নারী
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০৯ মার্চ ২০২৬ ১১:১৬ এএম
আমরা যদি সত্যিকার অর্থেই সমাজে নিষ্পেষিত ও অবহেলিত মেয়েদের সম্মান, মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম হই, তাহলে নারীর ভেতরে জেগে উঠবে প্রকৃত আত্মমর্যাদাবোধ।
স্বপ্ন দেখা বারণ নয়। বরং স্বপ্ন না দেখাটাই বারণ। কারণ মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়। স্বপ্ন না থাকলে সে মানুষের সামনে এগোনোর পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। অথচ বারবার আমাদের নারীদের স্বপ্ন দেখার ইচ্ছে ও আগ্রহকে যেন গলা চেপে ধরা হয়। সামাজিক-ধর্মীয় নানা অনুশাসনের বেড়াজালে তাদের আটকে রাখা হয়। অথচ আমাদের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি নারী। এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে পেছনে রেখে একটি সমাজ ও রাষ্ট্রের এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। আশার কথা বর্তমান সরকার দেশের সার্বিক উন্নয়নে যে নারীর অগ্রযাত্রা গুরুত্বপূর্ণ তা আন্তরিকতার সঙ্গেই অনুধাবন করেছে। ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস-২০২৬’ উপলক্ষে দেওয়া এক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে নারী-পুরুষ সবাই সমান অধিকার ভোগ করবে। সম্মান ও মর্যাদা এবং নিরাপত্তা নিয়ে পরিবার, রাষ্ট্র ও সমাজে কাজ করবে।’
আমরা যদি সত্যিকার অর্থেই সমাজে নিষ্পেষিত ও অবহেলিত মেয়েদের সম্মান, মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম হই, তাহলে নারীর ভেতরে জেগে উঠবে প্রকৃত আত্মমর্যাদাবোধ। আর আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন নারীই সমাজকে এগিয়ে দেবে নারী ক্ষমতায়নের দিকে। আমরা যদি নারীর ওর চাপিয়ে দেওয়া সামাজিক দায়বোধ সরাতে না পারি, সামাজিক বৈষম্য থেকে তাদেরকে পুরোপুরি মুক্ত করতে না পারি, তাহলে কোনোদিনই দেশ প্রকৃত উত্তরণের পথে এগিয়ে যাবে না।
কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছিলেন, “বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।” সেই পঙ্ক্তির সফল বাস্তবায়নও আজ জরুরি। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্যÑ আমরা গতি-প্রগতিতে বিশ্বের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখলেও নারীকে পেছনে ফেলে রাখতেই উৎসাহী। আমাদের নেতৃত্বের প্রথম সারিতে নারীদের উপস্থিতি এখনও উজ্জ্বল নয়। আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে ‘রাজনীতির মাঠে থাকলেও মসনদে পিছিয়ে নারী’ শিরোনামের প্রতিবেদনেও সেই বিষয়টিই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনে ২ হাজার ১৭ জন প্রার্থীর মধ্যে নারী প্রার্থী ছিলেন মাত্র ৮৪ জন অর্থাৎ মোট প্রার্থীর ৪ শতাংশ ছিলেন নারী। যাদের মাঝে দলীয় প্রার্থী ৬৬ জন। এ ছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী ১৯ জন। এই নারীদের মাঝ থেকে মাত্র ৭ জন নির্বাচিত হয়ে সংসদ সদস্য হয়েছেন। মন্ত্রিসভা গঠনের পর ৫০ সদস্যের মন্ত্রিসভায় পূর্ণ মন্ত্রী একজন ও দুজন নারী প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন। অন্যদিকে বিরোধী দলে কোনো নারী সংসদ সদস্যই নেইÑ যা শুধু দুঃখজনকই নয়, নারীর অগ্রযাত্রার পথে অনভিপ্রেতও।
জাতীয় সংসদ, মন্ত্রিসভা এবং বিরোধী দলে নারীদের উপস্থিতিই স্পষ্ট করে আমাদের মেয়েরা কেমন আছে? রাজনীতিবিদরাই সকল ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেন। জনগণের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়ে তাদের দ্বারাই পরিচালিত হয় দেশ। রাজনীতিতে মাঠে-ময়দানে নারীর সরব উপস্থিতি থাকলেও প্রতিনিধিত্ব করার ক্ষেত্রে সরিয়ে রাখার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয় আমাদের মেয়েদের দুর্দশার ছবি। শুধু রাজনীতিই নয়, কোনো ক্ষেত্রেই আমাদের মেয়েরা যে ভালো নেই, নিরাপদে নেই, তা স্পষ্ট। এমনকি নারীর সুরক্ষা নিশ্চিতেও আমাদের উন্নতির চিত্রও ম্লান।
আমাদের মেয়েরা শারীরিক সহিংসতা, যৌন, অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক এ চার ধরনের সহিংসতার শিকার। সহিংসতার শিকার নারীদের অধিকাংশই তাদের জীবনসঙ্গী বা স্বামী কর্তৃক নির্যাতিত। অর্থাৎ নিজের পরিবারের হাতেই তারা সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত। যদিও মাতৃত্বকালীন মৃত্যুহার, মা-প্রতি শিশু জন্মহার, কুমারীমাতৃত্ব বা নবজাতকের মৃত্যুহার হ্রাসসহ অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের উন্নতি হয়েছে। কিন্তু এত কিছুর পরেও আমরা নারীর প্রতি সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারিনি, নারীর প্রতি যৌন সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি। নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে পারিনি। দেশে নারী নির্যাতনের হার এত বেশি, সামাজিক নীতি ও শৃঙ্খলার বাঁধন নারীর জন্য এত কঠিন যে তাতে করে মেয়েরা যৌন সহিংসতার শিকার হবেন না, এটা আলাদা করে বলার সাহস করা যায় না। কিন্তু এভাবে আর কত মেয়েকে নির্যাতিত হতে হবে? এ লড়াই তো শুধু মেয়েদের নয়, এ তো শুভবুদ্ধি সম্পন্ন সমস্ত মানুষের লড়াই। আমরা যদি এই সহজ সত্যটি উপলব্ধি না করি তাহলে আগামীতে সমূহ বিপদ। কেবল আমরা সচেতন হলেই এ সমস্যা থেকে মুক্তি সম্ভব। নারীকে তার প্রাপ্য মর্যাদা দিতে, আমাদের মানসিকতার পরিবর্তনও জরুরি। নারীকে অবলা ভাবার মানসিকতা বদলাতে হবে। নারীর অধিকার, মর্যাদা ও ক্ষমতা হতে হবে পুরুষেরই সমান। মুখ বুজে সহ্য নয়, বরং প্রতিবাদই নারী নির্যাতন, নারীর প্রতি যৌন সহিংসতা হ্রাস করতে পারে। আমাদের সমাজব্যবস্থা নারীকে মানিয়ে নেওয়ার যে শিক্ষা দেয়, তা থেকে সরে এসে প্রতিবাদ করাও জরুরি। অন্যথায় পরিস্থিতির খুব বেশি পরিবর্তন হবে না।