মধ্যপ্রাচ্য
মেশকাত সাদিক
প্রকাশ : ০৯ মার্চ ২০২৬ ১০:১৬ এএম
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির হত্যাকাণ্ড মধ্যপ্রাচ্যসহ গোটা বিশ্বের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। ছবি: এএফপি
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির হত্যাকাণ্ড মধ্যপ্রাচ্যসহ গোটা বিশ্বের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। করোনা ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পরপরই ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া এই অসম যুদ্ধের ফলাফল বিশ্ব অর্থ-ব্যবস্থাকে পুনরুদ্ধার অযোগ্য অবস্থানে নিয়ে ফেলবে। ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় এই নেতার হত্যাকাণ্ড রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসের গভীরতম সংকট। এটি বিশ্বযুদ্ধ না হলেও উপবিশ্বযুদ্ধের সমতুল্য। এই ধরনের ঘটনা কেবল একজন ব্যক্তির শারীরিক অপসারণ বা চিরবিদায় নয়; এটি শাশ্বত আদর্শ, সত্যের পক্ষের দুর্দমনীয় আন্দোলন যা, কোটি কোটি মানুষকে প্রভাবিত করেছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতার ওপর ইসরায়েল-আমেরিকার এই আক্রমণ নিঃসন্দেহে আড়াই হাজার বছরের পুরনো পারস্য-সাম্রাজ্যের দৃষ্টিভঙ্গির ওপর প্রতীকী আক্রমণের প্রতিনিধিত্ব করে। ইরানে ১৯৭৯ সালে ইসলামী বিপ্লবের স্থপতি আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি ছিলেন বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের একজন। ইমাম খামেনি ছিলেন তার সুযোগ্য উত্তরসূরি। তাই এই হত্যাকাণ্ড ইরানের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা, রাজনৈতিক ইসলামের আদর্শিক গতিপথ, মধ্যপ্রাচ্যে ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য, পশ্চিমা এবং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর মধ্যে বৈশ্বিক সম্পর্ক এবং আদর্শিক প্রতিরোধ আন্দোলনের বৃহত্তর ভবিষ্যতের ওপর গভীর এবং স্থায়ী প্রভাব ফেলবে। কারণ আয়াতুল্লাহ খোমেনি কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না; তিনি ইরানের ইসলামী বিপ্লবের আদর্শিক মেরুদণ্ড ছিলেন। তার নেতৃত্ব ইরানকে শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভীর অধীনে পশ্চিমাপন্থী রাজতন্ত্র থেকে ধর্মীয় নীতি দ্বারা পরিচালিত একটি ইসলামী প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরিত করেছিল। লাখ লাখ অনুসারীর কাছে, খোমেনি সাম্রাজ্যবাদ, পশ্চিমা আধিপত্য এবং কর্তৃত্ববাদী রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক ছিলেন। তার আদর্শ স্বাধীনতা ও ইসলামী শাসনের পক্ষে এবং বিদেশি প্রভাবের বিরুদ্ধে। বলা চলে আধিপত্যবাদের চরম বিরুদ্ধে।
ইসরায়েল-আমেরিকা মনে করেছিল, খামেনি হত্যার তাৎক্ষণিক পরিণতি হবে ইরানে তীব্র অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা। তাদের ধারণা ছিল, আমেরিকাতে নির্বাসিত রেজা পাহলভী ইমাম খামেনির বিরুদ্ধে আন্দোলনে সমর্থক হবে। কারণ ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর তিনি সপরিবারে ইরান ত্যাগ করেন এবং বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত জীবনযাপন করছেন। তিনি ইরানের বর্তমান সরকারবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত। কিন্তু তার সেই খায়েশ ইরানিরা এখনও পূরণ করতে দেয়নি। কারণ খোমেনির ব্যক্তিগত কর্তৃত্ব বিভিন্ন বিপ্লবী গোষ্ঠীর মধ্যে ঐক্যবদ্ধ শক্তি হিসেবে কাজ করেছিল, যার মধ্যে ধর্মযাজক, ধর্মনিরপেক্ষ বিপ্লবী এবং ছাত্র অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ ছাড়াও ইসলামী রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে, শাহাদাত অপরিসীম প্রতীকী শক্তি বহন করে। তার হত্যা তার আদর্শকে দুর্বল করেনি; বরং এটি তাকে প্রতিরোধের চিরন্তন প্রতীকে রূপান্তরিত করেছে এবং প্রকারান্তরে ইরানিদের স্বজাত্যবোধকে আরও শক্তিশালী এবং শানিত করেছে।
ইরান যুদ্ধে ইসরায়েল-আমেরিকার জয়লাভ কঠিন ব্যাপার। যদি তারা জয়লাভ করে তাহলে ইরানে আমেরিকার দাস রেজা পাহলভী ক্ষমতায় বসবে। আর যদি ইরান জয়লাভ করে তবে দীর্ঘমেয়াদে খামেনি হত্যা ইরানের বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকেও অপার শক্তিশালী করতে পারে। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) মতো বিপ্লবী প্রতিষ্ঠানগুলো সম্ভবত তার মৃত্যুতে ক্ষমতা সুসংহত করতে, বিরোধী দলকে দমন করতে এবং কঠোর আদর্শিক নিয়ন্ত্রণকে ন্যায্যতা দেওয়ার জন্য ব্যবহার করবে। খামেনির হত্যাকাণ্ড পশ্চিমাবিরোধী মনোভাবকে আরও জোরদার করতে পারে। শহীদদের আখ্যান চিরকাল বিপ্লবী আন্দোলনে শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে। ইতোমধ্যেই ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেকশিয়ান কারবালায় ইমাম হুসেনের শাহাদাতের সাথে ইমাম খামেনির শাহাদাতকে তুলনা করেছেন। শুধু ইরান নয়; ইরাক, তুরস্ক, সিরিয়া, মিসর, লেবানন, আফগানিস্তান এবং পাকিস্তনের বেলুচিস্তানসহ সকল শিয়া অধ্যুষিত এলাকায় এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের ব্যাপক প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে। ফলে ইরানের অভ্যন্তরে পদাতিক সেনার আক্রমণের জন্য প্রস্তত ইসরায়েল-আমেরিকার স্থলাভিযানে জেতার সম্ভাবনা অতিক্ষীণ। বরং ইরানিদের নিকট ইসরো-আমেরিকার শোচনীয় পরাজয় হতে পারে।
খোমেনির হত্যাকাণ্ড পশ্চিমা দেশগুলো এবং মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর মধ্যে বৈশ্বিক সম্পর্কের ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে। এই ধরনের ঘটনা পশ্চিমা শক্তিগুলোকে ইসলামী স্বাধীনতার প্রতি শত্রু হিসেবে চিত্রিত করেছে। এর ফলে অবিশ্বাস বৃদ্ধি পেয়েছে। আস্থার সংকট সৃষ্টি হয়েছে। কূটনৈতিক সম্পর্ক ও সহযোগিতা হ্রাস পাচ্ছে এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হচ্ছে। বিপরীতে যদি তার হত্যাকাণ্ড অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের ফলে হতো, তাহলে এটি বিপ্লবী আন্দোলনের মধ্যে বিভাজন প্রকাশ করতে পারত, যা তাদের আদর্শিক সংহতিকে দুর্বল করে দিতে। আধুনিক ইতিহাসে একটি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় খামেনি ছিলেন সবচেয়ে সফল নেতাদের অন্যতম। তার হত্যা তাই রাজনৈতিক ইসলামকে নির্মূল করতে পারবে না; বরং, বহুগুণ শক্তিশালী করবে। তার মৃত্যু নতুন নেতা এবং স্বদেশি আন্দোলনকে বেগবান করবে। অনুপ্রাণিত করবে অপরিসীম। ধর্মপ্রতিষ্ঠার শাহাদত প্রায়শই শক্তিশালী আদর্শিক উত্তরাধিকার তৈরি করে, যা ব্যক্তিগত নেতৃত্বকে ছাড়িয়ে যায়। তার এই হত্যা বিপ্লবী ইসলামী আদর্শের বিশ্বব্যাপী বিস্তারকে ত্বরান্বিত করবে। ইসরায়েল-আমেরিকার সমর্থকদের সাথে ইরানের সম্পর্ক কেয়ামত পর্যন্ত আর স্বাভাবিক হবে না।
ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতির ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে। প্রধানত জ্বালানি বাজার, বাণিজ্য রুট, আর্থিক বাজার এবং মুদ্রাস্ফীতির মাধ্যমে। যেহেতু মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অঞ্চল, তাই এর অর্থনৈতিক প্রভাব দ্রুত বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে বিশ্বব্যাপী তেল ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, যুদ্ধ প্রলম্বিত হলে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১৫০ ডলারে পৌঁছাতে পারে। ইরানের কাছে হরমুজ প্রণালী বিশ্বের তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ বহন করে। ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি। পরিবহন খরচ বৃদ্ধি। বিশ্বব্যাপী বিদ্যুৎ ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি। বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি বিশ্বকে সাংঘাতিক অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যে ফেলবে। তেল সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে বিদ্যুৎ জ্বালানির ব্যাপক সংকট দেখবে বিশ্ব। এতে কৃষিজ উৎপাদন, শিল্পকলকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হবে। সুতরাং অর্থনৈতিক মন্দাকে স্বাভাবিক করতে গিয়ে শক্তিশালী দেশ দুর্বল দেশের সম্পদ লুণ্ঠনের লক্ষ্যে নতুন নতুন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে। যার ফলাফল স্বরূপ ২০৪০-এর দশকে পৃথিবীর হতভাগ্য মানুষ তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ দেখার মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে।
আলি খামেনির হত্যাকাণ্ড ইরান, মধ্যপ্রাচ্য এবং বিশ্ব রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্য গভীর এবং সুদূরপ্রসারী পরিণতি বয়ে আনবে। তার হত্যাকাণ্ড সম্ভবত বিপ্লবী আদর্শকে তীব্রতর করেছে, শহীদদের আখ্যানকে শক্তিশালী করেছে এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনাকে আরও গভীর খাদের কিনারায় পৌঁছে দিয়েছে। ইরানের ওপর ইসরায়েল-আমেরিকার এই একপক্ষীয় যুদ্ধ ও আগ্রাসন খুব সম্ভবত বিশ্বকে গুরুতর অর্থনৈতিক সংকটে নিপতিত করছে এবং এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে পরবর্তী বিশ্বযুদ্ধ হতে যাচ্ছে।
মেশকাত সাদিক
কলাম লেখক ও কবি