বিশ্ব জনমত
হাবিব বাবুল
প্রকাশ : ০৪ মার্চ ২০২৬ ১০:২৮ এএম
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা আবারও আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে এক অনিশ্চিত বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা আবারও আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে এক অনিশ্চিত বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। এই সংঘাত শুধু দুটি রাষ্ট্রের সামরিক বা কূটনৈতিক বিরোধ নয়; বরং এটি বিশ্ব-রাজনীতি, আন্তর্জাতিক আইন, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক জনমতের এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে, ইউরোপীয় দেশগুলোর জনগণ ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব এই সংকটকে দেখছে সতর্কতা, উদ্বেগ এবং কৌশলগত দ্বিধার দৃষ্টিকোণ থেকে। ইউরোপের বৃহত্তম অর্থনীতি এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী রাষ্ট্র হিসেবে জার্মানির অবস্থান এখানে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই উত্তেজনাপূর্ণ। পরমাণু কর্মসূচি, মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তার, নিষেধাজ্ঞা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা প্রশ্নে দুই দেশের বিরোধ ক্রমেই গভীর হয়েছে। সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা পরিস্থিতিকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে যেখানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সরাসরি যুদ্ধের আশঙ্কা অনুভব করছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করলে স্পষ্ট হয়Ñ বিশ্ব জনমত একমুখী নয়; বরং তা বিভক্ত, সতর্ক এবং গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।
বিশ্বব্যাপী জনমতের একটি বড় অংশ সামরিক সংঘাতের বিরোধিতা করছে। আন্তর্জাতিক জরিপ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণগুলো দেখায় যে সাধারণ মানুষ যুদ্ধের সম্ভাব্য মানবিক ক্ষতি, শরণার্থী সংকট এবং অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে, ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধের অভিজ্ঞতা পশ্চিমা সমাজে সামরিক হস্তক্ষেপের প্রতি এক ধরনের সংশয় তৈরি করেছে। ফলে অনেক দেশের নাগরিকরা মনে করছেন, নতুন কোনো মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করবে।
একই সময়ে কিছু রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক গোষ্ঠী যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে নিরাপত্তা দৃষ্টিকোণ থেকে সমর্থন করছে। তাদের মতে, ইরানের সামরিক ও পরমাণু কর্মসূচি আঞ্চলিক ভারসাম্যের জন্য হুমকি হতে পারে। তবে এই সমর্থনও শর্তসাপেক্ষ; অধিকাংশ দেশ সরাসরি যুদ্ধ নয়, বরং কূটনৈতিক চাপ ও আন্তর্জাতিক আলোচনার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিক্রিয়া এই সংকটে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। ইউরোপ ঐতিহাসিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক সংঘাতের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ভোগ করেছেÑ বিশেষ করে শরণার্থী সংকট, জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধি এবং নিরাপত্তা উদ্বেগের মাধ্যমে। তাই ইউরোপীয় নেতারা শুরু থেকেই ‘সংযম’ এবং ‘আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার’ আহ্বান জানিয়েছেন। ইউরোপীয় কূটনীতির মূল লক্ষ্য হচ্ছে সংঘাতকে আঞ্চলিক যুদ্ধ বা বৈশ্বিক শক্তির সরাসরি সংঘর্ষে রূপ নেওয়া থেকে রক্ষা করা।
ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য এবং অন্যান্য ইউরোপীয় রাষ্ট্রের মতো জার্মানিও একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান গ্রহণ করেছে। তারা একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তায় উদ্বেগ স্বীকার করছে, অন্যদিকে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধির বিরুদ্ধে সতর্ক অবস্থান নিচ্ছে। ইউরোপীয় কূটনৈতিক ভাষায় এটি ‘ডি-এস্কেলেশন’ বা উত্তেজনা প্রশমন নীতি হিসেবে পরিচিত।
জার্মানির অবস্থান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ কারণ দেশটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময় থেকে সামরিক সংঘাতের পরিবর্তে বহুপাক্ষিক কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দিয়ে এসেছে। জার্মান পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হলো আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘ কাঠামো এবং আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধান। বর্তমান পরিস্থিতিতেও বার্লিন একই নীতির পুনরাবৃত্তি করেছে। জার্মান সরকারের বক্তব্যে বার বার বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন যুদ্ধ ইউরোপের নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্য সরাসরি ঝুঁকি সৃষ্টি করবে।
জার্মান জনগণের প্রতিক্রিয়াও লক্ষণীয়। বিভিন্ন জনমত জরিপ ও মিডিয়া আলোচনায় দেখা যায়, অধিকাংশ জার্মান নাগরিক সামরিক সমাধানের চেয়ে কূটনৈতিক উদ্যোগকে সমর্থন করে। বার্লিন, হামবুর্গ এবং কোলনের মতো শহরে যুদ্ধবিরোধী সমাবেশ ও নাগরিক উদ্যোগ লক্ষ করা গেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো সম্ভাব্য বেসামরিক হতাহতের বিষয়টি সামনে এনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সতর্ক করেছে।
জার্মান মিডিয়ার বিশ্লেষণেও দ্বৈত বাস্তবতা উঠে এসেছে। একদিকে ইরানের আঞ্চলিক কর্মকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশল দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা আনতে পারবে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, সামরিক উত্তেজনা বাড়লে ইউরোপ আবারও শরণার্থী সংকট এবং অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়বে।
এই সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাব ইউরোপীয় জনমতের ওপর বড় ভূমিকা রাখছে। মধ্যপ্রাচ্য বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। পারস্য উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালীতে অস্থিরতা তৈরি হলে তেলের দাম বৃদ্ধি পায়, যা সরাসরি ইউরোপের শিল্প উৎপাদন ও জীবনযাত্রার ব্যয়কে প্রভাবিত করে। জার্মানির মতো শিল্পনির্ভর অর্থনীতির জন্য এটি একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। ইতোমধ্যে জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা ইউরোপীয় অর্থনীতিকে সতর্ক অবস্থানে নিয়ে এসেছে।
বিশ্ব-রাজনীতির বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে এই সংঘাত আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্যকেও প্রভাবিত করছে। চীন ও রাশিয়া পরিস্থিতিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যবেক্ষণ করছে, আর ইউরোপ চেষ্টা করছে কূটনৈতিক মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা ধরে রাখতে। অনেক ইউরোপীয় বিশ্লেষক মনে করছেন, যদি ইউরোপ এই সংকটে কার্যকর কূটনৈতিক ভূমিকা নিতে পারে, তবে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তার কৌশলগত গুরুত্ব বাড়বে।
জনমতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মানবিক উদ্বেগ। যুদ্ধ মানেই শরণার্থী, খাদ্য সংকট, অবকাঠামো ধ্বংস এবং দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক অস্থিরতা। ইউরোপ ইতোমধ্যে সিরিয়া যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষ নতুন সংঘাতের সম্ভাবনা নিয়ে মানসিকভাবে ক্লান্ত এবং উদ্বিগ্ন। এই মানসিক বাস্তবতা ইউরোপীয় সরকারের নীতিনির্ধারণেও প্রভাব ফেলছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে স্পষ্ট যে বিশ্ব জনমত সরাসরি যুদ্ধের পক্ষে নয়। বরং অধিকাংশ দেশ ও জনগণ এমন একটি সমাধান চায় যেখানে কূটনীতি, আন্তর্জাতিক আলোচনা এবং পারস্পরিক নিরাপত্তা নিশ্চয়তা গুরুত্ব পায়। ইউরোপীয় সমাজ বিশেষভাবে বিশ্বাস করে যে সামরিক শক্তি নয়, বরং রাজনৈতিক সংলাপই দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার একমাত্র পথ।
জার্মানির ভূমিকা এখানে এক ধরনের মধ্যপন্থী নেতৃত্বের উদাহরণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে। দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখলেও অন্ধ সমর্থনের পরিবর্তে আন্তর্জাতিক আইন ও বহুপাক্ষিক আলোচনার ওপর জোর দিচ্ছে। এই অবস্থান ইউরোপীয় জনমতের প্রতিফলন বলেই মনে হয়Ñ যেখানে নিরাপত্তা ও শান্তির মধ্যে ভারসাম্য খোঁজা হচ্ছে।
সবশেষে বলা যায়, আমেরিকা-ইরান সংঘাত বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার মুহূর্ত। বিশ্ব জনমত যুদ্ধের চেয়ে স্থিতিশীলতা চায়, ইউরোপ চায় উত্তেজনা হ্রাস, আর জার্মানি চেষ্টা করছে যুক্তিবাদী কূটনীতির মাধ্যমে সংকটকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে। ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে রাজনৈতিক নেতৃত্ব কতটা সংযম দেখাতে পারে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কত দ্রুত আলোচনার পথকে শক্তিশালী করতে পারে তার ওপর।
হাবিব বাবুল
জার্মানিভিত্তিক কলাম লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক