সারের মূল্যবৃদ্ধি
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০৮ মার্চ ২০২৬ ১১:৩০ এএম
ধানক্ষেতে সার দিচ্ছেন এক কৃষক। ফাইল ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
দেশের কৃষি-অর্থনীতি মূলত কৃষকের ঘাম ও শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সহজ করে বললে, দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষকের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, কৃষির এই ভরা মৌসুমে সারের মূল্যবৃদ্ধি কৃষকদের জন্য বড় ধরনের সংকট তৈরি করেছে। যখন জমিতে ফসল উৎপাদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়, ঠিক তখনই সারের দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেক কৃষক দিশাহারা হয়ে পড়েছেন। অভিযোগ উঠেছে, দেশের বহু স্থানে ডিলারদের কাছে পর্যাপ্ত সার মজুদ থাকলেও খোলাবাজারে সরকারি দামে বিক্রি না করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হচ্ছে। ফলে কৃষক বেশি দামে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। কৃষকদের অভিযোগ, ডিলারের কাছে গেলে বস্তা ভেঙে খুচরা বিক্রি করা হচ্ছে না। সারের এই মূল্যবৃদ্ধি কেবল কৃষকের ওপর বাড়তি চাপ নয়, এর প্রভাব শেষপর্যন্ত পুরো অর্থনীতিতেই পড়ে। অর্থনীতির ভাষায়, উৎপাদন খরচ বাড়লে বাজারে খাদ্যপণ্যের দামও বাড়বে, যা সাধারণ ভোক্তার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বইকি।
এখন বোরো ধান উৎপাদনের মৌসুম। ধান ছাড়াও সবজি ও অন্যান্য ফসলের আবাদ পুরোদমে চলছে। এই সময় জমিতে পর্যাপ্ত সার প্রয়োগ না করলে ফলন কমে যায়। কিন্তু অনেক কৃষক প্রয়োজনীয় সার কিনতে পারছেন না। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে কম সার ব্যবহার করছেন, আবার কেউ ধারদেনা করে সার সংগ্রহ করছেন। এতে তাদের উৎপাদন খরচ যেমন বাড়ছে, তেমনি ভবিষ্যতে লাভের সম্ভাবনাও কমে যাচ্ছে। উল্লেখ করা যায়, দেশে সবচেয়ে বেশি ধান উৎপাদিত হয় বোরো মৌসুমে। আর আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা মূলত বোরো ফসলকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠা। অন্যান্য মৌসুমে ধানের উৎপাদন হয় তুলনামূলক কম। এই মৌসুমের উৎপাদন অনেকাংশে নির্ভর করে রাসায়নিক সার ও সেচব্যবস্থার ওপর। তবে চলতি বছর সারের দামের কারণে বিপাকে পড়েছেন কৃষক। এতে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কৃষি-অর্থনীতিবিদরা। জানা গেছে, এক মাস আগে মৌসুমের শুরুতে সারের যে দাম ছিল, বর্তমানে তা প্রতি কেজিতে ৫ থেকে ১৩ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। অনেক এলাকায় বেশি দাম দিয়েও চাহিদা অনুযায়ী সার পাচ্ছেন না কৃষক। সরকার কৃষক পর্যায়ে সারের দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে। সেই অনুযায়ী ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি) সারের দাম প্রতি কেজি ২৭ টাকা, মিউরেট অব পটাশ (এমওপি) ২০ টাকা ও ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) ২১ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সরকার নির্ধারিত দামে সার পাওয়া যাচ্ছে না। কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সারের সরবরাহে ঘাটতি, বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের তৎপরতা এবং তদারকির দুর্বলতার কারণে প্রায়ই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়। ফলে কৃষক প্রতারিত হচ্ছেন এবং কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে।
এ কথা স্বীকার করতে হবে, দেশের অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তার মূল ভিত্তি কৃষি খাত। কিন্তু উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, সারের দাম বাড়া, ন্যায্যমূল্য না পাওয়া এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগÑ সব মিলিয়ে কৃষকের জীবন ও জীবিকা কঠিন হয়ে উঠছে। তাই কৃষি ও কৃষকের স্বার্থে সরকারের দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এই ক্ষেত্রে সার, বীজ ও কীটনাশকসহ কৃষি উপকরণের সরবরাহ ও দাম নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে। ভরা মৌসুমে যেন কোনো কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি না হয়, সেজন্য বাজার তদারকি জোরদার করা প্রয়োজন। কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে কৃষিঋণ এবং ভর্তুকি কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করতে হবে, যাতে তারা কম খরচে উৎপাদন চালিয়ে যেতে পারেন। কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে কার্যকর বাজার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। কৃষক যেন সরাসরি তাদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে পারেন, সেজন্য মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানো জরুরি। পাশাপাশি সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির প্রসার ঘটাতে হবে।
আমরা মনে করি, যথাযথ তদারকি না থাকলে ভবিষ্যতে সারের সংকট আরও তীব্র হবে এবং চাষাবাদে বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হবে। তাই সারের দাম নিয়ন্ত্রণে সারের সরবরাহ ও বিপণন কার্যক্রমের ওপর কড়া নজরদারি রাখতে হবে। বিশেষ করে, বরাদ্দ বহির্ভূত সার নিয়ে সিন্ডিকেটের অপতৎপরতা বন্ধ করতে হবে। বিএডিসি এবং বিসিআইসির সঙ্গে জড়িত অসাধু কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। এই ক্ষেত্রে সরকারি কৃষি ভর্তুকির আওতায় কৃষকদের জন্য সরাসরি সারের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। আমরা বিশ্বাস করি, কৃষক বাঁচলে কৃষি বাঁচবে, আর কৃষি বাঁচলেই দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে। তাই কৃষি ও কৃষকের স্বার্থে এখনই বাস্তবমুখী ও দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।