প্রযুক্তি
শহিদুল ইসলাম
প্রকাশ : ০৯ মার্চ ২০২৬ ১১:০৮ এএম
শহিদুল ইসলাম, অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
শিরোনামে ব্যবহৃত ১৯৪৬ সালে রচিত যাযাবরের (বিনয় মুখোপাধ্যায়) লেখা ‘দৃষ্টিপাত’ নামের ভ্রমণ কাহিনীর এই জনপ্রিয় উক্তিটি শোনেননি, এমন শিক্ষিত মানুষের দেখা পাওয়া ভার। স্কুলে আমরা রচনাও লিখেছি এই বিখ্যাত উক্তি নিয়ে। পাঠক হয়তো অবাক হচ্ছেন এই ভেবে যে এতদিন পরে আমি আবার এটা নিয়ে আগ্রহী হয়ে উঠলাম কেন?
এই বিষয়টি আমার অত্যন্ত প্রিয় একটি বিষয়। যাযাবরের দৃষ্টিপাত পড়েছিলাম পঞ্চাশের দশকে যখন আমি স্কুলে পড়ি। তখন থেকেই বিষয়টি আমার মনোযোগ আকর্ষণ করে। এ নিয়ে বেশ ক’টা লেখাও লিখেছিলাম বিভিন্ন কাগজে ২০১০/১২ সালের দিকে। বিজ্ঞান প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নয়নের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি আজ আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। তাই বিষয়টি আবার সামনে নিয়ে এসেছেন ড. জারেড কুনি হারভাথ নামের একজন শিক্ষক, যিনি পরবর্তীতে নিজেকে একজন শিশু কগনেটিভ বিশেষজ্ঞে পরিণত করেন। সম্প্রতি তার ছোট্ট একটি বক্তৃতা আমার হাতে এলো। বারবার শুনলাম। ভীষণ আগ্রহ সৃষ্টি করার মতো বক্তৃতা! তাই তার বক্তৃতার সারাংশ আমাদের পিতামাতা ও রাষ্ট্রের সামনে তুলে ধরবার এক অনুভবের জায়গা থেকে এই লেখা।
শুরুতেই তিনি দুঃখ করে বলেছেন যে, আজকের শিশুদের জ্ঞান আহরণের ক্ষমতা অনেক দুর্বল। আমরা যখন তাদের বয়সী ছিলাম তখন আমাদের জ্ঞান আহরণের যে স্পৃহা, আগ্রহ ও ক্ষমতা ছিল, এখনকার শিশুদের তা নেই। অষ্টাদশ খ্রিস্টাব্দের শেষ ভাগ থেকে প্রত্যেক প্রজন্মের মধ্যে তাদের পিতামাতাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার একটা প্রবণতা লক্ষ করা যায়। শিশুরা তখন স্কুলে বেশি সময় কাটাত সহপাঠী ছাত্র ও শিক্ষকের সান্নিধ্যে। আজকের শিশুরা স্কুলে বেশি সময় কাটালেও দেখা যায় তাদের জ্ঞান আহরণের স্পৃহা, আগ্রহ ও ক্ষমতা কম। কেন? আমাদের শৈশব অবস্থা ও এখনকার শিশুদের মধ্যে পার্থক্যটা কোথায়? বায়োলজিক্যালি কোনোই পার্থক্য নেই। স্কুলও মূলত একই আছে। তাহলে এই পার্থক্যটা কে রচনা করল? শ্রেণিকক্ষের বাহ্যিক উন্নয়ন ঘটেছে এটা ঠিক। কিন্ত শিক্ষা দেওয়ার বিষয়টাই তো প্রধান। পূর্বের চাইতে আজ শিক্ষকের মানের উন্নয়ন হয়েছে এটা তো আর ভুল নয়। তা সত্ত্বেও শিশুদের জ্ঞান আহরণের ক্ষমতা ও ইচ্ছাটা কমে গেল কেন? কেন এই পার্থক্য রচিত হলো?
এই প্রশ্ন সামনে রেখেই তিনি দীর্ঘ দিন ধরে কাজ করছেন। তিনি দুঃখের সঙ্গেই ওপরের কথাগুলো বলেছেন।
তিনি বলেন, আধুনিক বিশ্বে জেনজি জেনারেশনই প্রথম, যারা শিক্ষার সর্বক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়েছে। শিক্ষার প্রতি তারা মনোযোগ হারিয়ে ফেলেছে। তাদের চিন্তা করার ক্ষমতা, তাদের মনে রাখবার ক্ষমতা, সৃজনশীল কর্ম-তৎপরতার প্রতি তাদের আগ্রহ কমেছে; এমনকি তাদের সাধারণ আইকিউর অধোগমন শঙ্কার জন্ম দিয়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন ২০১০ সালের পর এমন কী হলো যে স্কুল ও জ্ঞানার্জন আলাদা হয়ে গেল? আমরা শিশুদের স্কুলে পাঠাই বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান আহরণের জন্য। কিন্তু স্কুল থেকে জ্ঞান আহরণের পথটি বন্ধ হয়ে গেল কেন? উত্তরে তিনি বলেন যে, যেদিন থেকে বৈজ্ঞানিক সরঞ্জামাদি স্কুলে প্রবেশ করতে শুরু করেছে, শ্রেণিকক্ষ ডিজিটালাইজড হতে শুরু করেছে, তখন থেকে শিশুদের বোধগম্যতা কমতে শুরু করেছে। শিশুরা ক্রমাগত প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। তিনি পৃথিবীর আশিটা দেশের শিশুদের ওপর কাজ করেছেন। তিনি দেখেন যে, যেসব দেশের শিশুরা কখনও কম্পিউটার স্পর্শ করেনি, তাদের মনোযোগ, আগ্রহ ও কোনোকিছু বোঝার ক্ষমতা অনেক বেশি। কম্পিউটার-ভিত্তিক স্কুলগুলোর শিক্ষার্থীরা তাদের চাইতে ২/৩ ভাগ কম কগনেটিভ; কম প্রশ্নবিদ্ধ। যেসব স্কুলে পাঁচ ঘণ্টা কম্পিউটারের স্ক্রিনে শিক্ষা দেওয়া হয়, তাদের পারফরম্যান্স প্রধানত নিম্নগামী। যেসব স্কুলের কম্পিউটার ব্যবহৃত হয় না সেইসব স্কুলের শিক্ষার্থীদের জানার আগ্রহ অনেক বেশি। কেন? পার্থক্যটা কোথায়? সেই একই স্কুল। শিশুরাও বায়োলজিক্যালি একই। তাহলে পার্থক্য ঘটাল কে বা কী? তার মত হলো, টুল বা হাতিয়ার যা আগে শ্রেণিকক্ষে ছিল না, এখন ঢুকেছে; কম্পিউটার, মোবাইল, পাওয়ার পয়েন্ট ইত্যাদি প্রযুক্তি।
তিনি আরও বলেন যে, বায়োলজিক্যালি এটাই সত্য যে, মানুষ মূলত অভিজ্ঞতাবাদী। বড়দের দেখে শেখে; স্ক্রিনে বা অপ্রাকৃত কোনো উপায় থেকে নয়। অনেক আগে ডারউইনের শিক্ষা দর্শনে আমি লিখেছিলাম যে, প্রাচীন যুগে যখন কিছুই ছিল না, না স্কুল না শিক্ষা সরঞ্জাম, তখন শিশুরা বড়দের কাজ দেখেই শিখত। অর্থাৎ শিক্ষা হচ্ছে একটি অভিজ্ঞতাবাদী প্রক্রিয়া। শৈশবে মানুষ দেখে শেখে।
উদাহরণ হিসেবে তিনি ৭৫০ শব্দের একটি ও দুটি ৭৫ শব্দবিশিষ্ট রাইটিং ও রিডিং কম্রিহেন্সিভের উল্লেখ করে প্রমাণ করেন যে শিশুরা সেগুলো ভাসা ভাসাভাবে পড়ে ও উত্তর লেখে। তিনি বলছেন যে, বায়োলজিক্যালি মানুষ অন্য মানুষের কাছ থেকে শেখে। কম্পিউটারের স্ক্রিন থেকে নয়। কম্পিউটার স্বতঃপ্রণোদিতভাবে কিছুই শেখায় না। মেশিনের কাছে আমরা কি চাই? শিশুদের শিক্ষিত করতে? না, আমরা মেশিনের প্রয়োজনে শিক্ষা পরিচালনা করি।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘এটা কি উন্নয়ন?’ বলেন, ‘না, এটা প্রযুক্তির কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ।’
এবার আমার নিজের কিছু অভিজ্ঞতার কথা এর সঙ্গে যুক্ত করব। এগুলো আগেও লিখেছি। আমাদের ব্রেইনের তথ্য ধারণ করার একটা সীমা আছে। আমরা যা দেখি, যা শুনি, যা করি, তার কতটুকু আমাদের ব্রেইন ধরে রাখতে পারে? কতদিন ধরে রাখতে পারে? আমাদের মস্তিষ্ক স্বতঃপ্রণোদিতভাবে অনেক কিছুই মনে রাখে না। খুব প্রয়োজনীয় স্মৃতিগুলো দীর্ঘদিন মনে রাখে। তাই সবকিছুই মনে রাখবার দায়িত্ব ব্রেইনের ওপর না চাপিয়ে অন্য কোনো উপায়ের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে। তাহলে ব্রেইনটা হাল্কা থাকে। নতুন নতুন বিষয় নিয়ে চিন্তা করার জায়গা পাওয়া যায় তখন।
উদাহরণ হিসেবে, আমার নিজের কিছু অভ্যাসের কথা বলি। যখন চিঠি লেখার যুগ ছিল তখন বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে চিঠি চালাচালি হতো। আমি কখনও কারও ঠিকানা মস্তিষ্কে স্টোর করতাম না। একটা নোটবুকে লিখে রাখতাম। প্রত্যেকবার চিঠি লিখে নোটবই দেখে ঠিকানা লিখতাম। যদি ওই নোটবইটা হারিয়ে যেত তাহলে আমি কানা হয়ে যেতাম। কেবল আমি নয়, অনেকেই ঠিকানা মনে রাখতেন না। একবার কলকাতা যাওয়ার পথে হাসান আজিজুল হকের পকেট কেটে মানিব্যাগ ও ঠিকানার নোটবইটি চুরি হয়ে যায়। তিনি যশোর গিয়ে আমাকে ফোন করেন। কলকাতার অনেকেই আমাদের উভয়ের বন্ধু। তাদের ফোন নম্বর আমার কাছেও লেখা ছিল। তিনি কয়েকজনের ফোন নম্বর লিখে নিলেন।
যখন গাড়িতে জিপিএস লাগেনি, তখন সবাই রাস্তাঘাট চিনতে পারত। রাস্তাঘাট চেনার দায়িত্ব যখন জিপিএস নেভিগেশন সিস্টেম বা গুগল ম্যাপের ওপর ছেড়ে দেওয়া হলো, তারপর ধীরে ধীরে আগের মতো রাস্তাঘাট চেনার ক্ষমতা আমরা হারিয়ে ফেললাম। কম্পিউটারের ব্যবহার আমাদের চিন্তা করার ক্ষমতা কতটা কমিয়ে দেয় তার প্রমাণ আমি পাই ২০০৫ সালে। ওই সালটা বিশ্বে আইনস্টাইন বছর হিসেবে পালিত হয়েছিল। ১৯০৫ সালে আইনস্টাইন তার স্পেশাল রিলেটিভিটি থিয়োরিসহ পাঁচটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছিলেন। তারই একশ বছর পূর্তি উপলক্ষে ২০০৫ সালটা সারা বিশ্বে ‘আইনস্টাইন বছর’ হিসেবে পালিত হয়েছিল। সেই বছরেই আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে ঢাকায় চলে আসি। এসেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ড. অজয় রায়ের নেতৃত্বে ‘শিক্ষা আন্দোলন মঞ্চে’ যোগ দেই। শিক্ষা আন্দোলন মঞ্চের উদ্যোগে আইনস্টাইন বছরটি আমরা পালন করি। আমরা দুটি প্রবন্ধ আহ্বান করি। একটি ছোটদের জন্য এবং আর একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের জন্য। দুই ক্যাটেগরিতে পঞ্চাশটা প্রবন্ধ জমা পড়েছিল। সেগুলো দেখার দায়িত্ব আমাকে দেওয়া হয়েছিল। আমি অবাক হয়ে লক্ষ করি যে, সবগুলো প্রবন্ধের উপাত্তগুলো কম্পিউটার থেকে নেওয়া। তাই প্রায় সবগুলোই একই রকম। বড়দের যে ছেলেটি পুরস্কার পায় তার লেখার মধ্যেই কেবল তার নিজস্ব কিছু ভাবনার হদিস পাই। সেজন্য সে পুরস্কারটি জিতে নেয়। তাকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারি যে, সে কবিতা ও ছোট গল্প লেখে ছোটকাগজে। অর্থাৎ তার মধ্যে সৃজনশীল এক সত্তা বাসা বেঁধে ছিল। তাই মেশিনের বাইরে গিয়েও সে নিজেকে মেলে ধরতে পেরেছিল। তাই অস্ট্রেলিয়া, নরওয়েসহ ইউরোপের বেশ ক’টি দেশ ক্লাস সিক্স পর্যন্ত কম্পিউটার, মোবাইল, পাওয়ার পয়েন্ট ইত্যাদি প্রযুক্তি শিশুদের হাতে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যাতে করে মানবিক সম্পর্ক, আন্তরিকতা ও অনুভূতির জায়গাগুলো সংকুচিত না হয়ে পড়ে।
শহিদুল ইসলাম
অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়