জিবলু রহমান
প্রকাশ : ০৭ মার্চ ২০২৬ ১১:৪৯ এএম
৭ মার্চ ঐতিহাসিক ভাষণে সুকৌশলে আলোচনার দরজা খোলা রেখে, স্বাধীনতার জন্য উন্মুখ ছাত্র-জনতার চাপ ও প্রত্যাশার প্রেক্ষিতে একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ উচ্চারণ করলেও বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের সাংবিধানিক আন্দোলনকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনকে আওয়ামী লীগ যেভাবে দেখত এবং যেভাবে দলটি স্বায়ত্তশাসনের দাবি জানিয়ে আসছিল, তা পাকিস্তান রাষ্ট্রের কাঠামোর মধ্যে অর্জন করা আদতে সম্ভব ছিল না। তাই স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে, যেখান থেকে সামনে এগোনোর কোনো সাংবিধানিক পথ ছিল না বা অন্য কথায়, ওই পর্যায়ে আত্মনিয়ন্ত্রণ ও স্বায়ত্তশাসনের জন্য আওয়ামী লীগের সাংবিধানিক পন্থার আন্দোলন ভেঙে পড়ে। কিন্তু সমস্ত বাধাবিপত্তি অগ্রাহ্য করে আন্দোলন এগিয়ে চলে।
১৯৭১ সালের ৩ মার্চ জাতীয় পরিষদের যে অধিবেশন বসার কথা ছিল ১ মার্চ তা মুলতবি করে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার খানের ভাষণ প্রচারিত হওয়ার পর আন্দোলন উত্তাল হয়ে ওঠে। ৭ মার্চের পর পূর্ব পাকিস্তানের পুলিশ ও কারা প্রশাসনসহ প্রাদেশিক প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ কার্যত নিয়ে নেয় আওয়ামী লীগ। আনুষ্ঠানিকভাবে প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশন আহ্বান না করেই তারা এটা করে। এটা করা হয় গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চার নামে, কিন্তু একই সঙ্গে তা করা হচ্ছিল এমন পন্থায়, যেটাকে সাংবিধানিক বলা কঠিন। এভাবে আওয়ামী লীগের সাংবিধানিক আন্দোলন সাংবিধানিকতার সীমা অতিক্রম করে যায়।
একটি সাংবিধানিক রাজনৈতিক দলের জন্য এটা ছিল এক ব্যতিক্রমী অর্জন। আওয়ামী লীগ যদি সাংবিধানিক দল না হতো, এমন একটা দল হতো, যার কর্মসূচি পাকিস্তান রাষ্ট্রকাঠামোর আওতায় স্বায়ত্তশাসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তাহলে দলটি ব্যাপক জনসমর্থন কাজে লাগিয়ে মার্চের ৭ তারিখেই স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে পারত। এটা জানা যে সেই সময় পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের সেনাবাহিনীতে বাঙালিরা ছিল ব্যাপকভাবে সংখ্যাগুরু এবং বাঙালি অফিসার ও সেনারা বঙ্গবন্ধুর ডাকে পাকিস্তান রাষ্ট্র ও পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে আঘাত হানতে আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু আওয়ামী লীগের আন্দোলন সেদিকে অগ্রসর হয়নি কারণ তাদের সেরকম পরিকল্পনা ছিল না। তারা বরং সাংবিধানিক পথে অসহযোগ আন্দোলন শুরু করে; কিন্তু এটা তারা শুরু করে এমন এক পর্যায়ে, যখন সারা দেশ পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে উত্তাল এবং আওয়ামী লীগ স্বাধীনতার ঘোষণা দিলে স্বাধীন বাংলাদেশের সরকারকে রক্ষা করতে জনগণ এক হয়ে দাঁড়িয়ে যেত। কিন্তু বঙ্গবন্ধু সে পর্যায়ে ঝুঁকি নেওয়ার সাহস পাচ্ছিলেন না। তাই বঙ্গবন্ধুর অনেক বাগ্মিতা আর আড়ম্বরপূর্ণ নানা ঘোষণা সত্ত্বেও তারা পুরোপুরি আটকে ছিলেন সাংবিধানিক চিন্তাভাবনার মধ্যে এবং তাদের পক্ষে আর এগোনো সম্ভব হচ্ছিল না।
৭ মার্চ ঐতিহাসিক ভাষণে সুকৌশলে আলোচনার দরজা খোলা রেখে, স্বাধীনতার জন্য উন্মুখ ছাত্র-জনতার চাপ ও প্রত্যাশার প্রেক্ষিতে একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ উচ্চারণ করলেও বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। আসলে পাকিস্তানি রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে শাসনভার সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নিকট হস্তান্তর করার দাবিই ছিল ৭ মার্চের ভাষণের মূলসুর বা মর্মকথা। শুধু তাই নয়, তিনি জয় বাংলার পরে জয় পাকিস্তান বলেছিলেন। জয় পাকিস্তান লাইনটি আমাদের অনেক ইতিহাসবিদ ইচ্ছা করে বাদ দিয়েছেন তাদের লেখনী থেকে, আবার অনেকে সত্য কথাটি তুলে ধরেছেন।
বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ও ব্যবসায়ী শহীদুল্লাহ খান (বাদল) এ সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেনÑ ‘তিনি “জয় বাংলা” “জয় পাকিস্তান” বলে ভাষণ শেষ করেন।’ (সূত্র : স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রস্ততিপর্ব, এলাহী নেওয়াজ খান/মোস্তাক হোসেন/আহমেদ ফারুক রতন, সাপ্তাহিক বিচিত্রা স্বাধীনতা দিবস সংখ্য ১৯৮৮)
৭ মার্চের জনসভায় ভাষণ দেওয়ার পর সন্ধ্যায় আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক শেষে বঙ্গবন্ধু সাংবাদিকদের নিকট প্রদত্ত এক বিশেষ বিবৃতিতেও একই দাবি ও পূর্ব শর্তের পুনরুল্লেখ করেছিলেন। অত্যন্ত মার্জিত ও সংযত ভাষায় রচিত এই বিবৃতিতে স্বাধীনতা শব্দটি অনুপস্থিত ছিল।
৭ মার্চের ভাষণ সম্পর্কে বঙ্গবন্ধুর নিজস্ব মূল্যায়ন পৃথিবী বিখ্যাত সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্টের সাক্ষাৎকারের বিবরণ প্রকাশ করেছেন, যা ভারত সরকার প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ ডকুমেন্টস ভলিউম-২-এর ৬১৪ থেকে ৬২৭ পৃষ্ঠা পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে। ৭ মার্চের ভাষণ সম্পর্কে তাদের মধ্যকার আলাপচারিতা তুলে ধরা হচ্ছে:
ফ্রস্ট: আপনার কি ইচ্ছা ছিল যে, ৭ মার্চ রেসকোর্সে আপনি স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ঘোষণা দেবেন?
মুজিব: আমি জানতাম এর পরিণতি কী হবে এবং সভায় আমি ঘোষণা করি যে, এবারের সংগ্রাম মুক্তির এবং স্বাধীনতার সংগ্রাম।
ফ্রস্ট: আপনি যদি বলতেন আজ আমি স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ঘোষণা দিচ্ছি, তো কী ঘটত?
মুজিব: বিশেষ করে ওই দিনটিতে আমি এটা করতে চাইনি। কেননা, বিশ্বকে আমি এ বলার সুযোগ দিতে চাইনি যে, তারা বলুক মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন এবং আঘাত হানা ছাড়া আমাদের আর কোনো বিকল্প নেই। আমি চাইছিলাম তারাই আঘাতটা হানুক এবং আমরা জনগণ তা প্রতিরোধের জন্য প্রস্তুত রয়েছি।
বঙ্গবন্ধু যদি সত্যিকার অর্থে ৭ মার্চের আগেই স্বাধীনতা ঘোষণার কথা চিন্তা করতেন তবে তিনি পাকিস্তানের অখণ্ডতাকে বিশ্বাস করে ‘জয় পাকিস্তান’ বলতেন না। এই শব্দ দুটি বলার মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন পাকিস্তান বিভক্ত হোক বা দেশের মানুষ স্বাধীনতা পাক তা তিনি কোনো সময়ই মন থেকে চাননি, তিনি চেয়েছেন ক্ষমতার ভাগাভাগি।
ইতিহাসের সত্য বিষয়কগুলো তুলে ধরলে এবং অখণ্ডিত আকারে সুরক্ষিত করলে নতুন প্রজন্মের জন্য চর্চাটা সহজ হবে। তোষামোদির কাহিনী আমাদের দেশে অনেক হয়েছে। এখন বাস্তবতা নতুন প্রজন্মের সামনে আনতে হবে। তাদের সত্য ইতিহাস জানতে ও শিখতে দিতে হবে।
জিবলু রহমান
কলাম লেখক