তারেক রহমান
মো. ইলিয়াস হোসেন
প্রকাশ : ০৪ মার্চ ২০২৬ ১০:৪৮ এএম
মো. ইলিয়াস হোসেন, অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা ও কলাম লেখক। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বাংলাদেশের রাজনীতিতে নেতৃত্বের প্রশ্ন কখনোই সরল সমীকরণে মেলে না। এখানে ব্যক্তি, পরিবার, ইতিহাস, সংগ্রাম, বিতর্ক ও সময়Ñ সবকিছু মিলেই একজন নেতার রাজনৈতিক পরিচয় নির্মিত হয়। এই বাস্তবতায় তারেক রহমানকে ঘিরে উত্তরাধিকার বনাম আত্মপ্রতিষ্ঠার বিতর্ক বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। তিনি কি কেবল শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উত্তরসূরি এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সন্তান হিসেবে রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার বাহক? নাকি দীর্ঘ নির্যাতন, নির্বাসন ও সাংগঠনিক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে পরিণত নেতৃত্বে উত্তীর্ণ হওয়া এক সমসাময়িক রাষ্ট্রনায়ক?
স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক ধারাগুলোর ইতিহাসে পরিবারভিত্তিক ধারাবাহিকতা অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়। তবে উত্তরাধিকার কখনোই স্থায়ী সাফল্যের কোনো নিশ্চয়তা দেয় না। বরং এটি বাড়তি প্রত্যাশা, সন্দেহ ও সমালোচনার ভার চাপিয়ে দেয়। উত্তরাধিকার অনেক সময় প্রবেশদ্বার খুলে দেয়, কিন্তু দীর্ঘ রাজনৈতিক মাঠে টিকে থাকার জন্য প্রয়োজন ব্যক্তিগত দক্ষতা, কৌশলগত প্রজ্ঞা ও সংগঠনিক সক্ষমতা। ইতিহাসে এমন বহু উদাহরণ রয়েছে, যেখানে পারিবারিক পরিচয় থাকা সত্ত্বেও নেতারা ব্যর্থ হয়েছেন। আবার অনেকে প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েই নিজস্ব অবস্থান প্রতিষ্ঠা করেছেন। তারেক রহমানের ক্ষেত্রে সেটিই ঘটেছে, এমনটাই মনে করেন অনেক বিশেষজ্ঞ। জাতীয়তাবাদী ঘরানার রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম নেওয়ার ফলে তারেক রহমানের পরিচিতি আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে; কিন্তু সেই পরিচিতি দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে গ্রহণযোগ্যতার মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ হতে অনেক নিপীড়ন, নির্যাতন এবং ত্যাগের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে।
তারেক রহমানের রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয় ২০০১ সালে দলীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় সম্পৃক্ততার মধ্য দিয়ে। সাধারণ সদস্য হিসেবে তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করার ফলে তিনি সংগঠনের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা বুঝতে সক্ষম হন। পরবর্তীতে ২০০২ সালে দলের সকল পর্যায়ে তার সাংগঠনিক দক্ষতা এবং রাজনৈতিক সক্ষমতা বিবেচনায় তাকে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদে পদায়ন করা হয়, যা মাঠের রাজনীতিতে একটি উল্লেখযোগ্য ধাপ হিসেবে বিবেচিত হয়। এই পর্যায়ে তাকে দলীয় সমন্বয়, রাজনৈতিক বিরোধিতা ও জনমতের চাপকে মাথায় নিয়ে কাজ করতে হয়েছে। কেন্দ্রীয় রাজনীতির জটিল বাস্তবতায় নিজের অবস্থান ধরে রেখে নেতৃত্বের এই ধাপে তিনি যেমন সমালোচিত হয়েছেন, তেমনি সমর্থনও পেয়েছেন। এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট; রাজনীতির ময়দানে কেবল পারিবারিক পরিচয় যথেষ্ট নয়; সংগঠনের অভ্যন্তরে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করা এবং তা ধরে রাখাও সমান জরুরি।
২০০৭ সালের এক-এগারোর পটপরিবর্তনের মাধ্যমে গঠিত অগণতান্ত্রিক ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’-এর সময় তারেক রহমানের জীবনে নেমে আসে এক করুণ অধ্যায়। দেশের সকল রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের ওপরে শুরু হয় আইনি ও রাজনৈতিক চাপ। তখন দেশের দুটি বড় রাজনৈতিক দলের প্রধানসহ অনেক নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করে কারাবন্দি করা হয়। ওই একই সময়ে তারেক রহমানও গ্রেপ্তার হন। মিথ্যা মামলা দিয়ে তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে ব্যাপক নির্যাতন করা হয়; সব মিলিয়ে এতে তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ প্রায় অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। অমানুষিক নির্যাতনে অসুস্থ হয়ে পড়লে উন্নত চিকিৎসা ও নিরাপত্তাজনিত কারণে তাকে বিদেশে গমন করতে হয়, যা তার রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘতম অধ্যায়ে পরিণত হয়।

তিনি সতেরো বছরের অধিক সময় প্রবাসজীবনে অবস্থান করেন। এই কঠিন বাস্তবতায় তিনি কেবল ব্যক্তিগতভাবে বিচ্ছিন্নতা ছিল না; রাজনৈতিক দূরত্বও তৈরি হয়েছিল। তারপরেও বিদেশ থেকে দল পরিচালনা করা, নেতাকর্মীদের মনোবল ধরে রাখা এবং সংগঠনের ঐক্য বজায় রাখাÑ এসব ছিল তার জন্য কঠিন পরীক্ষা। তিনি ওই পরীক্ষায় অত্যন্ত দক্ষতার সাথেই উত্তীর্ণ হয়েছেন। এই সময় তার নেতৃত্বের ধরনে পরিবর্তন আসে বলে অনেকে মনে করেন। প্রযুক্তিনির্ভর যোগাযোগব্যবস্থা ব্যবহার, ভার্চুয়াল সভা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ রক্ষা; এসবের মাধ্যমে তিনি সাংগঠনিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছেন। প্রতিকূলতা অনেক সময় নেতাকে ভেঙে দেয়; আবার অনেক সময় তাকে আরও সংযমী ও কৌশলী করে তোলে। সমর্থকদের মতে, তার ক্ষেত্রে দ্বিতীয়টিই ঘটেছে।
স্বৈরাচারী সরকার যখন দেশে স্বাভাবিক রাজনৈতিক কার্যক্রমকে পুরোপুরি ধ্বংস করার চেষ্টা করেছে, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে রাজনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দিতে মিথ্যা মামলা দিয়ে জেলে পাঠিয়ে দিয়েছে, তখন দলীয় প্রধানের অনুপস্থিতিতে তারেক রহমান জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, এটা ছিল তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়গুলোর একটি। রাজনৈতিক মেরুকরণের তীব্র সময়, দলীয় বিভক্তির সম্ভাবনা এবং রাষ্ট্রীয় চাপে সংগঠন টিকিয়ে রাখাÑ এ সবই ছিল তখন বড় চ্যালেঞ্জ। রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা, মামলা, গ্রেপ্তার ও নির্বাসনের প্রেক্ষাপটে দল পরিচালনা করা ছিল তার জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতা। প্রযুক্তিনির্ভর যোগাযোগব্যবস্থা ব্যবহার করে তিনি যে সাংগঠনিক ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছিলেন, তা দলীয় কাঠামোকে টিকিয়ে রাখতে সহায়ক হয়েছিল। এই সময় তার রাজনৈতিক ভাষা ও কৌশলে সংযম ও পরিকল্পনার ছাপ স্পষ্ট হয়; যা নেতৃত্বের পরিপক্বতার লক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এই পর্যায়ে তার বক্তব্যে একটি লক্ষণীয় পরিবর্তন দেখা যায়Ñ আবেগপ্রবণতা কমে পরিকল্পনামুখী ও নীতিনির্ভর ভাষা বৃদ্ধি পায়। আন্দোলনের আহ্বান থাকলেও সেখানে কৌশলগত সংযম স্পষ্ট হয়। তরুণ নেতৃত্বকে সামনে আনা, সাংগঠনিক পুনর্গঠন এবং জোট রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা তার নেতৃত্বের নতুন দিক তুলে ধরে।
দীর্ঘ নির্বাসনের পর তারেক রহমানের দেশে প্রত্যাবর্তন ছিল প্রতীকী ও বাস্তব উভয় অর্থেই গুরুত্বপূর্ণ। এটি সমর্থকদের কাছে ছিল দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান। দেশনেত্রীর মহাপ্রয়াণের পর পূর্ণাঙ্গ চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ তার সামনে আবারও এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করে। পিতার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এবং মাতার সংগ্রামী নেতৃত্বÑ এই দুই ঐতিহ্যের ভার নিয়ে নিজস্ব অবস্থান তৈরি করা সহজ ছিল না। এখানেই আত্মপ্রতিষ্ঠার প্রশ্নটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ঐতিহাসিক আবেগ ও তুলনার ভার নিয়ে নেতৃত্ব দেওয়া সহজ নয়। দলের ঐক্য ধরে রেখে নতুন প্রজন্মকে সঙ্গে নিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান তৈরি করাÑ এসব দায়িত্ব তাকে নিতে হয়েছে এমন এক সময়ে, যখন রাজনৈতিক মেরুকরণ ছিল তীব্র। এই পর্যায়ে তার ভূমিকা কেবল সাংগঠনিক প্রধানের নয়; বরং মতাদর্শিক দিকনির্দেশকের মতোই। এখানেই তার নেতৃত্বের স্বতন্ত্রতা প্রমাণের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
অতঃপর জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং ভূমিধস বিজয় তার রাজনৈতিক যাত্রাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে আন্দোলনের রাজনীতি থেকে প্রশাসনিক দায়িত্বে উত্তরণের সূচনা ঘটেছে এবং এখানেই শুরু হয়েছে প্রকৃত পরীক্ষা। বিরোধিতার রাজনীতি জনমত গঠনে কার্যকর; কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রয়োজন নীতিগত দৃঢ়তা, প্রশাসনিক দক্ষতা ও সংযম এবং অভিজ্ঞতা। জনপ্রিয়তা অর্জনের চেয়ে তা ধরে রাখা কঠিন। নতুন সরকারের সামনে রয়েছে অর্থনৈতিক সংকট, মুদ্রাস্ফীতি, কর্মসংস্থানের চাপ ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা। প্রশাসনিক কাঠামোর জড়তা এবং রাজনৈতিক মেরুকরণও বড় বাধা। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া। এ সবগুলোই হচ্ছে বর্তমানে তার নেতৃত্বের প্রথম চ্যালেঞ্জ এবং সক্ষমতার মানদণ্ড। এর সঙ্গে প্রয়োজন রাজনৈতিক সহনশীলতা। বিরোধী মতকে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করলে স্থিতিশীলতা ক্ষুণ্ন হতে পারে। জাতীয় ঐক্যের বার্তা কেবল আলোচনায় নয়, নীতিতেও প্রতিফলিত হওয়া জরুরি। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে সমন্বিত পরিকল্পনা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার অপরিহার্য। কাঠামোগত পরিবর্তন সময়সাপেক্ষ হলেও, জনগণ দ্রুত ফল প্রত্যাশা করে; এই বাস্তবতায় নেতৃত্বের শক্তি প্রমাণিত হবে কেবল দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও স্বচ্ছতার মাধ্যমে।
তারেক রহমানকে কেবল পারিবারিক পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করা যেমন একপাক্ষিক, তেমনি তার দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতাকে অস্বীকার করাও অসম্পূর্ণ বিশ্লেষণ। উত্তরাধিকার তার রাজনৈতিক পরিচয়ের অংশ; কিন্তু চূড়ান্ত পরিচয় নির্ধারিত হবে তার শাসনদক্ষতা ও নীতিগত অবস্থানের ওপরে। ইতিহাস শেষ পর্যন্ত পদবি নয়, কর্মফল স্মরণ রাখে। রাজনৈতিক উত্তরাধিকার যদি আত্মপ্রতিষ্ঠায় রূপ নেয়, তবে তা নেতৃত্বের স্বাভাবিক বিবর্তন। আর যদি উত্তরাধিকারই একমাত্র ভরকেন্দ্র হয়ে থাকে, তবে সময়ের পরিক্রমায় তা হারিয়ে যাবে।
বাংলাদেশ আজ প্রত্যাশা ও সংশয়ের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। নতুন নেতৃত্বের সামনে সুযোগ যেমন আছে, তেমনি ঝুঁকিও স্পষ্ট। দীর্ঘ সংগ্রাম ও নির্বাসনের অভিজ্ঞতা যদি সুশাসনের ভিত্তি হয়ে ওঠে, তবে তা হবে আত্মপ্রতিষ্ঠার সার্থকতা। তারেক রহমানের রাজনৈতিক যাত্রা উত্তরাধিকার, সংগ্রাম ও রূপান্তরের এক জটিল সমন্বয়। এখন তার সামনে প্রধান প্রশ্নÑ তিনি কি এই অভিজ্ঞতাকে ন্যায়, শৃঙ্খলা ও উন্নয়নের কার্যকর নীতিতে রূপ দিতে পারবেন? ইতিহাসের আয়না নিরপেক্ষ। সেখানে জন্মপরিচয় নয়, অর্জনই স্থায়ী হয়ে থাকে। তবে আমরা আশাবাদী হতে চাই। সবাইকে ধন্যবাদ।
মো. ইলিয়াস হোসেন
অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা ও কলাম লেখক