পর্যবেক্ষণ
ড. আলা উদ্দিন
প্রকাশ : ০১ মার্চ ২০২৬ ১৩:২৫ পিএম
বিদায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শুরু থেকেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্বরতদের রাতারাতি সরিয়ে/হটিয়ে ব্যাপক হারে নিয়োগ দিয়েছে, যা নিয়ে নানা সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সরকারি অফিস স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা এবং দেশের বাইরে মিশনগুলোতে উচ্চপদস্থ পদসহ নানা স্তরে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এমনকি অনেক অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকেও পুনরায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই নিয়োগগুলো কতটুকু যুক্তিসংগত, নিয়োগ যথাযথ পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে কি-না এবং উপযুক্ত ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে কি-না তা নিয়ে প্রশ্ন করার সুযোগ ছিল না অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে। মবের আক্রমণসহ নানাবিধ শঙ্কার কারণে কণ্ঠস্বর স্তব্ধ ছিল। এই পরিস্থিতিতে জাতীয় স্বার্থে নব নির্বাচিত সরকারের উচিত হবে এই নিয়োগগুলো পর্যালোচনা করা এবং যথোচিত ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
অন্তর্বর্তী সরকারের মূল দায়িত্ব ছিল একটি বিশেষ মুহূর্তে দেশ পরিচালনা করা এবং একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। কিন্তু তারা তাদের সীমিত সময়ে এবং সীমিত ম্যান্ডেটে ব্যাপক হারে নিয়োগ দিয়েছে, যা একটি অনির্বাচিত সরকারের জন্য স্বাভাবিক নয়। সাধারণত অন্তর্বর্তী সরকার জরুরি এবং প্রয়োজনীয় নিয়োগ ছাড়া অন্য নিয়োগ দেয় না, কারণ এসব সিদ্ধান্ত নির্বাচিত সরকারের জন্য রেখে দেওয়া হয়।
কিন্তু বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকার এই প্রথা ভেঙে ব্যাপক হারে
নিয়োগ দিয়েছে, যা পরবর্তী নির্বাচিত সরকারকে বাধ্যবাধকতায় ফেলবে। এই
নিয়োগগুলোর মধ্যে কতগুলো প্রকৃতপক্ষে প্রয়োজনীয় ছিল এবং কতগুলো রাজনৈতিক বা
ব্যক্তিগত বিবেচনায় করা হয়েছে তা পরীক্ষা করা জরুরি। নিয়োগের স্বচ্ছতা এবং
যোগ্যতার ভিত্তি নিশ্চিত করা সুশাসনের জন্য অত্যাবশ্যক।
বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ব্যাপক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগ অত্যন্ত সংবেদনশীল কারণ এটি দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে প্রভাবিত করে। যোগ্য এবং দক্ষ শিক্ষকদের নিয়োগ দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু যদি নিয়োগ রাজনৈতিক বিবেচনায় হয় তাহলে শিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ রয়েছে যে যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্য বা ব্যক্তিগত সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দ্র্রুততার সঙ্গে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য-সহউপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
সেগুলো
সার্বিক মূল্যায়নে যথাযথ হয়েছে কি না তা পরীক্ষা করা প্রয়োজন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের
স্বায়ত্তশাসন রক্ষা করা এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত রাখা জাতির স্বার্থে
জরুরি।
সরকারি অফিস এবং স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলোতেও ব্যাপক নিয়োগ হয়েছে, যার মধ্যে অনেক উচ্চপদস্থ পদ রয়েছে। সচিব, অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পুনরায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পুনরায় নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি বিতর্কিত, কারণ এটি তরুণ এবং যোগ্য কর্মকর্তাদের পদোন্নতির সুযোগ কমিয়ে দেয়। স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলোর চেয়ারম্যান এবং পরিচালক পদে নিয়োগ কতটুকু স্বচ্ছ পদ্ধতিতে হয়েছে এবং নিয়োগপ্রাপ্তদের যোগ্যতা এবং অভিজ্ঞতা কতটুকু তা পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
এই পদগুলো দেশের অর্থনীতি এবং উন্নয়নে
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং তাই যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া অত্যাবশ্যক।
অযোগ্য বা অনভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়োগ দিলে প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত
হয় এবং জাতীয় স্বার্থ বিঘ্নিত হয়।
বিদেশে বাংলাদেশের মিশনগুলোতেও রাষ্ট্রদূত এবং অন্যান্য কূটনৈতিক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে। কূটনীতিক নিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি দেশের পররাষ্ট্রনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করে। রাষ্ট্রদূত এবং কূটনীতিকদের যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা এবং দক্ষতা থাকা অত্যাবশ্যক, কারণ তারা বিদেশে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন।
কিন্তু যদি নিয়োগ
রাজনৈতিক পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হয় এবং যোগ্যতার বিচার না করা হয় তাহলে দেশের
স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, রাজনৈতিক বিবেচনায় এবং
আনুগত্যের ভিত্তিতে কূটনীতিক নিয়োগ দেওয়া হয়, যা দেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত
করে। নবগঠিত সরকারের উচিত হবে কূটনীতিক নিয়োগগুলো পর্যালোচনা করা এবং যোগ্য
ব্যক্তিদের নিয়োগ নিশ্চিত করা, যাতে দেশের স্বার্থ রক্ষিত হয়।
গণমাধ্যম খাতে অনেক পত্রিকা অফিস এবং টেলিভিশন চ্যানেল দখল বা নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তন হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে। কিছু গণমাধ্যম সংগঠন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং কিছু নতুন নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের অন্যতম স্তম্ভ এবং এটি রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যদি গণমাধ্যম রাজনৈতিক বিবেচনায় দখল বা নিয়ন্ত্রণ করা হয়, তা হলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তথ্যের প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়।
গণমাধ্যম
প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে এবং কার নিয়ন্ত্রণে গেছে এবং সেখানে নিয়োগ কীভাবে হয়েছে
তা পরীক্ষা করা প্রয়োজন। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং তথ্যের স্বাধীন
প্রবাহ রক্ষা করা গণতন্ত্রের জন্য অত্যাবশ্যক। নবগঠিত সরকারকে গণমাধ্যম খাতে যা
ঘটেছে তা পর্যালোচনা করতে হবে এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পদক্ষেপ নিতে
হবে।
নিয়োগ পর্যালোচনার জন্য একটি স্বাধীন এবং নিরপেক্ষ কমিশন গঠন করা প্রয়োজন, যা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে হওয়া সকল নিয়োগ পরীক্ষা করবে। কমিশনের কাজ হবে প্রতিটি নিয়োগের যোগ্যতা পদ্ধতি এবং প্রয়োজনীয়তা মূল্যায়ন করা।
যদি দেখা যায় যেকোনো নিয়োগ অযোগ্য ব্যক্তিকে দেওয়া হয়েছে বা যথাযথ পদ্ধতি
অনুসরণ করা হয়নি তাহলে সেই নিয়োগ বাতিল বা পুনর্বিবেচনা করার সুপারিশ করতে হবে।
কমিশনকে স্বচ্ছভাবে কাজ করতে হবে এবং প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। এই
পর্যালোচনা শুধু অন্তর্বর্তী সরকারের নিয়োগের ক্ষেত্রেই নয়, বরং ভবিষ্যতে যেকোনো
সরকারের নিয়োগের জন্য একটি নজির সৃষ্টি করবে। পর্যালোচনার মাধ্যমে যোগ্যতাভিত্তিক
নিয়োগ সংস্কৃতি গড়ে তোলা সম্ভব এবং রাজনৈতিক নিয়োগের প্রবণতা কমানো যাবে।
দলীয় সরকারের সময়ে কিছু দলীয় নিয়োগ হবেÑ এটি বাংলাদেশের
রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে। বাস্তবতা হলো, প্রতিটি নির্বাচিত সরকার তাদের
দলের কিছু লোককে নিয়োগ দেয় এবং এটি সম্পূর্ণভাবে এড়ানো কঠিন। কিন্তু
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই নিয়োগগুলো যেন উপযুক্ত, যথাযথ এবং নিয়ম অনুযায়ী হয়।
দলীয় নিয়োগ মানে এই নয় যে অযোগ্য ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া হবে। দলের মধ্যেও
যোগ্য এবং দক্ষ ব্যক্তিরা থাকে এবং তাদের নিয়োগ দিলে সমস্যা নেই। সমস্যা হলো যখন
শুধুমাত্র আনুগত্যের ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং যোগ্যতা উপেক্ষা করা হয়।
নবগঠিত সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যে তাদের নিয়োগগুলো স্বচ্ছ এবং যোগ্যতাভিত্তিক
হয় এবং প্রতিষ্ঠিত নিয়ম এবং পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। এটি করলে নিয়োগ নিয়ে
প্রশ্ন উঠবে না এবং জনগণের আস্থা অর্জিত হবে।
এই বিষয়গুলো বিবেচনায় না নিলে দেশের অগ্রগতি কঠিন হয়ে যাবে। যোগ্য ব্যক্তিদের সঠিক জায়গায় নিয়োগ দেওয়া উন্নয়নের পূর্বশর্ত। যদি অযোগ্য বা অনভিজ্ঞ ব্যক্তিরা গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকেন তাহলে প্রতিষ্ঠানগুলো সঠিকভাবে কাজ করতে পারবে না এবং উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং পররাষ্ট্রনীতিসহ সব ক্ষেত্রে যোগ্য নেতৃত্ব প্রয়োজন। বাংলাদেশ এখন ৫৫ বছর পেরিয়ে এসেছে এবং আর স্থবির থাকার সুযোগ নেই। দেশকে এগিয়ে নিতে হলে যোগ্যতাভিত্তিক নিয়োগ এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়ার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে এবং যোগ্যতা এবং দক্ষতাকে প্রাধান্য দিতে হবে।
এটি করতে পারলে দেশ দ্রুত অগ্রগতি করবে এবং উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে।
ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করে এগিয়ে যাওয়ার কোনো বিকল্প নেই। নবগঠিত নির্বাচিত সরকারের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে এবং তাদের সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের নিয়োগ পর্যালোচনা করা একটি কঠিন কিন্তু প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। এটি করতে গিয়ে রাজনৈতিক চাপ এবং বিরোধিতার মুখোমুখি হতে হবে কিন্তু জাতীয় স্বার্থে এই পদক্ষেপ নিতেই হবে। পর্যালোচনার মাধ্যমে যেসব নিয়োগ অনিয়ম বা অযোগ্যতার ভিত্তিতে হয়েছে সেগুলো সংশোধন করতে হবে এবং যোগ্য ব্যক্তিদের সুযোগ দিতে হবে।
একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যেন এমন ঘটনা না ঘটে তার জন্য শক্তিশালী
নিয়োগ ব্যবস্থা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। জনসেবা কমিশনকে শক্তিশালী করতে
হবে এবং সব নিয়োগে তাদের ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে। স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা
প্রতিষ্ঠিত হলে নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক কমবে এবং যোগ্যতাভিত্তিক সংস্কৃতি গড়ে উঠবে।
জাতীয় স্বার্থে নিয়োগ পর্যালোচনা এবং সংস্কার একটি জরুরি পদক্ষেপ, যা নবগঠিত সরকারকে নিতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যেসব নিয়োগ অস্বচ্ছভাবে এবং অযোগ্য ব্যক্তিদের দেওয়া হয়েছে সেগুলো পর্যালোচনা করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনী পদক্ষেপ নিতে হবে।
গণমাধ্যম খাতে যা ঘটেছে তার সুষ্ঠু তদন্ত করতে হবে এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে যোগ্য নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে হবে। কূটনীতিক নিয়োগগুলো পর্যালোচনা করে দেশের স্বার্থ রক্ষা করতে হবে। এসব পদক্ষেপ নিলে দেশ সঠিক পথে এগিয়ে যাবে এবং উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকবে। বাংলাদেশ আর স্থবির থাকতে পারে না। মেধা ও যোগ্যতাভিত্তিক নিয়োগ এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা করে এগিয়ে যাওয়ার কোনো বিকল্প নেই।
অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়