সহিদুল আলম স্বপন
প্রকাশ : ০৯ মার্চ ২০২৬ ০৯:০৮ এএম
বাংলাদেশ সর্বোচ্চ রাজনৈতিক নেতৃত্বে নারীর উপস্থিতির ক্ষেত্রে ইতোমধ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
একটি দৃঢ় ও সম্ভাবনাময় জাতি হিসেবে আমরা বহুবার নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছি। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থেকে শুরু করে সামাজিক উন্নয়নের নানা সূচকে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। দৃঢ় নেতৃত্ব এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ কীভাবে একটি দেশকে এগিয়ে নিতে পারে, বাংলাদেশ তার উজ্জ্বল উদাহরণ। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র এখনও অধিক মনোযোগ দাবি করে আর তা হলোÑ রাজনীতিতে নারী ও তরুণদের অর্থবহ অংশগ্রহণ। দেশে নারী ও তরুণ মিলিয়ে যেখানে জনসংখ্যার বড় অংশ, সেখানে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের প্রতিনিধিত্ব এখনও সীমিত। তাই তাদের ক্ষমতায়ন কেবল ন্যায়বিচারের প্রশ্ন নয়; এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের শক্তি, স্থিতিশীলতা এবং ভবিষ্যতের জন্য অপরিহার্য।
বাংলাদেশ সর্বোচ্চ রাজনৈতিক নেতৃত্বে নারীর উপস্থিতির ক্ষেত্রে ইতোমধ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। দীর্ঘ সময় ধরে নারী প্রধানমন্ত্রী দ্বারা দেশ পরিচালিত হওয়া আন্তর্জাতিক পর্যায়েও অগ্রগতির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। তবে শীর্ষ পর্যায়ে এই সাফল্য এখনও দেশের সর্বস্তরের রাজনীতিতে নারীর বিস্তৃত ক্ষমতায়নে পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়নি। স্থানীয় সরকার, জাতীয় সংসদ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর কাঠামোতে নারীর অংশগ্রহণ এখনও তুলনামূলকভাবে কম। অনেক নারীই সংসদে সংরক্ষিত আসনের মাধ্যমে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন, যা অনেক ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারণে তাদের প্রভাব সীমিত করে।
এই পরিস্থিতির পেছনে রয়েছে নানা কাঠামোগত ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতা। প্রচলিত সামাজিক মানসিকতা, আর্থিক সীমাবদ্ধতা এবং রাজনৈতিক নেটওয়ার্কের অভাব অনেক নারীকে রাজনীতিতে আসার আগ্রহ থেকে বিরত রাখে। বাংলাদেশের রাজনীতি অনেক সময় অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক এবং ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে, যা এমন নারীদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায় যাদের কাছে পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক সহায়তা বা শক্তিশালী দলীয় সংযোগ নেই। পাশাপাশি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ, সামাজিক সমালোচনা এবং হয়রানির আশঙ্কাও অনেক যোগ্য নারীকে রাজনীতির অঙ্গনে আসতে নিরুৎসাহিত করে।
তবে বিশ্বব্যাপী নানা গবেষণা দেখিয়েছে যে রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ সুশাসনকে আরও শক্তিশালী করে। নারী নেতৃত্ব প্রায়ই শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক কল্যাণ এবং কমিউনিটি উন্নয়নের মতো বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেয়। এসব ক্ষেত্র সরাসরি মানুষের জীবনমানের সঙ্গে সম্পর্কিত। বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার পর্যায়েও এমন অনেক উদাহরণ রয়েছে যেখানে নির্বাচিত নারী প্রতিনিধিরা সমাজের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তারা বিভিন্ন উন্নয়নমূলক উদ্যোগ বাস্তবায়ন করেছেন, সেবার সুযোগ বৃদ্ধি করেছেন এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে কাজ করেছেন।
নারীদের সংরক্ষিত আসনের ওপর নির্ভর না করে সরাসরি নির্বাচনে অংশগ্রহণ বাড়ানো জরুরি। এতে রাজনীতিতে নারীর নেতৃত্বকে স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দলগুলো যদি অধিক সংখ্যক নারীকে নির্বাচনে মনোনয়ন দেয়, নেতৃত্ব বিকাশে প্রশিক্ষণ প্রদান করে এবং নিরাপদ রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করে, তাহলে নতুন প্রজন্মের নারী নেতাদের জন্য রাজনীতির দরজা আরও উন্মুক্ত হবে।
একই সঙ্গে তরুণদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম তরুণ জনসংখ্যার দেশ, যেখানে জনগণের বড় একটি অংশের বয়স ৩৫ বছরের নিচে। এই তরুণরা উদ্যমী, সৃজনশীল এবং শিক্ষা ও প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী নানা ধারণার সঙ্গে পরিচিত। তবুও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে তাদের প্রতিনিধিত্ব এখনও সীমিত। অনেক ক্ষেত্রে রাজনীতির নেতৃত্ব পুরনো প্রজন্মের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে। ফলে নীতি নির্ধারণ এবং তরুণদের প্রত্যাশার মধ্যে একটি দূরত্ব তৈরি হয়।
তরুণদের রাজনীতিতে প্রবেশের ক্ষেত্রেও নানা বাধা রয়েছে। রাজনৈতিক কাঠামো অনেক সময় প্রতিষ্ঠিত নেতা এবং পারিবারিক প্রভাব দ্বারা পরিচালিত হয়, যার ফলে নতুন মুখের জন্য সুযোগ তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ে। নির্বাচনী প্রচারণার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক সক্ষমতাও তরুণদের জন্য একটি বড় প্রতিবন্ধকতা। এ ছাড়া তরুণদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ অনেক সময় প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর ছাত্র সংগঠনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, যেখানে অনেক ক্ষেত্রে নীতি নির্ধারণের চেয়ে দলীয় আনুগত্য বেশি গুরুত্ব পায়। কিন্তু তরুণদের রাজনীতিতে সম্পৃক্ততা নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এবং উদ্ভাবনী চিন্তার সুযোগ তৈরি করতে পারে। তরুণ নেতারা সাধারণত প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান, পরিবেশ সচেতনতা এবং বৈশ্বিক সহযোগিতার প্রতি বেশি আগ্রহী। দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে, যেখানে ডিজিটাল রূপান্তর, জলবায়ু পরিবর্তন এবং নতুন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ সামনে আসছে, সেখানে তরুণ প্রজন্মের চিন্তা ও অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের সক্রিয় উপস্থিতি নীতি নির্ধারণকে আরও বাস্তবসম্মত ও ভবিষ্যৎ উপযোগী করতে পারে।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলন, স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম এবং নাগরিক উদ্যোগের মাধ্যমে তরুণদের শক্তিশালী ভূমিকা প্রত্যক্ষ করেছে। সড়ক নিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের মতো বিষয়গুলোতে তরুণদের নেতৃত্বে অনেক সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে। ২০২৪-এর জুলাই আন্দোলন তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। এসব উদ্যোগ প্রমাণ করে যে তরুণরা দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন এবং সক্রিয়ভাবে পরিবর্তন আনতে আগ্রহী। এখন প্রয়োজন এই শক্তিকে আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা।
তরুণদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো নাগরিক শিক্ষা কর্মসূচি চালু করতে পারে, যেখানে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, নেতৃত্ব দক্ষতা এবং নীতি বিশ্লেষণ শেখানো হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে সুস্থ বিতর্ক, রাজনৈতিক সচেতনতা এবং নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ তৈরি করা উচিত। এর মাধ্যমে তরুণদের মধ্যে দায়িত্বশীল নাগরিকত্ব এবং গঠনমূলক রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সংস্কৃতি গড়ে উঠবে।
রাজনৈতিক দলগুলোকেও নারী এবং তরুণদের জন্য নেতৃত্বের সুযোগ তৈরি করতে হবে। তাদের শুধু প্রতীকী ভূমিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রকৃত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে হবে। অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদদের সঙ্গে তরুণ-তরুণীদের সংযোগ স্থাপন করে মেন্টরশিপ কর্মসূচি চালু করা হলে প্রজন্মের মধ্যে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার সেতুবন্ধন তৈরি হবে। নারী ও তরুণদের ক্ষমতায়ন কোনো বিলাসিতা নয়; এটি একটি অপরিহার্য প্রয়োজন। কারণ বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে কত দ্রুত এবং কত কার্যকরভাবে আমরা তাদের রাজনীতির প্রান্ত থেকে মূলধারায় নিয়ে আসতে পারি।
সহিদুল আলম স্বপন
সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক