মধ্যপ্রাচ্য সংকট
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০৫ মার্চ ২০২৬ ১২:৫২ পিএম
সম্ভাব্য জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় এখনই দূরদর্শী পদক্ষেপ প্রয়োজন। বিশেষ করে, জ্বালানির উৎসগুলোর বহুমুখীকরণ জরুরি। কেবল মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভর না করে বিকল্প বাজার ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি বাড়াতে হবে। ছবি: রয়টার্স
মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বিরাজ করছে। ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডোর হরমুজ প্রণালী, পাশাপাশি ড্রোন হামলা চলছে সৌদি আরব ও কাতারের জ্বালানি স্থাপনায়; এই পরিস্থিতি জ্বালানি সংকটকে ঘনীভূত করেছে। ফলে বাংলাদেশের আমদানি-নির্ভর জ্বালানি খাতেও নতুন করে সংকট প্রকটতর হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। এমনিতেই মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলটি বিশ্ব তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রধান কেন্দ্র হওয়ায় সেখানে সামান্য উত্তেজনাও আন্তর্জাতিক বাজারে বড় প্রভাব ফেলে। বলা প্রয়োজন, আমাদের দেশে দিনে গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। দৈনিক গ্যাস সরবরাহের এক-তৃতীয়াংশ আসে আমদানি করা এলএনজি থেকে। এর বড় অংশই আসে কাতার ও ওমান থেকে হরমুজ প্রণালী হয়ে। সরবরাহ ব্যাহত হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন হ্রাস, লোডশেডিং বৃদ্ধি এবং আবাসিক লাইনে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এই বাস্তবতায় আমদানি-নির্ভর দেশ হিসেবে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বড় ধরনের সংকট ধেয়ে আসার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় অংশ নির্ভর করে আমদানিকৃত জ্বালানি ডিজেল, ফার্নেস অয়েল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ওপর। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে তেল সরবরাহ ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে যায়। ইতোমধ্যে বিশ্ববাজারে অস্থিরতার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। ডলার সংকট, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের চাপ এবং আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বাড়ছে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যবৃদ্ধি হিসেবে প্রতিফলিত হয়।
৩ মার্চ প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘মধ্যপ্রাচ্য সংকট
অনিশ্চয়তা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ধেয়ে আসছে বড় সংকট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এই আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে। প্রতিবেদন বলছে, ইতোমধ্যে ইরানের হামলার মুখে কাতারের পক্ষ থেকে এলএনজি উৎপাদন স্থগিত করা হয়েছে। ফলে বৈশ্বিক এলএনজি বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে চলেছে বাংলাদেশসহ এশিয়ার দেশগুলোতে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পট মার্কেট থেকে জরুরিভিত্তিতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির নির্দেশ দিয়েছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই যুদ্ধের ফলে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বড় ধরনের দেনাসমেত দায়িত্ব নেওয়া বর্তমান সরকারের জ্বালানিঝুঁকি আরও বাড়ল। কারণ এদেশের জ্বালানি ব্যবস্থা মূলত আমদানি-নির্ভর হওয়ার কারণে এর ফলে এখানে তীব্র গ্যাস সংকট, বিদ্যুৎ বিপর্যয় এবং এলপিজির অস্বাভাবিক দর বাড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে ব্যারেল প্রতি দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও প্রভাব পড়তে পারে এবং লোডশেডিংয়ের আশঙ্কাও আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
উল্লেখ করা প্রয়োজন, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালী। এই প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও গ্যাস পরিবাহিত হয়। সেখানে সামান্য সামরিক উত্তেজনাও সরবরাহ-ব্যবস্থাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে। যদি সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয় বা সরবরাহ ব্যাহত হয়, তাহলে বাংলাদেশকে বাড়তি দামে জ্বালানি কিনতে হবে। এতে ভর্তুকির বোঝা বাড়বে, বিদ্যুৎ খাতে লোকসান বৃদ্ধি পাবে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতির চাপ তীব্র হবে।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ খাতে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ালেও জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারেনি। গ্যাসের ঘাটতি, কয়লা আমদানির বিলম্ব এবং এলএনজি কার্গো বাতিলের ঘটনা অতীতে দেখা গেছে। এই পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। শিল্প খাত, বিশেষ করে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্প, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। বিদ্যুৎ সংকট দেখা দিলে উৎপাদন ব্যাহত হবে, রপ্তানি কমবে এবং কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সম্ভাব্য এই সংকট মোকাবিলায় এখনই দূরদর্শী পদক্ষেপ প্রয়োজন। বিশেষ করে, জ্বালানির উৎসগুলোর বহুমুখীকরণ জরুরি। কেবল মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভর না করে বিকল্প বাজার ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি বাড়াতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত বাড়ানো প্রয়োজন। সৌর ও বায়ুশক্তির প্রকল্পগুলোকে বাস্তবায়নের গতি বাড়াতে হবে। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে জোর দিতে হবে, যাতে আমদানি-নির্ভরতা কমে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় সুশাসন, অপচয় রোধ এবং দক্ষতা বৃদ্ধিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিতরণ ব্যবস্থার ক্ষতি কমানো, বিল আদায়ে স্বচ্ছতা আনা এবং ভর্তুকি কাঠামো পুনর্বিন্যাস করা এই মুহূর্তে অত্যন্ত জরুরি। আমরা মনে করি, সংকটের সময়ে কেবল দাম বাড়ানো কোনো টেকসই সমাধান নয়; বরং কাঠামোগত সংস্কারই দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা দিতে পারে।
মানতে হবে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত হয়তো বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে নেই, কিন্তু তার প্রভাব মোকাবিলার প্রস্তুতি নেওয়া সম্পূর্ণই আমাদের দায়িত্ব। বৈশ্বিক অস্থিরতার এই সময়ে জ্বালানি নিরাপত্তাকে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করে সমন্বিত কৌশল গ্রহণ না করলে সামনে আরও বড় সংকটের মুখোমুখি হতে হবে। এখনই সময় সতর্ক হওয়ার, পরিকল্পিত হওয়ার এবং আত্মনির্ভর জ্বালানি ভবিষ্যৎ গড়ার।