বিশ্লেষণ
সাদেকুর রহমান
প্রকাশ : ০৬ মার্চ ২০২৬ ১০:০৫ এএম
প্রতীকী ছবি
‘শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড’ এটি বহুল প্রচলিত একটি উক্তি। এই উক্তির মাধ্যমে একটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। আমরা জানি, শিক্ষা হলো নাগরিকদের মৌলিক অধিকার। কিন্তু এখন শিক্ষা শুধু মৌলিক অধিকার বলেই বিবেচনা করা হয় না। শিক্ষা মানুষের চিন্তাধারার পরিবর্তন করে। আর আধুনিক বিশ্বে শিক্ষাকে একটি বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হয়। এটিকে মনে করা হয়, সবচেয়ে কার্যকর ও টেকসই বিনিয়োগ। শিক্ষাতে বিনিয়োগের সুফল সবাই পেয়ে থাকে। শিক্ষার প্রভাবে একটি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র পরিবর্তন হয়ে থাকে।
শিক্ষাকে বিনিয়োগ হিসেবে দেখার প্রচলন খুব বেশি দিন ধরে হয়নি। বিভিন্ন তত্ত্বের মাধ্যমে এটি শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে প্রথম কথা শুরু হয় ১৯৬০-এর দশকে। থিওডোর শুল্টজ ও গ্যারি বেকার প্রথম মানব পুঁজি তত্ত্ব প্রস্তাব করেন। এই তত্ত্বে বলা হয়েছে যে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য কিংবা প্রশিক্ষণে ব্যয় করা অর্থ বিনিয়োগ। শিক্ষা ব্যক্তির জ্ঞান, দক্ষতা ও সামর্থ্য বৃদ্ধি করে। এর ফলে মানুষের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায়। ফলে, মানুষের আয় বৃদ্ধি পাওয়ার সুযোগ থাকে। এটি ব্যক্তির ক্ষেত্রেই নয় জাতীয় আয় বাড়াতেও সাহায্য করে।
এম. স্পেন্স সিগন্যালিং তত্ত্ব প্রস্তাব করেন। এই তত্ত্ব অনুসারে, শিক্ষাগত যোগ্যতা একজন মানুষের ভিতরের প্রতিভাকে ফুটিয়ে তোলে। কোনো প্রতিষ্ঠান কাউকে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে আচার-আচরণকে গুরুত্ব দেয়। শিক্ষাতে বিনিয়োগের ফলাফল বহুমাত্রিক। এটির সামাজিক, অর্থনৈতিক প্রভাব রয়েছে। অর্থনৈতিক দিক দিয়ে বিবেচনা করলে শিক্ষা বেকারত্ব হ্রাস, জিডিপি বাড়াতে সাহায্য করে। সমাজের ওপর প্রভাব খেয়াল করলে দেখা যায় যে, শিশুমৃত্যুহার হ্রাস, মাতৃস্বাস্থ্য উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়নে অবদান রাখে। শুধু তাই নয়, সমাজে অস্থিরতা হ্রাস, অপরাধ হ্রাসের ক্ষেত্রেও শিক্ষা ভূমিকা রাখে। শিক্ষা শুধু ব্যক্তিগত জীবনেই গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে না, জাতীয় জীবনেও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। শিক্ষার মাধ্যমে একটি শিক্ষিত জাতি তৈরি হয়। তখন জাতিটির উদ্ভাবনা শক্তি বাড়ে। এটি দেশের দারিদ্র্য হ্রাস করতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষার ওপর বিনিয়োগের ফলে দেশের আয় ১০% বৃদ্ধি পেতে পারে। OECD প্রতিবেদন অনুসারে, শিক্ষার মান ১% বাড়লে, তা দীর্ঘমেয়াদে মাথাপিছু জিডিপি ৬% পর্যন্ত বাড়াতে পারে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় শিক্ষা খাতে কম খরচ করে। বিশ্বের অন্যান্য দেশ মোট জিডিপির ৪.৪% ব্যয় করে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৩ অনুসারে বাংলাদেশ ব্যয় করে মাত্র মোট জিডিপির ১.৮%। বিশ্বের দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়নের দেশগুলোর মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, ফিনল্যান্ড অন্যতম। তাদের এই উন্নয়নের পিছনে মূল চালিকাশক্তি শিক্ষা ও গবেষণাতে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ। তারা প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত গুণগত মান নিশ্চিত করেছে। শিক্ষার সঙ্গে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের সম্পর্ক তৈরি করতে পেরেছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে, পরিবারগুলোর গড় মাসিক ব্যয়ের মাত্র ৩.৩% শিক্ষা খাতে ব্যয় করে। কিন্তু বিনোদনে ব্যয় করে ৪.৫%। এই তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মানুষের কাছে শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যায়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের বিভিন্ন শিক্ষা খাতে সহায়তা প্রদান করতে আগ্রহী। WB, ADB, JICA, USAID, UNICEF, UNESCO প্রভৃতি সংস্থা বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা খাতে সাহায্য করে চলেছে। বিশেষ করে, মেয়েদের শিক্ষা প্রকল্পে সহায়তা প্রদান করার মাত্রা বেশি। একটি শিক্ষিত ও দক্ষ শ্রমশক্তি মোট উপাদান উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করে। এর ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি বাড়ে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাক শিল্পের ভূমিকা অনেক। এই শিল্প গড়ে ওঠার পেছনে সাক্ষরতা ও প্রাথমিক দক্ষতা সম্পন্ন নারী শ্রমিকদের ভূমিকা অপরিসীম।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৪ অনুসারে, মোট শ্রমশক্তি ৭.৩৫ কোটি। এই বিশাল যুবশক্তিকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা দরকার। বাংলাদেশ ২০৩৩ সাল পর্যন্ত এই অবস্থায় থাকবে। এই সময়ে শ্রমশক্তিতে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বেশি। শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও স্বাস্থ্য বিনিয়োগের মাধ্যমে এই জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল ও দক্ষ করে তোলা যাবে। এর ফলে দেশের অর্থনীতি ভালো সুবিধা পেতে পারে। বর্তমান যুগে আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্সের প্রভাব বেশি। এ প্রতিযোগিতায় গুরুত্বপূর্ণ হলো বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল, গণিত শিক্ষা, গবেষণা ও উন্নয়নে ব্যাপক বিনিয়োগ করা। আমাদের দেশে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে শিল্প খাতের সংযোগ দুর্বল। এর ফলে উদ্ভাবন ও প্রায়োগিক জ্ঞান সৃষ্টিতে বাধাপ্রাপ্ত হয়। শিক্ষিত ও দক্ষ কর্মী বিদেশে পাঠানো গেলে রেমিট্যান্সের পরিমাণ ও মান দুটিই বাড়ে। বাংলাদেশ বছরে প্রচুর রেমিট্যান্স আয় করে। ভাষা দক্ষতা ও কারিগরি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মীরা মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শ্রমবাজারে অধিক বেতন ও ভালো পদে কাজের সুযোগ পান।
বাংলাদেশে গুণগত শিক্ষার সংকট রয়েছে। আমাদের দেশে মুখস্থবিদ্যার সংস্কৃতি বিদ্যমান। সকল কিছুই পরীক্ষা কেন্দ্রিক। এর ফলে চিন্তা, বিশ্লেষণ ও উদ্ভাবনী দক্ষতার অভাব দেখা যায়। শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়ন দরকার। এজন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। আমাদের দেশে শিক্ষকতা পেশাকে অনেক সময় সামাজিকভাবে মূল্যায়ন করা হয় না। এর ফলে এই পেশায় থাকা পেশাজীবীদের পেশাগত উন্নয়ন করার ইচ্ছা থাকে না। ভাষাগত দক্ষতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রায়ই প্রতিবেদন হতে দেখা যায় যে , শিক্ষার্থীরা ইংরেজি পড়তে পারে না। এর অন্যতম কারণ হলো ভাষাগত দক্ষতার অভাব।
বাংলাদেশ বর্তমানে পপুলেশন ডিভিডেন্টে আছে। কিন্তু আমাদের দেশে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসার কম। এর বিশাল পরিমাণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ করে গড়ে তোলার জন্য কারিগরি শিক্ষা ভালো কাজ করবে। এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা হলো কারিগরিতে ৩০% ছাত্র ভর্তি করানো। শহরে ও গ্রামে অবস্থিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে মানের ব্যাপক পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। এটি যত কমিয়ে নিয়ে আসা যাবে তত দেশের জন্য ভালো হবে। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার মান বিশ্বের সঙ্গে তুলনায় পিছিয়ে আছে। শুধু তাই নয়, গবেষণার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশে পিছিয়ে আছে।
শিক্ষা খাতে বাজেটের পরিমাণ বাড়াতে হবে। ধীরে ধীরে এটি মোট জিডিপির ৬%-এ নিয়ে যেতে হবে। প্রচলিত শিক্ষাক্রমকে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিবর্তন করতে হবে। বর্তমানে জীবনমুখী দক্ষতার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে। এ খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়াতে হবে। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণের ব্যবস্থা করতে হবে। নারী ও সুবিধাবঞ্চিত গোষ্ঠীকে কারিগরি শিক্ষায় আকৃষ্ট করতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইন্টারনেট ও ডিজিটাল যন্ত্রপাতির ব্যবস্থা করতে হবে। এর সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া দিকটিও বিবেচনায় নিতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থাপনা তথ্য ব্যবস্থা (EMIS) উন্নত করে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিশ্চিত করা দরকার।
শিক্ষা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়। এটির জন্য বেসরকারি খাত, বুদ্ধিজীবী মহল, মিডিয়া এবং অভিভাবকদের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে শিক্ষার দাবিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারে রাখতে হবে।
শিক্ষা কোনো বিলাসিতা বা ভোগ্যপণ্য নয়। এটি বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। গুণগত শিক্ষায় বিনিয়োগ সরাসরি দারিদ্র্যবিমোচন, নারীর ক্ষমতায়ন, স্বাস্থ্য উন্নয়ন এবং একটি উদ্ভাবনী অর্থনীতি গঠনে সহায়ক। এটিই হবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সবচেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত ও ফলপ্রসূ বিনিয়োগ। কারণ, একটি দেশের প্রকৃত সম্পদ তার মাটিতে নয়, মাথায় থাকে আর সেই মাথাগুলোর বিকাশের একমাত্র পথ হলো প্রকৃত শিক্ষা।
সাদেকুর রহমান
গবেষণা কর্মকর্তা, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড