× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

দ্রব্যমূল্য

রমজানে নিত্যপণ্যের বাজারের বৈপরীত্য

জাকির হোসেন

প্রকাশ : ০৩ মার্চ ২০২৬ ১৩:৫৪ পিএম

রমজানে নিত্যপণ্যের বাজারের বৈপরীত্য

রমজান মাসে নিত্যপণ্যের বাজার একটি বৈপরীত্যের চিত্র তুলে ধরে। বিশ্বের অধিকাংশ মুসলিম দেশ যেখানে রমজানকে কেন্দ্র করে বাজারকে সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী করতে নানা উদ্যোগ নেয়, সেখানে বাংলাদেশের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সংযুক্ত আরব আমিরাতের খুচরা বিক্রেতারা যখন রমজান উপলক্ষে হাজার হাজার পণ্যে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দেয়, কাতার সরকার যখন এক হাজারেরও বেশি পণ্যের দাম কমিয়ে আনে, তখন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষকে বাজারে গিয়ে ঠিক উল্টো চিত্র দেখতে হয়। প্রতি কেজি ছোলা, মুড়ি, খেজুর, তেলের দাম হঠাৎ করেই লাফিয়ে বেড়ে যায়। প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক, বিশ্বের অন্যান্য দেশে রোজায় পণ্যের দাম কমে বা স্থিতিশীল থাকে, অথচ বাংলাদেশে তা বেড়ে যায় কেন? 

অন্যান্য দেশে রমজানকে শুধু আত্মশুদ্ধির মাস হিসেবে নয়, বরং অর্থনৈতিক সক্রিয়তার একটি সময় হিসেবেও দেখা হয়। পশ্চিমা বিশ্বে ক্রিসমাস যেমন বিপুল কেনাকাটার উৎসব, তেমনি মুসলিম বিশ্বে রমজান ও ঈদ হলো বিপণনের বড় মৌসুম। ব্যবসায়ীরা এই সময়ে চাহিদা বাড়ার সুযোগ কাজে লাগিয়ে বেশি মুনাফা করার পরিবর্তে বরং বেশি পরিমাণ পণ্য বিক্রির কৌশল নেয়। অর্থনীতির ভাষায়, এটাকে বলা হয় ‘কম মুনাফায় বেশি পরিমাণে পণ্য বিক্রি’।

এই কৌশলের মূল ভিত্তি হলো, উৎসবের সময়ে ভোক্তাদের আস্থা অর্জন এবং দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ে তোলা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সরকার ও ব্যবসায়ীরা একযোগে কাজ করে বাজারে স্থিতিশীলতা আনয়ন করে। কাতারের মতো দেশে সরাসরি সরকারি উদ্যোগে নিত্যপণ্যের দাম কমানো হয়। ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশেও রমজানের আগে থেকে বাজার ব্যবস্থাপনা জোরদার করা হয়, যাতে সরবরাহ শৃঙ্খল সচল থাকে এবং দাম নিয়ন্ত্রণে থাকে। অন্যদিকে, পশ্চিমা দেশগুলোতে ক্রিসমাসের সময় বিপণন প্রতিযোগিতা এতটাই তীব্র হয় যে ক্রেতারা ব্যাপক ছাড়ে পণ্য কিনতে পারেন। এসব দেশে উৎসব কেন্দ্র করে বাজারে যে গতি সঞ্চার হয়, তা থেকে লাভবান হন সবাই ক্রেতাও, বিক্রেতাও। 

সংযুক্ত আরব আমিরাতে সরকার রমজানের আগে নির্দিষ্ট খাদ্যপণ্যের দাম বাড়াতে হলে অনুমতি বাধ্যতামূলক করে। বড় সূপারমার্কেটগুলো চালু করে। ফলে চাল, আটা, তেল, চিনি, মুরগি ইত্যাদির দাম সাধারণত স্থিতিশীল থাকে। সৌদি আরবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বাজার মনিটরিং জোরদার করে। অতিরিক্ত মূল্য নিলে জরিমানা করা হয়। কাতারে সরকার নির্দিষ্ট নিত্যপণ্যের ওপর মূল্যসীমা নির্ধারণ করে। কো-অপারেটিভ মার্কেটগুলো রমজানে বিশেষ কম দামে পণ্য বিক্রি করে। ওমানে ভোক্তা সুরক্ষা কর্তৃপক্ষ নিয়মিত বাজার তদারকি করে। রমজানে মৌলিক খাদ্যপণ্যে মূল্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা থাকে।

বাংলাদেশে রমজানের বাজারের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে উৎসবের আগমনী বার্তার সঙ্গে সঙ্গেই বাড়তে থাকে নিত্যপণ্যের দাম। একই চিত্র দেখা গেছে ২০২৬ সালের রমজানের শুরুতে। ইফতারের অপরিহার্য উপাদান লেবুর দাম হালিতে ৮০ থেকে ১২০ টাকায় পৌঁছে যায়, যা এর আগের সপ্তাহে ছিল ২০-৪০ টাকা। বেগুনের মতো সাধারণ সবজির দাম কেজিতে ৬০ টাকা থেকে বেড়ে ৯০-১২০ টাকা হয়, কাঁচামরিচের দাম ২০০-২৪০ টাকা ছাড়িয়ে যায়।

শুধু লেবু-বেগুন নয়, ছোলা ১০০-১১০ টাকা, সয়াবিন তেল ১৯৫ টাকা, মোটা মসুর ডাল ১২০-১৩০ টাকা, দেশি পেঁয়াজ ৬০-৭০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। ব্রয়লার মুরগির দাম ২০০ টাকা ছুঁইছুঁই, ডজন ডিম ১১০-১২০ টাকা। সরকার ৪০ শতাংশ বেশি পণ্য আমদানির কথা জানালেও খুচরা বাজারে তার প্রভাব পড়েনি। 

রমজানে বাংলাদেশে পণ্যের দাম বাড়ার পেছনে কয়েকটি কাঠামোগত ও আচরণগত কারণ কাজ করে। দেশের বাজারের একটি বড় সমস্যা হলো অসাধু ব্যবসায়ীদের একটি শক্তিশালী মহল বা ‘সিন্ডিকেট’-এর উপস্থিতি। রমজানকে কেন্দ্র করে এই সিন্ডিকেট আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে। চাহিদা বাড়ার সুযোগকে পুঁজি করে তারা পণ্য মজুদ করে রাখে এবং বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দেয়। এতে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয় এবং দাম বেড়ে যায়। ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের সভাপতি এ এইচ এম শফিকুজ্জামান মনে করেন, অপরিকল্পিত আমদানি, দুর্বল মনিটরিং এবং ইচ্ছাকৃত কৃত্রিম সংকট তৈরি বাজার অস্থিরতার প্রধান কারণ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সার্বিক মুদ্রাস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশে, যা ২০২৫ সালের মে মাসের পর সর্বোচ্চ। খাদ্য মূদ্রাস্ফীতি ক্রমাগত বেড়ে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশে পৌঁছেছে। এর অর্থ হচ্ছে, রমজানের আগে থেকেই বাজারে পণ্যের দাম অস্বাভাবিক উচ্চমাত্রায় ছিল। 

বাংলাদেশে কৃষকের কাছ থেকে উৎপাদিত পণ্য ভোক্তার কাছে পৌঁছতে বেশ কয়েকটি স্তর অতিক্রম করে। প্রতিটি স্তরে ফড়িয়া, বেপারি ও আড়তদাররা পণ্যের সঙ্গে মুনাফা যোগ করেন। ফলে উৎপাদন পর্যায়ে কৃষক যেমন ন্যায্যমূল্য পান না, তেমনি খুচরা পর্যায়ে ভোক্তাকে অধিক মূল্য দিতে হয়। একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কৃষক হয়তো বেগুন ৪০ টাকা কেজি বিক্রি করছেন, অথচ রাজধানীর খুচরা বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ১৫০ টাকা কেজি দরে। এই বিশাল মূল্যের ব্যবধান সরবরাহ শৃঙ্খলের মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণ ও স্বচ্ছতার অভাবকেই নির্দেশ করে।

রমজানের বাজার নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রায়শই দেখা যায়, মনিটরিং কার্যক্রম শুধু কয়েকটি মোবাইল কোর্ট বা ভ্রাম্যমাণ আদালতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, যা টেকসই সমাধান দিতে ব্যর্থ হয়। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মতো সংস্থাগুলোর তৎপরতা বাড়ালেও তাদের দেওয়া জরিমানা বড় ব্যবসায়ীদের জন্য ‘ব্যবসায়িক খরচ’ মাত্র । বার বার একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি প্রমাণ করে যে বিদ্যমান শাস্তির কাঠামো ভয় দেখানোর জন্য যথেষ্ট নয়। 

প্রশ্ন উঠতে পারে, বিশ্ববাজার কি রমজানে বাংলাদেশের দাম বাড়ার পেছনে দায়ী? উত্তর হলো, আংশিকভাবে হলেও মূল কারণ এটি নয়। সত্যি কথা বলতে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আন্তর্জাতিক বাজারেও কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে। ভারতীয় রপ্তানিকারক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে চালের দাম ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে ১১ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে, যার একটি কারণ ছিল রমজানের আগে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার দেশগুলোর চাহিদা বৃদ্ধি । ইন্দোনেশিয়াতেও রমজানের আগে পাম অয়েলের দাম কিছুটা বেড়েছে।

কিন্তু বাংলাদেশে দাম বৃদ্ধির প্রকৃতি ও মাত্রা সম্পূর্ণ ভিন্ন। গাম্বিয়ার উদাহরণটি এখানে প্রাসঙ্গিক। সেখানেও রমজানে পণ্যের দাম বেড়েছে, তবে তার কারণ ছিল মূলত বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের তারতম্য ও প্রতিবেশী দেশ সেনেগাল থেকে পণ্য আমদানির খরচ বৃদ্ধি । বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব থাকলেও, মূল সমস্যা হলো অভ্যন্তরীণ বাজার ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা, সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা।

এই সমস্যার সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রথমত, সরকারকে আমদানি পরিকল্পনা রমজানের অন্তত তিন মাস আগেই চূড়ান্ত করতে হবে এবং মজুদের তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে, যাতে অসত্য তথ্য ও গুজব ছড়াতে না পারে। দ্বিতীয়ত, বাজার মনিটরিংকে আরও শক্তিশালী ও যুগোপযোগী করতে হবে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের পাশাপাশি প্রতিটি বাজারে স্থায়ী নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। সিন্ডিকেটের মূল হোতাদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে, যেমন লাইসেন্স বাতিল ও অর্থদণ্ড। 

সবচেয়ে বেশি জরুরি ভোক্তাদের সচেতন হওয়া। অপ্রয়োজনে মজুদদারি না করে প্রয়োজন অনুযায়ী কেনাকাটা করলে বাজারে কৃত্রিম চাহিদা সৃষ্টি হবে না। ইদানীং একটি প্রবণতা দেখা গেছে, ভ্রাম্যমাণ আদালত বা ভোক্তা অধিদপ্তর বাজার মনিটরিংয়ে গেলে ব্যবসায়ীরা তেড়ে আসে। তারা দোকানপাট বন্ধ করে চলে যায়। এই প্রবণতা দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বড় বাধা। সরকারকে এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিতে হবে।

সরকার পরিবর্তনের পর নতুন প্রধানমন্ত্রী বাজার নিয়ন্ত্রণের অঙ্গীকার করেছেন। ২০২৬ সালের রমজান তার জন্য প্রথম বড় পরীক্ষা। সুষ্ঠু পরিকল্পনা, কঠোর মনিটরিং ও সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে যদি বাজার স্থিতিশীল রাখা যায়, তাহলে হয়তো একদিন রমজানে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির এই দুঃস্বপ্ন থেকে মুক্তি মিলবে।


জাকির হোসেন

সাংবাদিক ও সংবাদ বিশ্লেষক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা