মোজাহিদ হোসেন
প্রকাশ : ০৪ মার্চ ২০২৬ ১০:১৯ এএম
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বের প্রায় ৫০% শিল্প উৎপাদন ক্ষমতা, ৭০% স্বর্ণ মজুদ, পারমাণবিক বোমা এবং শক্তিশালী নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী নিয়ে আমেরিকা পরিণত হয় বিশ্ব মোড়লে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
আমেরিকার সবচেয়ে বড় উত্থান হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর। এই সময় আমেরিকা শুধুই লাভবান হয়েছিল। প্রথম দিকে আমেরিকা যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করেনি, যার ফলে আমেরিকায় যে ব্যাপক অস্ত্র, রসদ ছিল তা দুই পক্ষের কাছেই বিক্রি করার সুযোগ হয়েছিল। যুদ্ধ শেষে যে সময়ে ইউরোপ, জাপান, সোভিয়েত ইউনিয়নসহ অন্য প্রায় সকল দেশের অর্থনীতি ধ্বংস সেই সময় আমেরিকার অর্থনীতি ব্যাপক শক্তিশালী। যুদ্ধ শেষে ১৯৪৫ সালে আমেরিকার কাছে ছিল বিশ্বের প্রায় ৫০% শিল্প উৎপাদন ক্ষমতা, ৭০% স্বর্ণ মজুদ, পারমাণবিক বোমা এবং ছিল বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী। এরপর থেকে আমেরিকা পরিণত হয় বিশ্ব মোড়লে। পুরা বিশ্বের নেতৃত্ব তাদের হাতে। এই নেতৃত্বকে টিকিয়ে রাখার জন্য সামনে যেই এসেছে তাকেই ধ্বংস করে দিয়েছে। এই ধ্বংসের কাতারে বিশ্বের মুসলিম রাষ্ট্রগুলোই বেশি। এ জন্য অনেকে ধারণা করে আমেরিকার মূল লক্ষ্য বিশ্বের মুসলিম নিধন করা। বাস্তবতায় কিন্তু তা পরিলক্ষিত হয় না। বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলে। আমেরিকা সর্বদা স্বার্থ উদ্ধারে ব্যস্ত।
প্রকৃতপক্ষে আমেরিকা কী চায়? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়Ñ প্রথমত, আমেরিকার প্রধান লক্ষ্যবস্তু একমাত্র পরাশক্তি দেশ হিসেবে বৈশ্বিক আধিপত্য বিস্তার করা। যার জন্য বিশ্বের ৮০টিরও বেশি দেশে ৭৫০+ মার্কিন সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেছে তারা। যুদ্ধের পরে রাশিয়াকে ঘিরে ধরার জন্য ন্যাটো গঠন ও সম্প্রসারণ করেছে। আবার চীনকে ঠেকাতে ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল। যে দেশই মাথা ওপরে তোলে সেখানেই তাদের হস্তক্ষেপ দেখা যায়।
দ্বিতীয়ত, লক্ষ্যবস্তু হলো বিশ্বে ডলারের আধিপত্য বিস্তার করা। এটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যদিও বেশি আলোচিত নয়। ডলার সিস্টেম আমেরিকা করেছে। বিশ্বের তেল ডলারে বিক্রি হয়। যার জন্য আন্তর্জাতিক লেনদেনের জন্য সব দেশকে ডলার মজুদ রাখতে হয়। এখানকার প্রধান বিষয় আমেরিকা ইচ্ছামতো ডলার ছাপাতে পারে। কিন্তু অন্য দেশ পারে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো দেউলিয়া হয়ে আমেরিকার কাছে সম্পূর্ণ বাঁধা পড়ল। আমেরিকা এই দেশগুলোর পুনর্গঠনের জন্য কোটি কোটি ডলার ধার দিল। এই ডলার দিয়ে তারা আমেরিকার থেকে যন্ত্রপাতি কিনে আবার কলকারখানা চালু করেছিল। ফলে দেশগুলোর বৈদেশিক বাণিজ্য রক্ষার জন্য পুনরায় অভাব দেখা দিল। যার ফলাফল ১৯৪৪ সালে ব্রেটন উডসে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংক গঠন। পরবর্তীতে এখান থেকেই ডলার ধার দেওয়া শুরু হলো। কিন্তু এর উভয়ের নেতৃত্বে আমেরিকাই। পরবর্তীতে এই ডলার সিস্টেম থেকে যে দেশই বেরিয়ে আসতে চেয়েছে, আমেরিকা সেখানেই হস্তক্ষেপ করেছে। এর বাস্তব উদাহরণ ইরাকে দেখা যায় ২০০৩ সালে। সাদ্দাম হোসেন ইউরোতে তেল বিক্রি করতে চেয়েছেন। ফলাফল তার ফাঁসি। ২০১১ সালে লিবিয়ায় মুয়াম্মার গাদ্দাফি গোল্ড দিনারের দিকে যেতে চেয়েছিলেন। ফলাফল তিনি নিহত হন। ইরানে ইউরো ও ইউয়ানে তেল বিক্রি করার জন্য কঠোর নিষেধাজ্ঞা দেয় আমেরিকা।
তৃতীয়ত, আমেরিকার আরেক লক্ষ্য হলো বিশ্বের তেল ও জ্বালানি নিয়ন্ত্রণ করা। কিছুদিন আগেই ভেনিজুয়েলার প্রধানমন্ত্রীকে উঠিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। কেননা ভেনিজুয়েলা তেল মজুদে প্রথম। যেভাবেই হোক বিশ্বের তেল নিয়ন্ত্রণ করাই লক্ষ্য। বিশেষ করে, মধ্যপ্রাচ্যের তেল নিয়ন্ত্রণ মানে ইউরোপকে নিয়ন্ত্রণ করা, চীনকে নিয়ন্ত্রণ করা, রাশিয়াকে চাপে রাখা। হেনরি কিসিঞ্জার বলেছিলেন, তেল নিয়ন্ত্রণ কর, জাতিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।
চতুর্থত, আমেরিকার আরেক দিক হলো অন্য রাষ্ট্রের মধ্যে দ্বন্দ্ব বাধিয়ে দিয়ে অস্ত্র ব্যবসা করা। কেননা ওরা মনে করে যুদ্ধ মানেই মুনাফা। আবার, ইসরায়েলকে নিরাপত্তা প্রদান করাও আমেরিকার লক্ষ্য। কেননা এটিই মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটির বিকল্প পরীক্ষিত অস্ত্র ও গোয়েন্দা প্রযুক্তির উৎস।
সর্বোপরি, আমেরিকা বৈশ্বিক আধিপত্য বিস্তারের জন্য সামরিক শক্তি ব্যবহার করে। ফলে শিকার হয় দুর্বল রাষ্ট্রগুলো। ডলার নিয়ন্ত্রণ করার জন্য অন্য দেশের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর শিকার হয় বিশ্বের স্বাধীনচেতা নেতারা। আবার তেল নিয়ন্ত্রণের জন্য মিত্র স্বৈরশাসকের সঙ্গে মিলিত হয়ে দখলদারত্ব করে। সবই নিজ স্বার্থের জন্য। ভুক্তভোগী হয় তেলসমৃদ্ধ দেশের জনগণ। নিজেদের অর্থনীতি শক্তিশালী করতে অস্ত্র ব্যবসা করার জন্য অন্য বিভিন্ন দেশের মধ্যে দ্বন্দ্ব উস্কে দেয়। এর ভুক্তভোগী হয় যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের সাধারণ মানুষ। ইসরায়েল রক্ষার জন্য সামরিক সাহায্য করে আসতেছে। মৃত্যুপুরীতে পরিণত হচ্ছে ফিলিস্তিন। আবার আমেরিকা যাদের প্রতিযোগী মনে করে তাদের দমনের জন্য নিষেধাজ্ঞা ও প্রক্সি যুদ্ধ লাগিয়ে দেয়। ফলে সাধারণ নাগরিকদের ক্ষতির শিকার হতে হয়। আমেরিকার লক্ষ্য মূলত ক্ষমতা, সম্পদ এবং বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ। এসবের জন্য হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে ধর্ম, নারী ক্ষমতায়ন, গণতন্ত্র বা মানবাধিকার। তাদের স্বার্থের জন্য যখন যে হাতিয়ারের প্রয়োজন হয়, তখন সেটিই ব্যবহার করে। স্বার্থের জন্য কোনো কিছুকে তারা পরোয়া করে না।
মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলে বিশ্বের ৬০% তেল ও গ্যাস মজুদ। আবার ভৌগোলিক অবস্থান মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া-এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের সংযোগস্থল। এ ছাড়া অনেক রাষ্ট্র ছিল দুর্বল। আবার এর অন্যতম প্রধান কারণ মুসলিমদের মধ্যে ঐক্যের অভাব। নিজেদের মধ্যে অনেক বিভক্ত। এ সবকিছুকে সামনে রেখে ইসলামোফোবিয়া হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। নিজ স্বার্থের জন্য মুসলমানদের সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ হিসেবে উপস্থাপন করে জনমত গঠন করে আক্রমণ শুরু করে। যেখানে আমেরিকার প্রধান লক্ষ্য আধিপত্য বিস্তার করা। ক্ষমতা দখল করা।
মোজাহিদ হোসেন
শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া