ইলেকট্রিক বাস
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০৪ মার্চ ২০২৬ ১১:০৯ এএম
পরিবেশবান্ধব ইলেক্ট্রিক বাস একদিকে যেমন কার্বন নিঃসরণ কমাবে, অন্যদিকে নারীদের জন্য নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক ও নির্ভরযোগ্য যাতায়াত নিশ্চিত করবে।
রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় দ্রুত দৃশ্যমান ও বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে ১৮০ দিনের একটি বিশেষ অগ্রাধিকার কর্মসূচি হাতে নিয়েছে সরকার। এ কর্মসূচির আওতায় ঢাকায় পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক বাস এবং নারীদের জন্য নিরাপদ বিশেষায়িত বাস সার্ভিস চালু করা হবে। জানা গেছে, প্রাথমিক পর্যায়ে মহিলাদের জন্য নিরাপদ ও আবেদনমুখী গণপরিবহন চালু করা হবে, যা নারীরা নিজেই চালাবেন। ২ মার্চ সোমবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক শেষে এ তথ্য জানিয়েছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ শামসুল হক। এ কথা সত্য যে, রাজধানীতে জনগণের জন্য জনবান্ধব একটি পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি অনেক দিনের। অতীতের সরকারগুলো বিষয়টিতে সেভাবে গুরুত্ব দেয়নি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘসময় লন্ডনে ছিলেন। তিনি সেখানকার গণপরিবহন ব্যবস্থা খুব কাছ থেকে দেখেছেন। তাই এবার জনপ্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটবে বলে আশা করা যায়।
মানতেই হবে, রাজধানী ঢাকা আজ ভয়াবহ যানজট, বায়ুদূষণ ও অনিরাপদ গণপরিবহনের ত্রিমুখী সংকটে জর্জরিত। প্রতিদিন কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা জরুরি কাজে বের হওয়া নারীদের জন্য এই নগরী যেন এক অনিশ্চয়তার পথযাত্রা। তাই বাসে হয়রানি, অতিরিক্ত ভিড়, অনিরাপদ দাঁড়িয়ে যাত্রাÑ সব মিলিয়ে নারীদের স্বাভাবিক চলাচল এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে, রাজধানীর পূর্বাঞ্চলের বাসাবো, গোড়ান, মাদারটেক ও পুরান ঢাকায় বিপুল জনগোষ্ঠী বসবাস করলেও তারা অনেক ক্ষেত্রে বাসসেবাও পান না। মেট্রোরেল সাধারণত প্রধান সড়ক বরাবর নির্মিত হওয়ায় এসব ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এর আওতা সীমিত থাকে। তাই মেট্রোরেলের পাশাপাশি বিকল্প পরিবহনব্যবস্থা চালুর প্রয়োজন রয়েছে। এই বাস্তবতায় আগামী ছয় মাসের মধ্যে ঢাকায় নারীদের জন্য পৃথক ইলেক্ট্রিক বাস চালুর উদ্যোগ সময়োপযোগী ও সাহসী সিদ্ধান্ত হতে পারে।
উল্লেখ করা প্রয়োজন, বিশ্বের বিভিন্ন শহরে নারী-নিরাপদ গণপরিবহন চালুর ইতিবাচক নজির রয়েছে। পরিবেশবান্ধব ইলেক্ট্রিক বাস একদিকে যেমন কার্বন নিঃসরণ কমাবে, অন্যদিকে নারীদের জন্য নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক ও নির্ভরযোগ্য যাতায়াত নিশ্চিত করবে। ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ নগরে শব্দ ও ধোঁয়াবিহীন বাস পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের জন্য এটি হবে টেকসই নগর পরিবহনব্যবস্থার দিকে বড় পদক্ষেপ।
কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, আমাদের পরিবহন খাতের বাস-ব্যবস্থাপনা বর্তমানে অত্যন্ত বিশৃঙ্খল। সুশৃঙ্খল করতে গেলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ শুরু করা হবে। এই ক্ষেত্রে পাইলটিং ও জোনভিত্তিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার, যাতে কম বিনিয়োগে বেশি মানুষকে সেবা দেওয়া যায়। তাই কেবল ঘোষণা দিলেই হবে নাÑ বাস্তবায়নই মূল চাবিকাঠি। অতীতের সরকারগুলোর সময় দেখা গেছে, অনেক আশা-জাগানিয়া সংবাদ প্রকাশের পর তা আর আলোর মুখ দেখেনি। সেই দৃাষ্টকোণ থেকে বলব, ছয় মাসের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে হলে সুস্পষ্ট রোডম্যাপ প্রয়োজন। প্রথমত, সম্ভাব্য রুট নির্ধারণ করতে হবে যেখানে নারী যাত্রীর সংখ্যা বেশি যেমনÑ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস এলাকা ও শিল্পাঞ্চলমুখী সড়ক। দ্বিতীয়ত, চালক ও সহকারী হিসেবে প্রশিক্ষিত নারী কর্মী নিয়োগ দিলে নিরাপত্তা ও আস্থার মাত্রা বাড়বে। তৃতীয়ত, সিসিটিভি, জিপিএস ট্র্যাকিং ও হেল্পলাইন সেবা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
এখানে অর্থায়নের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি বাজেট, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এবং বেসরকারি খাতের অংশীদারত্বের মাধ্যমে এই প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন সম্ভব। বিদ্যুৎ চার্জিং স্টেশন স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সমন্বিত পরিকল্পনা নিতে হবে। একই সঙ্গে ভাড়া নির্ধারণ এমন হতে হবে, যাতে সাধারণ কর্মজীবী নারী সহজে এই সেবা গ্রহণ করতে পারেন। সমালোচকরা বলতে পারেন, আলাদা বাসব্যবস্থা লিঙ্গসমতা প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে বিভাজন তৈরি করবে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই অগ্রাধিকার। দীর্ঘমেয়াদে অবশ্যই পুরো গণপরিবহন ব্যবস্থাকে নারীবান্ধব ও নিরাপদ করতে হবে। তবে অন্তর্বর্তী সমাধান হিসেবে নারী-নির্দিষ্ট ইলেক্ট্রিক বাস কার্যকর উদ্যোগ হতে পারে।
সবচেয়ে বড় কথা, এটি কেবল পরিবহন প্রকল্প নয়; এটি নারীর ক্ষমতায়ন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানোর একটি সামাজিক বিনিয়োগ। নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত হলে আরও বেশি নারী কর্মক্ষেত্রে যুক্ত হতে পারবেন, যা জাতীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
তাই বলব, আগামী ছয় মাসের মধ্যে ঢাকায় নারীদের জন্য ইলেক্ট্রিক বাস চালু করা এখন সময়ের দাবি। সুপরিকল্পিত উদ্যোগ, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং নাগরিক সহযোগিতা থাকলে এই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিতে পারে। নিরাপদ, সবুজ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর গড়তে এমন সাহসী সিদ্ধান্তই হতে পারে পরিবর্তনের সূচনা।