× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

মধ্যপ্রাচ্য

জীবিত খামেনির চেয়েও শক্তিশালী মৃত খামেনি

আহসান হাবিব বরুন

প্রকাশ : ০৬ মার্চ ২০২৬ ১০:১০ এএম

আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। ছবি: বিবিসি

আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। ছবি: বিবিসি

ভোরের আলো ফোটার আগেই যেন সূর্য থমকে দাঁড়িয়েছিল। মিনারের ধ্বনিতে কুরআনের তিলাওয়াত, আর তার ভেতরে জড়ানো অশ্রুর কম্পন। রাজধানী তেহরানের রাস্তায় মানুষের ঢাল নীরব কিন্তু অগ্নিমুখর। সংবাদটি ছড়িয়ে পড়তেই বজ্রপাতের মতো কেঁপে ওঠে জনপদ : আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি আর নেই।

কিন্তু সত্যিই কি তিনি নেই?

একজন মানুষের মৃত্যু হতে পারে, কিন্তু একটি বিপ্লবের প্রহরী কি কখনও নিঃশেষ হয়? খামেনির প্রস্থান কেবল একজন রাষ্ট্রনেতার বিদায় নয় বরং এটি একটি যুগের সমাপ্তি এবং আরেকটি যুগের সূচনা। তিনি ছিলেন বিশ্বাসের মিনার, প্রতিরোধের ভাষা, আত্মমর্যাদার প্রতীক। তাই তার মৃত্যুসংবাদ নিছক শোকবার্তা ছিল না এটি ছিল ইতিহাসের নতুন আহ্বান। ইসফাহান-এর নকশে জাহান চত্বর জনসমুদ্রে রূপ নেয়। মাশহাদ-এর ইমাম রেজা দরগাহ শোকে ভারী হয়ে ওঠে। কিন্তু সেই শোক পরাজয়ের নয়, প্রতিজ্ঞার। মানুষের কণ্ঠে উচ্চারিত হয় : নেতা শহীদ, আদর্শ অমর।

আর ঠিক সেখানেই দৃশ্যপট বদলে যায়।

অর্ধঘণ্টা মাত্র অর্ধঘণ্টা। শোকের অশ্রু শুকাতে না শুকাতেই প্রতিরোধের বজ্রধ্বনি আকাশ বিদীর্ণ করে। ইরান দেখিয়ে দেয়, তারা কাঁদতে জানে, কিন্তু মাথা নত করতে জানে না। দ্রুত ও সমন্বিত সামরিক জবাব প্রমাণ করে বিপ্লবী রাষ্ট্র কখনও অপ্রস্তুত থাকে না।

এটি ইরানি জাতির প্রতিশোধের অন্ধ উন্মাদনা নয় বরং এটি ছিল হিসেবি শক্তির ঘোষণা। বহুদিন ধরে বলা হচ্ছিল ইরানের প্রতিরক্ষা কৌশল ছড়ানো, বহুস্তরীয়, শিকড়গাঁথা। আজ তা কেবল তত্ত্ব নয়, বাস্তবতার দৃশ্যমান রূপ। এই পাল্টা আঘাত একটি স্পষ্টবার্তা : মরুভূমির বুকে দাঁড়ানো ঘাঁটি, সমুদ্রের বুকে ভাসমান বহর কিংবা আকাশের অদৃশ্য ঢাল কোনোটিই অজেয় নয়। যে জাতি চার দশকের অবরোধ, নিষেধাজ্ঞা ও ষড়যন্ত্র সহ্য করে টিকে আছে, তাকে ভয় দেখিয়ে দমানো যায় না।

এই সংকটের মুহূর্তে সামনে আসেন আলি লারিজানি। দীর্ঘদিনের সংযত কণ্ঠ আজ দৃঢ় উচ্চারণে বলে ওঠে ইরানকে দুর্বল ভাবার ভুল আর চলবে না। তার বক্তব্যে যুক্তির শান, কিন্তু সুরে আগুন।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার বিশ্লেষণে প্রতিফলিত হয় সেই কঠোরতা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্দেশে অভিযোগ ছুড়ে দেওয়া হয় অন্যের ফাঁদে পা দিয়ে আগুন জ্বালানো হয়েছে। কিন্তু সেই আগুনে যে জাতি পুড়ে ভস্ম হবে না, বরং ইস্পাতে রূপ নেবে তা আজ স্পষ্ট। ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী খামেনিকে শহীদ ঘোষণা করে জাতীয় ঐক্যের ডাক দেয়। আঞ্চলিক শক্তিগুলো হিজবুল্লাহ, হামাস এবং হুতি এই ঘটনাকে বৃহত্তর সংগ্রামের অধ্যায় হিসেবে দেখছে। ফলে মানচিত্রে আঁকা সীমারেখা যেন নতুন করে কাঁপছে।

কিন্তু বিপ্লব কেবল সীমান্তে ঘটে না; ঘটে মানুষের অন্তরে। ইরানের ভেতরেও মতভেদ আছে, বিতর্ক আছে, প্রশ্ন আছে। জীবিত খামেনি ছিলেন সমালোচনার কেন্দ্রে। কারণ সেখানেও পশ্চিমা রাজাকারের সংখ্যা মোটেও কম নয়। কিন্তু মৃত্যুর পর তিনি বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে প্রতীকে পরিণত হয়েছেন।

‘জীবিত খামেনির চেয়েও শক্তিশালী মৃত খামেনি’ এটি আর স্লোগান নয়, এটি রাজনৈতিক বাস্তবতা। জীবিত অবস্থায় তিনি ছিলেন একজন নেতা; মৃত্যুর পর তিনি হয়ে উঠেছেন এক অমোচনীয় চেতনা।

শহীদের রক্ত ইতিহাসে কখনও নিষ্ফল যায় না এই বিশ্বাসই বিপ্লবের প্রাণ। তার অনুপস্থিতি যেন উপস্থিতির চেয়েও গভীর। কারণ এখন তিনি ব্যক্তি নন, তিনি অবিনাশী চেতনা। তিনি মসজিদের মিনারে, তিনি মিছিলের কণ্ঠে, তিনি তরুণের দীপ্ত শপথে চিরঞ্জীব প্রেরণা।

ইরানের শক্তি কেবল তার অস্ত্রে নয়; তার আত্মায়। নিষেধাজ্ঞা, বিচ্ছিন্নতা, যুদ্ধ সবকিছুর মাঝেও তারা রাষ্ট্র কাঠামো অটুট রেখেছে। এই শোক সেই ঐতিহ্যেরই নতুন পরীক্ষা।

শোক ও শক্তির এই সমীকরণ কি নতুন স্থিতিশীলতা আনবে, নাকি দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার দিকে ঠেলে দেবে গোটা অঞ্চলকে? এই প্রশ্নের উত্তর এখনও অনিশ্চিত। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত যে, মৃত খামেনি এখন ইরানের রাজনৈতিক চেতনায় এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত, যা জীবিত অবস্থার প্রভাবকেও অতিক্রম করতে পারে।

শোকের এই দীর্ঘ ছায়ায় দাঁড়িয়ে ইরান এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করছে যেখানে কান্না আছে, ক্রোধ আছে, কিন্তু তার চেয়েও বড় হচ্ছে তাদের বিশ্বাস। আর সেই বিশ্বাসই হয়তো তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।


আহসান হাবিব বরুন
সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা