প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০৭ মার্চ ২০২৬ ১২:৪২ পিএম
বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকটের প্রভাব মোকাবিলায় বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে এই নির্দেশনা দেন তিনি। ৫ মার্চ, বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে নিজের কক্ষের অর্ধেক বাতি বন্ধ করে ও শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের (এসি) তাপমাত্রা সর্বনিম্ন ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নামিয়ে কার্যক্রম শুরু করেন। তিনি সকল মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানকেও বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার পরামর্শ দেন। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা, জ্বালানি সংকট এবং অর্থনৈতিক চাপের প্রেক্ষাপটে এই আহ্বান অত্যন্ত সময়োপযোগী। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, বিদ্যুৎ আমাদের দৈনন্দিন জীবন, শিল্প উৎপাদন, কৃষি ও বাণিজ্যের জন্য অপরিহার্য হলেও এর অপচয় দেশের জন্য বড় ধরনের আর্থিক ও জ্বালানি সংকট ডেকে আনতে পারে। তাই বিদ্যুৎ ব্যবহারে সচেতনতা ও সাশ্রয়ী মনোভাব গড়ে তোলা জরুরি।
এদিকে বর্তমান বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে পৃথক নির্দেশনা জারি করেছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জ্বালানি সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে আগাম সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ, প্রাকৃতিক গ্যাস সাশ্রয়ের জন্য রান্না ও অন্যান্য কাজে গ্যাস ব্যবহারে সাশ্রয়ী পদ্ধতি অনুসরণ করার কথা বলা হয়েছে। জ্বালানি তেল সাশ্রয়ে ব্যক্তিগত যানবাহনের পরিবর্তে গণপরিবহন ব্যবহারের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ কথা সত্য যে, বাংলাদেশে বিদ্যুতের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। শিল্পায়ন, নগরায়ণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাত্রার কারণে বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি, বিশেষ করেÑ গ্যাস, কয়লা ও তেলের বড় অংশই আমদানি করতে হয়। এতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি হয়। তাই অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ অপচয় কমাতে পারলে দেশের অর্থনীতি যেমন উপকৃত হবে, তেমনি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সহজ হবে।
বিশেষ করেÑ বাসাবাড়ি, অফিস-আদালত, দোকানপাট ও শিল্পকারখানায় বিদ্যুতের অপচয় একটি সাধারণ চিত্র। প্রয়োজন না থাকলেও অনেক সময় বাতি, পাখা কিংবা বৈদ্যুতিক যন্ত্র চালু রাখা হয়। এ ধরনের অভ্যাস পরিবর্তন করা জরুরি। আমরা মনে করি, অপ্রয়োজনীয় আলো ও বৈদ্যুতিক যন্ত্র বন্ধ রাখা, সাশ্রয়ী এলইডি বাতি ব্যবহার, শক্তি সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি ব্যবহার এবং দিনের আলোকে কাজে লাগানোÑ এসব ছোট ছোট উদ্যোগ বড় ধরনের সাশ্রয় আনতে পারে। সরকার ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানিÑ বিশেষ করে, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে শুধু সরকার নয়, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগও প্রয়োজন। প্রতিটি নাগরিক যদি নিজ নিজ জায়গা থেকে সচেতন হয়, তাহলে সামগ্রিকভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহারে উল্লেখযোগ্য সাশ্রয় সম্ভব।
উল্লেখ করা প্রয়োজন, বিগত সময়ে কোনো সরকারই জ্বালানি নিরাপত্তা ও দেশীয় উৎসকে গুরুত্ব দিয়ে একটি জাতীয় ‘জ্বালানি নীতি’ দাঁড় করাতে পারেনি। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরে দায়মুক্তি আইনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে দেশি-বিদেশি গোষ্ঠীর লুণ্ঠনের মৃগয়া ক্ষেত্রে পরিণত করা হয়েছিল। তখন জ্বালানির প্রাথমিক উৎস নিশ্চিত না করেই একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র করা হয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ২৮ হাজার মেগাওয়াট হলেও সর্বোচ্চ চাহিদার ১৬ থেকে ১৭ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করাটাই কার্যত দুরূহ।
আমদানি-নির্ভর ও বিদেশ-নির্ভর জ্বালানি-নীতি যে জ্বালানি নিরাপত্তায় কতটা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, বহু বছর ধরেই তা অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলে আসছেন। ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় দেশে তীব্র জ্বালানির সংকট দেখা দেয়। তখন উচ্চ ব্যয়ে জ্বালানি আনতে গিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে টান পড়ে। ফলে সামষ্টিক অর্থনীতি ও মূল্যস্ফীতির ওপর তার প্রভাব পড়ে। সেই প্রেক্ষাপটে আমাদের প্রত্যাশাÑ নতুন সরকার অবশ্যই সেই সংকট থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশীয় উৎস-নির্ভর এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে প্রাধান্য দেবে।
আমরা মনে করি, প্রধানমন্ত্রীর এই আহ্বান শুধু একটি প্রশাসনিক নির্দেশনা নয়, এটি একটি জাতীয় দায়িত্ববোধ জাগ্রত করার প্রচেষ্টাও। দেশের স্বার্থে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা চিন্তা করে আমাদের সবাইকে বিদ্যুৎ ব্যবহারে আরও সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে হবে। বিদ্যুতের সাশ্রয় মানেই দেশের সম্পদ রক্ষা এবং টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাওয়া। তাই আসুন, অপচয় নয়Ñ সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ ব্যবহারের সংস্কৃতি গড়ে তুলি। আমাদের বিশ্বাস, যার যার অবস্থান থেকে সহযোগিতা করলে এ সংকট থেকে উত্তরণ খুবই সহজ।