মধ্যপ্রাচ্য
শাহাব উদ্দিন মাহমুদ
প্রকাশ : ০৮ মার্চ ২০২৬ ১১:১২ এএম
ইতিহাসের পাতায় অনেক রাষ্ট্রই ভুল নীতির কারণে ধ্বংস হয়েছে, কিন্তু পাকিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতি যেন একটি সুপরিকল্পিত চিত্রনাট্যের বাস্তবায়ন। ছবি: সংগৃহীত
২০২১ সালের আগস্টে কাবুলের পতন এবং মার্কিন সেনাদের প্রস্থানকে অনেকে কেবল একটি সামরিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু গত কয়েক বছরের বিশ্ব-পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, এটি ছিল পেন্টাগন ও হোয়াইট হাউসের এক গভীর কৌশলগত চাল। এই প্রস্থানের মাধ্যমে আমেরিকা মূলত তার সম্পদ ও শক্তিকে দক্ষিণ এশিয়া থেকে সরিয়ে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের নতুন ফ্রন্টে কেন্দ্রীভূত করেছে এবং একই সঙ্গে রাশিয়া ও চীন সীমান্তে অস্থিরতার বীজ বপন করে দিয়ে গেছে।
এক.
আমেরিকা আফগানিস্তানে প্রতিদিন প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করত। এই বিশাল অঙ্কের অর্থ এবং সামরিক শক্তি একটি নিষ্ফল যুদ্ধে আটকে না রেখে তারা ইউক্রেন এবং পরবর্তীতে মধ্যপ্রাচ্যে (গাজা সংঘাত) ব্যবহারের পরিকল্পনা করেছিল। ফলত কাবুল ত্যাগের মাত্র কয়েক মাস পরেই ইউক্রেন যুদ্ধের সূচনা হয়। আফগানিস্তান থেকে মুক্ত হওয়া অর্থ এবং লজিস্টিক সাপোর্ট এখন ইউক্রেনকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে প্রক্সি যুদ্ধে টিকিয়ে রাখতে ব্যবহৃত হচ্ছে। অন্যদিকে গাজায় ইসরায়েলের সমর্থনে আমেরিকা যে বিপুল সামরিক ও কূটনৈতিক বিনিয়োগ করছে, তা আফগানিস্তানে ব্যস্ত থাকলে তাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হতো। আমেরিকার প্রস্থানের ফলে আফগানিস্তানে যে ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তাতে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে এক নতুন প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। ভারত অত্যন্ত কৌশলে তালেবানদের সঙ্গে মানবিক সহায়তা ও উন্নয়নের মাধ্যমে সম্পর্ক স্থাপন করেছে। অন্যদিকে, পাকিস্তান যে তালেবানকে ক্ষমতায় চেয়েছিল, আজ তারাই পাকিস্তানের প্রধান শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দুই.
চীন তার ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই)-এর জন্য আফগানিস্তানে শান্তি চায়। কিন্তু পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তে যুদ্ধাবস্থা এবং টিটিপির মতো গোষ্ঠীগুলোর উত্থান চীনের সিপেক (সিপিইসি) প্রকল্পের জন্য বড় হুমকি। আমেরিকা এখানে এমন এক অস্থিরতা রেখে গেছে, যা চীনকে এই অঞ্চলে ব্যস্ত রাখতে বাধ্য করছে, যেন চীন প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে (তাইওয়ান ইস্যু) পূর্ণ মনোযোগ দিতে না পারে।
তিন.
আমেরিকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার একটি বড় অংশ হলো ইরান। আফগানিস্তানের সঙ্গে ইরানের রয়েছে দীর্ঘ সীমান্ত এবং পানি বণ্টন নিয়ে পুরনো বিরোধ। শিয়া প্রধান ইরান এবং সুন্নি উগ্রবাদী তালেবানের মধ্যে আদর্শিক সংঘাত চিরন্তন। আমেরিকা চলে যাওয়ার পর ইতোমধ্যেই হিলমান্দ নদীর পানি নিয়ে ইরান-আফগান সীমান্ত সংঘর্ষ হয়েছে। ভবিষ্যতে যদি ইরান-আমেরিকা বা ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হয়, তবে আমেরিকা আফগানিস্তানকে ইরানের পূর্ব সীমান্তে একটি অস্থির প্রতিবেশী হিসেবে ব্যবহার করবে। তালেবানদের হাতে ফেলে যাওয়া বিলিয়ন ডলারের মার্কিন অস্ত্র পরোক্ষভাবে ইরানের জন্য এক ধরনের চাপ হিসেবে কাজ করবে।
চার.
আফগানিস্তানের অস্থিরতা কেবল পাকিস্তান বা ইরান নয়, বরং মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর মাধ্যমে রাশিয়ার নিরাপত্তার জন্যও হুমকি। তাজিকিস্তান বা উজবেকিস্তানে যদি আফগানিস্তান থেকে উগ্রবাদ ছড়িয়ে পড়ে, তবে রাশিয়াকে বাধ্য হয়ে ইউক্রেন ফ্রন্ট থেকে মনোযোগ সরিয়ে তার নিজ ভূখণ্ডে নজর দিতে হবে। এটি আমেরিকার কৌশলগত বিজয়।
পাঁচ.
আমেরিকা কাবুল ত্যাগ করে যাওয়ার সময় যে অত্যাধুনিক অস্ত্র এবং বিশৃঙ্খল রাজনৈতিক পরিস্থিতি রেখে গেছে, তা আসলে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর জন্য এক ‘বিষাক্ত উপহার’। পাকিস্তান আজ সেই বিষের প্রথম নীলকণ্ঠ হতে চলেছে। ভারত একদিকে যেমন আফগানিস্তানের সঙ্গে সখ্য বাড়িয়ে পাকিস্তানকে চাপে রাখছে, অন্যদিকে এই অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান উগ্রবাদ ভারতের জন্যেও এক দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ছয়.
ইতিহাসের পাতায় অনেক রাষ্ট্রই ভুল নীতির কারণে ধ্বংস হয়েছে, কিন্তু পাকিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতি যেন একটি সুপরিকল্পিত চিত্রনাট্যের বাস্তবায়ন। আমেরিকা যখন ২০২১ সালে তড়িঘড়ি করে কাবুল ত্যাগ করে, তখন তারা কেবল সৈন্য প্রত্যাহার করেনি, বরং দক্ষিণ এশিয়ায় এমন এক ‘টাইম বোমা’ রেখে গেছে, যার প্রথম বিস্ফোরণটি এখন পাকিস্তান সীমান্তে ঘটছে।
আমেরিকা আফগানিস্তানে ফেলে যাওয়া ৭ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের অত্যাধুনিক অস্ত্র এখন তালেবান এবং টিটিপির হাতে। পাকিস্তান যখন এই অস্ত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে ‘গজব লিল হক’ অভিযান শুরু করেছে, তখন তারা আসলে আমেরিকার পাতানো ফাঁদেই পা দিয়েছে। আফগানরা ঐতিহাসিকভাবেই গেরিলা যুদ্ধে অপরাজেয়। পাকিস্তান এই যুদ্ধে জড়িয়ে নিজের সামরিক শক্তি ও অর্থ এমন এক জায়গায় ব্যয় করছে, যেখান থেকে কোনো বিজয় আসার সম্ভাবনা নেই। এটি পাকিস্তানকে অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে পঙ্গু করে দেবে।
পাকিস্তান দীর্ঘকাল আমেরিকার কাছ থেকে সামরিক সহায়তা বা (কোয়ালিশন সাপোর্ট ফান্ড বা সিএসএফ) কথিত সন্ত্রাসবাদ বিরোধী যুদ্ধে (গ্লোবাল ওয়ার অন টেরর) মার্কিন বাহিনীকে সরাসরি সহায়তা প্রদানের বিনিময়ে আর্থিক সহায়তা পাওয়ার আশায় আফগানিস্তানে আমেরিকার এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছে। এখন সেই আমেরিকা পাকিস্তানকে ছুড়ে ফেলে ইউক্রেন ও ইসরায়েল নিয়ে ব্যস্ত। পাকিস্তান যখন সাহায্যের জন্য আবার আমেরিকার দিকে তাকাচ্ছে, তখন আমেরিকা শর্ত দিয়েছে আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার।
সাত.
অন্যদিকে আমেরিকা কাবুলকে কৌশলগতভাবে দিল্লির হাতে তুলে দিয়ে গেছে। ভারত এখন আফগানিস্তানে ‘সফট পাওয়ার’ ব্যবহার করে আফগানদের মন জয় করছে, আর পাকিস্তান সেখানে বোমা ফেলছে। পাকিস্তান একদিকে আফগান সীমান্ত এবং অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে চিরস্থায়ী উত্তেজনায় দুই ফ্রন্টে আটকা পড়েছে। আমেরিকা এটাই চেয়েছিল যেন পাকিস্তান চিরকাল এই দ্বন্দ্বে ব্যস্ত থাকে এবং চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ (বিআরআই) প্রকল্পে কার্যকর ভূমিকা রাখতে না পারে।
আট.
পাকিস্তান চীনের সবচেয়ে বড় কৌশলগত মিত্র। কিন্তু পাকিস্তান যদি আফগানিস্তানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তবে চীনের বিনিয়োগ (সিপিইসি) সম্পূর্ণ মুখথুবড়ে পড়বে। আমেরিকা চায় না এই অঞ্চলে চীনের প্রভাব বাড়ুক। পাকিস্তান আমেরিকার পাতা ফাঁদে পা দিয়ে আফগানিস্তানে যুদ্ধ শুরু করায় চীন এখন পাকিস্তানের ওপর ভরসা হারাচ্ছে। এতে পাকিস্তান না পেল আমেরিকার পূর্ণ সমর্থন, না থাকল চীনের আস্থাভাজন ।
পাকিস্তানের সেনাবাহিনী এখন খোদ পশতুন জনগণের মুখোমুখি। ডুরান্ড লাইনের দুই পাড়ের পশতুনরা পাকিস্তানের এই সামরিক অভিযানকে তাদের জাতির ওপর হামলা হিসেবে দেখছে। পাকিস্তানের ভেতরে থাকা টিটিপি এই সুযোগে সাধারণ মানুষের আবেগ ব্যবহার করে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ উস্কে দিচ্ছে। আমেরিকা ঠিক এই অস্থিতিশীলতাই চেয়েছিল, যেখানে একটি পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র নিজের ভেতরকার সংঘাতে দুর্বল হয়ে পড়ে।
আমেরিকা অত্যন্ত সুনিপুণভাবে আফগানিস্তানকে একটি ‘বোপি ট্র্যাপ’ বা ফাঁদ হিসেবে ব্যবহার করেছে। তারা জানত, পাকিস্তান তার পুরনো অভ্যাস অনুযায়ী আফগানিস্তানে আধিপত্য বিস্তার করতে চাইবে এবং শেষপর্যন্ত আফগান জাতীয়তাবাদের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হবে।
আজ পাকিস্তান যে ‘গজব’ বা ক্রোধের কথা বলছে, সেই ক্রোধ আসলে তাদের নিজেদের ওপরই ফিরে আসছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আমেরিকার মতো পরাশক্তিরা আফগানিস্তান থেকে পালিয়ে প্রাণ বাঁচাতে পেরেছে কারণ তাদের নিজ দেশ নিরাপদ ছিল। কিন্তু পাকিস্তানের সীমানা আফগানিস্তানের সঙ্গে মিশে আছে; তাই এই যুদ্ধে হারলে পালানোর কোনো জায়গা পাকিস্তানের থাকবে না। পাকিস্তান এখন এমন এক ধ্বংসের পথে হাঁটছে যেখানে তার অর্থনীতি, সামরিক কাঠামো এবং ভৌগোলিক অখণ্ডতা- সবই মার্কিন দাবার চালের বলি হতে চলেছে।