ভূমিকম্প-পরবর্তী পরিস্থিতি
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০৩ মার্চ ২০২৬ ১৪:০০ পিএম
ভূমিকম্প-পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাজধানী ঢাকায় এক লাখ স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে অনুভূত ভূমিকম্পের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর এই বিশেষ নির্দেশনা। এর অন্যতম লক্ষ্য হলো, উপকূলীয় অঞ্চলে যেভাবে দক্ষ স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী রয়েছে, ঠিক একই আদলে ঢাকাকেন্দ্রিক স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী তৈরি করা। যাতে যেকোনো দুর্যোগে দ্রুততম সময়ে সাধারণ মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া যায়। তাই ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং খেলার মাঠগুলোকে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ভূমিকম্পের সময় ও পরবর্তীতে করণীয় সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে বলা হয়েছে। ১ মার্চ, সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু।
জানা গেছে, ইতোমধ্যে ভূমিকম্প মোকাবিলায় একটি খসড়া পরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে। এই বিষয়ে সামগ্রিক কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আগামী ১১ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। ওই বৈঠকেই দুর্যোগ-পরবর্তী উদ্ধার অভিযান ও ত্রাণ কার্যক্রমের চূড়ান্ত রূপরেখা নির্ধারিত হবে। যার লক্ষ্য হবে, দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় উদ্ধার সরঞ্জাম দ্রুততম সময়ে ক্রয় (প্রকিউরমেন্ট) এবং ভূমিকম্পের মতো বড় দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে পূর্বপ্রস্তুতির উদ্যোগ নেওয়া।
এ কথা সত্য যে, বাংলাদেশে ভূমিকম্পের ঝুঁকি আজ আর অনুমানভিত্তিক নয়; এটি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত বাস্তবতা। সহজ করে বললে, ভূমিকম্প ঝুঁকির দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম স্পর্শকাতর অঞ্চলে অবস্থান করছে। ভৌগোলিক অবস্থান, ঘনবসতি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং দুর্বল অবকাঠামোর কারণে বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে ভয়াবহ প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতির আশঙ্কা থেকেই যায়। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন অঞ্চলে মাঝারি থেকে উচ্চমাত্রার কম্পন আমাদের আবারও সতর্ক করে দিয়েছেÑ প্রস্তুতিই হতে পারে একমাত্র রক্ষাকবচ।
বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন যেÑ ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চল সক্রিয় ফল্ট লাইনের নিকটে অবস্থিত। বুয়েটের একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, বড় মাত্রার ভূমিকম্প হলে রাজধানীতে বহু পুরনো ও নকশাবিহীন ভবন ধসে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। একইভাবে কমপ্রিহেনসিভ ডিজেস্টার ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রামের পূর্ববর্তী মূল্যায়নেও নগর অবকাঠামোর দুর্বলতা এবং উদ্ধার সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকম্প-উত্তর উদ্ধার তৎপরতা জোরদারের প্রস্তুতি সময়োপযোগী ও অত্যন্ত প্রয়োজনীয় উদ্যোগ। সরকার ইতোমধ্যে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সক্ষমতা বাড়াতে আধুনিক উদ্ধার সরঞ্জাম সংগ্রহ, বিশেষ প্রশিক্ষণ এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া ইউনিট গঠনের পদক্ষেপ নিয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের অধীনে স্বেচ্ছাসেবক নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং সিটি করপোরেশন পর্যায়ে জরুরি অপারেশন সেন্টার সক্রিয় করার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
তবে বাস্তবতা হলো, শুধু কেন্দ্রীয় প্রস্তুতিই যথেষ্ট নয়। স্থানীয় সরকার, হাসপাতাল, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং বিদ্যুৎ-গ্যাস সরবরাহকারী সংস্থাগুলোর সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা থাকতে হবে। ভূমিকম্প-পরবর্তী ৭২ ঘণ্টা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময়ে ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়া মানুষকে জীবিত উদ্ধারের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত নেতৃত্ব, দ্রুত সিদ্ধান্ত এবং পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি। উন্নত দেশগুলোতে যেমন ‘সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ’ টিমের বিশেষায়িত ইউনিট থাকে, তেমনি আমাদের জাতীয় পর্যায়ে মানসম্মত আরবান সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ (ইউএসএআর) টিম শক্তিশালী করতে হবে। এ ছাড়া হাসপাতালগুলোর জরুরি প্রস্তুতি নিশ্চিত করা জরুরি। বড় ধরনের ভূমিকম্পে আহতের সংখ্যা ক্রমশ বাড়তে পারে। ট্রমা কেয়ার, রক্তের মজুদ, অস্থায়ী চিকিৎসাকেন্দ্র এবং মোবাইল মেডিকেল টিম প্রস্তুত রাখা না গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। একই সঙ্গে সেতু, ফ্লাইওভার ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা নিরীক্ষা নিয়মিত করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে দুর্যোগ মোকাবিলা তথা সাইক্লোন ও বন্যা ব্যবস্থাপনায় অতীতে যে সাফল্য অর্জিত হয়েছেÑ ভূমিকম্প প্রস্তুতিতেও তেমন দূরদর্শিতা প্রত্যাশিত। কিন্তু একটি বিষয় পরিষ্কারÑ এই ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়ামূলক নয়, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করাই হবে কার্যকর কৌশল। আমরা মনে করি, বিল্ডিং কোড কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা প্রণয়ন এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিই পারে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি কমাতে।
দেশ ঝুঁকিতেÑ এ কথা স্বীকার করেই আমাদের এগোতে হবে। প্রধানমন্ত্রী উদ্ধার তৎপরতার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, এটি আশাব্যঞ্জক। তবে সরকারের পাশাপাশি নাগরিক সচেতনতা, গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকা এবং সুশাসন নিশ্চিত না হলে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসবে না। মনে রাখতে হবে, প্রস্তুতি নিলে রক্ষা আর অবহেলায় বিপর্যয়Ñ এই সত্যটি এখন আমাদের সামনে।