কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়ন
ড. জাহাঙ্গীর আলম
প্রকাশ : ০৩ মার্চ ২০২৬ ১৩:৫৭ পিএম
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় নিয়ে সরকার গঠন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর তিনি যুক্তরাজ্যে অনেকটা নির্বাসনেই ছিলেন। গত ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে দেশে ফিরে এসে তিনি ঘটনা-পরম্পরায় দলের প্রধান ব্যক্তি হয়ে ওঠেন। তার আচরণ, কথা ও পরিকল্পনা দেশের জনগণের আস্থা কুড়াতে সক্ষম হয়। নির্বাচনী জনসভাগুলো পরিণত হয় লোকে লোকারণ্যে। তার ব্যাপক জনপ্রিয়তা নির্বাচনে বিএনপিকে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা এনে দেয়। অতঃপর তিনি সরকার গঠন করেন। ইতোমধ্যেই তিনি মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের নিয়োগ দিয়েছেন। সরকার পরিচালনায় আত্মনিয়োগ করেছে নতুন মন্ত্রিসভা। সামনে অনেক ঝুঁকি ও সম্ভাবনার হাতছানি নিয়ে শুরু হয়েছে এই নতুন সরকারের স্বপ্নের পথযাত্রা।
দেশের বর্তমান অবস্থা বেশ অস্থির। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেকটা ভঙ্গুর। দীর্ঘদিন মব সন্ত্রাস, দখলদারত্ব ও চাঁদাবাজি জনসাধারকে অস্থির করে রেখেছে। নতুন বিনিয়োগে আস্থার সংকট। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ তলানিতে। অসংখ্যা মানুষ কর্মহীন। সকল স্তরে দুর্নীতি বাসা বেঁধে আছে। জনবিমুখ ও লোভী আমলাতন্ত্র দেশের প্রশাসনে জগদ্দল পাথরের মতো বসে আছে। অপরদিকে দেশের উৎপাদন ব্যবস্থায় বন্ধ্যত্ব বিরাজমান। পণ্য সরবরাহ শৃঙ্খলে অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি মূল্য পরিস্থিতিকে অস্থির করে তুলছে। গত প্রায় সাড়ে তিন বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের জীবনমাত্রাকে দুর্বিষহ করে রেখেছে। পাশাপাশি দুর্বল ব্যাংকিং খাত, সরকারের ঋণ বৃদ্ধি ও রাজস্ব আহরণে ব্যর্থতা জাতীয় অর্থনীতিকে এক নাজুক অবস্থায় ঠেলে দিয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের সামনে এখন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, বিনিয়োগ উৎসাহিত করা, দুর্বৃত্তায়ন হ্রাস, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, আমলাতন্ত্রের সংস্কার, কৃষি ও শিল্পে উৎপাদন বৃদ্ধি, বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং মূল্যস্ফীতি হ্রাস বড় অগ্রাধিকার।
খাতওয়ারি বিবেচনায় সবচেয়ে অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য কৃষি খাত। এটি প্রধান উৎপাদনশীল খাত এবং খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। স্বাধীনতার পর থেকে গত ৫৪ বছর ধরে এ খাতের প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে বছরে গড়ে প্রায় ৩ শতাংশ হারে। গত ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে তা হ্রাস পেয়ে দাঁড়ায় ১.৭৯ শতাংশে। তাতে খাদ্য আমদানির পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। চাল ও গম মিলে গত অর্থবছরে মোট আমদানির পরিমাণ দাঁড়ায় ৭৬ লাখ ৭২ হাজার ৩১ টন। এর মধ্যে চালের পরিমাণ ১৩ লাখ ১ হাজার ৩৯ টন। বর্তমান অর্থবছরে তা আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাতে বিদেশি মুদ্রার মজুদের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়েছে। ডলারের তুলনায় টাকার বিনিময় হার নমনীয় বিধায় অভ্যন্তরীণ বাজারে খাদ্যশস্যের মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে।
গত কয়েক মাস আগে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা নমনীয় হয়ে এসেছিল। কিন্তু গত ৪ মাস ধরে তা লাগাতার বৃদ্ধি পেয়েছে। গত জানুয়ারিতে এর পরিমাণ ছিল ৮.২৯ শতাংশ। এর আগে ডিসেম্বরে ছিল ৭.৭১ শতাংশ। এরূপ উচ্চ মূল্যস্ফীতির ৬২.৮ শতাংশই এসেছে আমিষ জাতীয় পণ্য থেকে। বাজারে মাছ, মাংস, শুঁটকি, দুধ ও ডালের দাম তুলনামূলকভাবে বেশি। এমতাবস্থায় ফসল কৃষি ও শস্যবহির্ভূত কৃষি খাতে উৎপাদন বৃদ্ধি করা একান্ত প্রয়োজন। আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জনের জন্য ন্যূনতমপক্ষে ৪ শতাংশ হারে বৃহত্তর কৃষি খাতের উৎপাদন বৃদ্ধি করা দরকার। সে ক্ষেত্রে আগামী দিনের বিনিয়োগ পরিকল্পনায় কৃষি খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া অপরিহার্য।
স্বাধীনতার পর বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সত্তরের দশকের শেষ ভাগে খাদ্যে স্বয়ম্ভরতা অর্জনের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তিনি স্বেচ্ছাশ্রমে খাল খনন কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলেন। চাষাবাদে আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ ও সেচব্যবস্থার সম্প্রসারণ ঘটিয়েছিলেন। দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় কৃষি ও পল্লী উন্নয়ন খাতে সর্বোচ্চ ৩১ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করা হয়েছিল। তারই শাসনামলে ১৯৮১ সালে দেশকে সর্বপ্রথম খাদ্যে স্বয়ম্ভর বলে ঘোষণা করা হয় এবং কিছু চাল বিদেশে রপ্তানি করা হয়। পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণের ফলে কৃষিতে বিনিয়োগ হ্রাস পায়। ভর্তুকি নেমে আসে প্রায় শূন্যের কোঠায়। ১৯৯৮-১৯৯৯ অর্থবছরে ভয়াবহ বন্যায় কৃষি খাতে বিপর্যয় নেমে এলে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার কৃষিতে ভর্তুকি দেওয়া পুনরায় শুরু করে। ২০০১-২০০২ অর্থবছরের বাজেটে তার পরিমাণ ১০০ কোটি টাকায় উপনীত হয়।
প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপির সরকার ২০০৫-২০০৬ অর্থবছরের বাজেটে কৃষি ভর্তুকির পরিমাণ ১১০০ কোটি টাকায় বৃদ্ধি করে। ২০০৬-২০০৭ অর্থবছরের বাজেটে তা আরও বৃদ্ধি করে নির্ধারণ করা হয় ১২০০ কোটি টাকা। এটি ছিল মোট বাজেটের প্রায় পৌনে ২ শতাংশ। এর পর কৃষি ভর্তুকির আকার বেড়েছে। ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে কৃষি ভর্তুকি খাতে বরাদ্দ করা হয় ১৭ হাজার ২৬১ কোটি টাকা। এটি মূল বাজেটের ২.২ শতাংশ, যা অপ্রতুল। এটি মোট কৃষি উৎপাদনের ১০ শতাংশ বা ৪০ হাজার কোটি টাকায় বৃদ্ধি করা উচিত। বৃহত্তর কৃষি খাতে মোট বাজেটের ১০ শতাংশ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া যুক্তসঙ্গত। বর্তমানে তা ৫.৮৬ শতাংশ।
বিএনপির নির্বাচন ইশতেহারে কৃষি কার্ড করা এবং তার মাধ্যমে কৃষি উপকরণ, ভর্তুকি, ঋণ, বীমা সুবিধা ইত্যাদি প্রদানের কথা বলা হয়েছে। বিভিন্ন শ্রেণির কৃষকের মাঝে প্রগতিশীল হারে আচ্ছাদিত ভর্তুকিযুক্ত উপকরণ এবং নগদ অর্থ সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে কৃষকের কার্ড খুবই সহায়ক হতে পারে। বর্তমানে মূল সমস্যা কৃষি উপকরণে সরবরাহ ঘাটতি। উদাহরণস্বরূপ রাসায়কি সারের কথা বলা যায়, এবার বোরোর মৌসুমে কৃষকগণ তাদের প্রয়োজনের অর্ধেক পরিমাণ সারও জোগাড় করতে পারছেন না। সদ্য বিদায় নেওয়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে গ্যাস সংকটের অজুহাতে অধিকাংশ সার কারখানা বন্ধ রাখা হয়েছে। অপরদিকে অর্থ সংকটের কারণে পর্যাপ্ত সার আমদানি করা যায়নি। ফলে তীব্র সার সংকট দৃষ্টিগোচর হয়েছে। গ্রামাঞ্চলে সারের দাম বেড়ে গেছে। এ সংকট মোকাবিলায় দেশের সার কারখানাগুলো পুরোদমে চালু করা দরকার।
বিএনপির নির্বাচন ইশতেহারের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার অঙ্গীকার। এর জন্য সরকারের শস্য সরবরাহ নীতির পরিবর্তন করা দরকার। ফসলের উৎপাদন খরচের ওপর ন্যূনপক্ষে ২০ শতাংশ লাভ যোগ করে শস্য সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণ করা উচিত। বর্তমানে শুধু ধান, চাল ও গম উৎপাদন মৌসুমে সরকারিভাবে খাদ্যশস্য সংগ্রহ করা হয়। এর পরিধি বৃদ্ধি করে প্রাথমিকভাবে ১০টি ফসল সংগ্রহের পরিকল্পনা নেওয়া যেতে পারে। বিভিন্ন ফসল উৎপাদনের ১০ শতাংশ কৃষকের নিকট থেকে সরাসরি সংগ্রহ করা উচিত। গত উৎপাদন মৌসুমে আলুর মূল্যে ধস ঠেকাতে অন্তর্বর্তী সরকার হিমাগার প্রান্তে আলুর সর্বনিম্ন মূল্য ২১ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছিল এবং ৫০ হাজার টন আলু কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তার কোনোটাই বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। এর পর আলুচাষিদের ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার জন্য মূল্য সমর্থন প্রদানের কথাও বলা হয়েছিল। কিন্তু তা বাস্তবায়ন না করেই বিদায় নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। এরূপ নিষ্কর্মা প্রতিশ্রুতি অর্থহীন।
কৃষি উন্নয়নের সঙ্গে পল্লী উন্নয়ন প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। সম্প্রতি কৃষিপণ্যের উৎপাদনে যে অগ্রগতি সাধিত হয়েছে তাতে সমবায় ও গ্রামীণ প্রতিষ্ঠানগুলোর সরাসরি সহায়তা রয়েছে। কৃষকদের সংগঠিত করা, উপকরণের জোগান দেওয়া, পানি সেচের ব্যবস্থা করা, ঋণের জোগান দেওয়া এবং কৃষিপণ্য বিপণনে সহায়তা করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে কৃষি সমবায়। চিরায়ত সমবায় বিভাগ এবং বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতে পারে ভবিষ্যতেও। বর্তমানে কৃষি খামারের আকার দ্রুত ছোট হয়ে যাচ্ছে। শতকরা প্রায় ৯২ শতাংশ কৃষকই এখন ছোট ও প্রান্তিক। এদের সংগঠিত করে উৎপদন দক্ষতা নিশ্চিত করার জন্য এবং পরিকল্পিতভাবে গ্রামের উন্নয়নের মাধ্যমে কৃষিজমি হ্রাস ঠেকানোর জন্য স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ সুফল বয়ে আনতে পারে। সম্প্রতি একজন জননন্দিত রাজনীতিক মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ওই মন্ত্রণালয়টির হাল ধরেছেন।
মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী এবং উপদেষ্টামণ্ডলী নিয়ে বর্তমান মন্ত্রিসভার আকার বেশ বড়। তাতে পরিচালন ব্যয় কম নয়। দেশের নাজুক অর্থনীতির প্রেক্ষাপট বিবেচনায় সরকার পরিচালন ব্যয় যথাসম্ভব নিয়ন্ত্রণে রাখা উচিত। পুরনো কর্মচারীদের বেতন-ভাতা সীমিত রেখে নতুন কর্মসংস্থানে অধিক মনোনিবেশ করা উচিত। দীর্ঘ দিন ধরে চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আঁটসাঁট মুদ্রা ও রাজস্বনীতি অনুসরণ করা উচিত। অনুৎপাদনশীল খাতে বেশি বিনিয়োগ করা উচিত। একটি গণতান্ত্রিক সরকারের নেতৃত্বে সামনের দিনগুলোতে উন্নত ও নিরাপদ জীবন যাপনের প্রত্যাশা করছে দেশের সাধারণ মানুষ। এ লক্ষ্য অর্জনে নতুন সরকারের সাফল্য কামনা করছি।
ড. জাহাঙ্গীর আলম
কৃষি অর্থনীতিবিদ ও সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট