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয় বা সম্ভাব্য সংঘাতের আশঙ্কা দেখা দেয়, তখন বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি শুধু কূটনৈতিক নয়, সরাসরি অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িত হয়ে যায়। এই কারণে উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার প্রশ্নে বাংলাদেশের উদ্বেগ থাকা স্বাভাবিক। এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের পক্ষ থেকে উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ইরানের সম্ভাব্য আক্রমণের নিন্দা জানানোকে অনেকেই সমালোচনা করছেন, কিন্তু বাস্তবতা হলোÑ এই অবস্থানকে পুরোপুরি অযৌক্তিক বলা কঠিন।
রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি মৌলিক নীতি হলোÑ নিজ দেশের স্বার্থকে সর্বাগ্রে রাখা। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নৈতিকতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু বাস্তবতার রাজনীতিতে রাষ্ট্রগুলো শেষপর্যন্ত নিজেদের নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং কৌশলগত স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দেয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বাংলাদেশের সরকার বা রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি আবেগের বশে এমন কোনো অবস্থান নেয়Ñ যা দেশের অর্থনীতি, প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা বা কূটনৈতিক সম্পর্ককে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়, তাহলে সেটি দায়িত্বশীল নেতৃত্বের পরিচয় হবে না।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বলা জরুরিÑ ইরানের জনগণের প্রতি বাংলাদেশের সহানুভূতি থাকা স্বাভাবিক এবং মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে তা থাকা উচিতও। ইরান একটি প্রাচীন সভ্যতার দেশ এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। ইরানের ওপর যেকোনো অযৌক্তিক হামলা বা আগ্রাসন অবশ্যই আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে নিন্দনীয়। বিশেষ করে, যদি যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের পক্ষ থেকে ইরানের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করা হয়, তাহলে তা আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নও উত্থাপন করে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে অনেকের ক্ষোভ বা সমালোচনা অস্বাভাবিক নয়।
তবে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নৈতিক অবস্থান এবং কৌশলগত অবস্থান সব সময় এক জায়গায় দাঁড়ায় না। অনেক সময় একটি দেশ নৈতিকভাবে একটি ঘটনার বিরোধিতা করলেও কূটনৈতিকভাবে খুব সতর্ক অবস্থান নেয়, যাতে তার নিজের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিষয়টি অনেকটা সেরকম। কারণ বাংলাদেশের অর্থনীতি, শ্রমবাজার এবং বিনিয়োগের বড় একটি অংশ উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত।
উপসাগরীয় দেশগুলো শুধু শ্রমবাজারই নয়, বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিদ্যুৎ, অবকাঠামো, জ্বালানি এবং শিল্প খাতে এসব দেশের বিনিয়োগ ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ক্রমেই বাড়ছে। ফলে এই দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বার্থের জন্য অপরিহার্য।
এই বাস্তবতা বিবেচনা করলে বোঝা যায়, বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থান আসলে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান। একদিকে মানবিক সহানুভূতি, অন্যদিকে রাষ্ট্রের বাস্তব স্বার্থÑ এই দুইয়ের মধ্যে একটি সমন্বয় করার চেষ্টা এখানে দেখা যায়। এই ধরনের অবস্থানকে অনেকেই ‘বাস্তববাদী কূটনীতি’ বলে থাকেন। অনেক সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বা আবেগপ্রবণ রাজনৈতিক আলোচনায় বিষয়গুলো খুব সরলভাবে উপস্থাপন করা হয়, যেন একটি পক্ষকে সমর্থন করলেই নৈতিকতা রক্ষা হয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জটিল বাস্তবতায় বিষয়গুলো এতটা সরল নয়। একটি রাষ্ট্রের নেতৃত্বকে শুধু আবেগ দিয়ে নয়, ঠান্ডা মাথায় সব দিক বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা, দেশের বৈদেশিক মুদ্রা, কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং বিনিয়োগের সম্ভাবনাÑ সবকিছু মিলিয়ে একটি বৃহত্তর চিত্র দেখতে হয়।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি ঐতিহ্যগত নীতি হলো, ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’। এই নীতির আলোকে বাংলাদেশ সাধারণত বড় শক্তিগুলোর দ্বন্দ্বে সরাসরি পক্ষ নেয় না বরং শান্তি ও সংলাপের পক্ষে অবস্থান নেয়। ইরান-আমেরিকা উত্তেজনার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অবস্থান মূলত সেই নীতির ধারাবাহিকতা হিসেবেই দেখা যেতে পারে। অতএব, আবেগের বশে ইরানের পক্ষে সরাসরি অবস্থান নেওয়া অনেকের কাছে আকর্ষণীয় মনে হতে পারে, কিন্তু সেটি বাস্তবে বাংলাদেশের জন্য কতটা লাভজনক হবে, সেটি ভেবে দেখা দরকার। কারণ, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রতিটি সিদ্ধান্তেরই বাস্তব প্রভাব থাকে। যদি কোনো সিদ্ধান্তের ফলে প্রবাসী শ্রমিকরা ঝুঁকির মুখে পড়ে, রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যায় বা গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে তার দায় শেষ পর্যন্ত বহন করতে হবে বাংলাদেশের জনগণকেই।
এই কারণেই ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিটি অনেকের কাছে বাস্তববাদী মনে হয়। একটি রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব তার জনগণের নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করা। আন্তর্জাতিক রাজনীতির জটিল পরিস্থিতিতে সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক সময় কঠিন ও সংবেদনশীল সিদ্ধান্ত নিতে হয়। ইরান-আমেরিকা উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থানকে তাই শুধুমাত্র নৈতিকতার সরল মানদণ্ড দিয়ে বিচার করলে পুরো চিত্রটি বোঝা যাবে না। বরং অর্থনীতি, কূটনীতি, প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার বৃহত্তর বাস্তবতার আলোকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করা উচিত। সবশেষে বলা যায়, ইরানের জনগণের প্রতি সহানুভূতি থাকা এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়াÑ এই দুই অবস্থান পরস্পরবিরোধী নয়। বরং একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের জন্য এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই হলো পরিণত ও বাস্তববাদী কূটনীতির পরিচয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সেই বাস্তবতাই আজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
হাবিব বাবুল
জার্মানিভিত্তিক সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক