মো. আরাফাত হোসেন
প্রকাশ : ০৭ মার্চ ২০২৬ ১১:২৬ এএম
আপডেট : ০৭ মার্চ ২০২৬ ১১:২৭ এএম
ইরানের অনেক স্থাপনা ধ্বংস হয়ে গেছে। তারপরও ইরান আমেরিকার আধিপত্যবাদের ভয়াল থাবা থেকে বাঁচতে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল কর্তৃক ইরানে হামলা চালানোর মাধ্যমে ইরানের সঙ্গে ইস্রো-মার্কিন যুদ্ধ শুরু হয়। ইসরায়েল ইরানের আকাশসীমা অমান্য করে ইরানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনায় হামলা চালায়। এই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি মৃত্যুবরণ করেন। সেই সঙ্গে খামেনির স্ত্রী, নাতনি পর্যন্তও মারা গেছেন বলে জানা যায়। ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী, বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর অনেক জেনারেলও মারা গেছেন।
ইরানের পাল্টা হামলাতে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে হতাহতের খবর পাওয়া গেছে। এই সংঘাতে আরব আমিরাতে একজন বাংলাদেশি প্রবাসী নিহতের খবর পাওয়া গেছে। এ ছাড়াও ইস্রো-মার্কিন হামলার প্রতিবাদে পাকিস্তানে মার্কিন দূতাবাসে পাকিস্তানের সাধারণ জনগণ হামলা চালায়। এতে পুলিশের সঙ্গে সংঘাতে ২৩ জন পাকিস্তানি নাগরিক নিহত হয়েছে। ইরানের অনেক স্থাপনা ধ্বংস হয়ে গেছে। তারপরও ইরান যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে। এত এত প্রাণহানি তারপরও ইরান কেন যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে? আর আমেরিকা-ইসরায়েল কেন এমন সময় মরিয়া হয়ে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়াল? এর পেছনে আছে গুরুত্বপূর্ণ কারণ, আমেরিকার আধিপত্যবাদের ভয়াল থাবা।
ইরানের সঙ্গে ইস্রো-মার্কিন যুদ্ধ বাধার কারণ জানতে হলে আমাদের একটু পেছনে যেতে হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান-জার্মানির পরাজয় হলে আমেরিকা হয়ে ওঠে সমগ্র বিশ্বের একচ্ছত্র অধিপতি। এর আগে সমগ্র বিশ্বের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু ব্রিটেনের কাছে থাকলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে সেই ক্ষমতা চলে যায় আমেরিকার হাতে। এর প্রধান করাণটি অর্থনৈতিক। ১৯৪৪ সালে আমেরিকান কারেন্সি মার্কিন ডলারকে ‘ব্রেটন উডস’ চুক্তির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রধান মাধ্যম করে তোলা হয়। এর ফলে সমগ্র বিশ্বের ওপর আমেরিকার একটা প্রভাব প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পড়ে। আর আমেরিকাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। আমেরিকার আধিপত্য এর পরে চরমভাবে বাড়তে থাকে।
১৯৭৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মাঝে একটি চুক্তি হয়। এর মূল বিষয় ছিল খনিজ তেল মার্কিন ডলারে ছাড়া কেনাবেচা করা যাবে না। ৫০ বছর মেয়াদের এই চুক্তির কারণে তেলের বাজারে ডলারের প্রতিষ্ঠিত হয় একচ্ছত্র আধিপত্য। এর পর থেকে এখনও পর্যন্ত সারাবিশ্বে তেল বাণিজ্য চলে মার্কিন ডলার কেন্দ্রিক। যা যুক্তরাষ্ট্রের ভিত্তিকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
গত মাসে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে রাতের আঁধারে একটি সামরিক মিশনের মাধ্যমে তুলে নিয়ে আসে আমেরিকান সেনাবাহিনী। অভিযোগ হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্প দেখান, ভেনিজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাচার করছে। কিন্তু এটি একটা অজুহাত মাত্র। আসল কারণ হচ্ছে, আমেরিকার আধিপত্যবাদে আঘাত।
পেট্রো-ডলার নীতির বাইরে গিয়ে কাউকে তেল আমদানি-রপ্তানি করতে দিবে না আমেরিকা। আর বিশ্বের তেল মজুদের ১৭% আছে ভেনিজুয়েলাতে, যার পরিমাণ ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল। নিকোলা মাদুরোর সরকার আমেরিকাকে উপেক্ষা করে রাশিয়ার সঙ্গে তেল বাণিজ্য করার একটা পরিকল্পনা হাতে নেয়। যেটা আমেরিকার অস্তিত্বের জন্য বড় ধরনের হুমকি। এজন্য সকল প্রকার মানবাধিকার ও সার্বভৌমত্বের বেড়াজাল উপেক্ষা করে সামরিক মিশন পরিচালনা করে নিকোলা মাদুরোকে রাতের আঁধারে গ্রেপ্তার করে নিয়ে আসে যুক্তরাষ্ট্র।
ইরান মধ্যপ্রাচ্যের একটি শক্তিশালী মুসলিম দেশ। মধ্যপ্রাচের সকল দেশ যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের কথামতো চলে, সেখানে একমাত্র গলার কাঁটা হয়ে উঠেছে ইরান। তাইতো সকল প্রকার স্যাংশন দিয়ে ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়ার চেষ্টায় আছে যুক্তরাষ্ট্র। বর্তমানে ইরানের কারেন্সি দেখলেই বোঝা যায় স্যাংশনের প্রভাব কেমন পড়েছে ইরানের অর্থনীতিতে। ১ মার্কিন ডলারের পরিবর্তে ১৩১৪৫৪৫ ইরানি রিয়াল খরচ করতে হবে। এই মুদ্রাস্ফীতি রক্ষার জন্য ইরান বিকল্প পথে হাঁটার চিন্তা করে।
বিশ্বের আরেকটি অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ হচ্ছে চীন। পরাশক্তির দৌড়ে চীন অনেকটাই এগিয়ে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে চীনের আধিপত্য যুক্তরাষ্ট্রের গাত্রদাহের অন্যতম কারণ। সেজন্য চীনের প্রতিও বিভিন্ন সময় যুক্তরাষ্ট্রের স্যাংশনের খবর পাওয়া যায়। সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের সঙ্গে ইস্রো-মার্কিন যুদ্ধের মূল কারণ হচ্ছে ‘তেল বাণিজ্য’।
যুক্তরাষ্ট্রের কথা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ব্যতীত অন্য দেশে ইরান তেল বিক্রি করতে পারবে না। কিন্তু ইরান সাম্প্রতিক সময়ে চীনের সঙ্গে তেল চুক্তিতে যাওয়ার একটি পরিকল্পনা করে। যেখানে মার্কিন ডলারকে বাদ রেখে তেল কেনাবেচা করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে চীনের আধিপত্য যেমন বাড়বে, সঙ্গে ইরানও লাভবান হবে। কিন্তু সব থেকে বড় ক্ষতি হবে যুক্তরাষ্ট্রের। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের তেলের আধিপত্য ধ্বংস হওয়ার একটি প্রবণতাও সৃষ্টি হতে পারে। ইরান যদি চীনের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কে আগাতে পারে তাহলে সে আরও বেশি শক্তিশালী হবে, যা আমেরিকার মধ্যপ্রাচ্যে রাজত্ব করার স্বপ্ন বিলীন করে দিতে পারে। এই দুশ্চিন্তার জায়গা থেকেই মূলত যুক্তরাষ্ট্র তড়িঘড়ি করে ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের চেষ্টা করে। সেটা সম্ভব না হওয়ায় ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়ে।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের রাজা বলা যায় ইসরায়েলকে। আমেরিকার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যে তাদের শক্তিশালী ভিত্তি স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে। ইসরায়েল চায় না মধ্যপ্রাচ্যে অন্য কোনো দেশ মাথাচাড়া দিয়ে উঠুক, যা তার গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়াবে। সম্প্রতি ইরানের মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার প্রবণতায় ইসরায়েল শঙ্কিত। এজন্য আমেরিকার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলই ইরানে বিমান হামলা চালায়। বলতে গেলে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের একমাত্র শত্রু ইরান। তাই শত্রুকে প্রতিহত করা তার অন্যতম লক্ষ্য। আর আমেরিকা ইসরায়েলের বরাতে মধ্যপ্রাচ্যে তার ক্ষমতা টিকিয়ে রেখেছে। এককথায়, মধ্যপ্রাচ্যের আমেরিকা হচ্ছে ইসরায়েল। তাইতো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একসঙ্গে ইরানের বিপক্ষে যুদ্ধে নেমেছে।
ইস্রো-মার্কিন হামলার মূল কারণটা অর্থনৈতিক হলেও এর সঙ্গে রাজনৈতিক বিষয়ও জড়িত। কোনো দেশ অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হলে সে দেশ সামরিক ক্ষেত্রেও শক্তিশালী হবে। এই চিন্তা থেকেই ইরানের শক্তি কমাতে, অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্র কেন্দ্রিক করতে এবং তেল বাণিজ্যের একচেটিয়া বাজার ধরে রাখার জন্য আমেরিকার সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে। আর ইরান তাদের অর্থনীতি ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার দৌড়ে বাধ্য হয়ে এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। আর বলতে গেলে এবার ইতিহাসের সব থেকে বড় ও ধ্বংসাত্মক হামলা করেছে ইরান। এই যুদ্ধ দীর্ঘসময় ধরে অব্যাহত থাকবে বলে মনে হচ্ছে। আমেরিকা তার আধিপত্য বিস্তারের দৌড়ে একচুলও ছাড় দিতে রাজি না। অন্যদিকে ইরানও তার সর্বশক্তি দিয়ে সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও স্বকীয়তা বজায় রাখার চেষ্টা করবে।
মো. আরাফাত হোসেন
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়