× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

আইনের শাসন

ভুয়া মামলার সংস্কৃতি ভাঙতে দৃঢ় প্রয়োগ জরুরি

হাবিব বাবুল

প্রকাশ : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:৪৭ এএম

ভুয়া মামলার সংস্কৃতি ভাঙতে দৃঢ় প্রয়োগ জরুরি

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোয় এক নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নটি আবারও কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে দায়ের হওয়া মামলাগুলো পুনরায় যাচাই-বাছাই করতে পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে নিরীহ মানুষ হয়রানির শিকার না হন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং সুবিধাবাদী চক্রের অপব্যবহার বন্ধ করা।

এই সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। কারণ রাজনৈতিক পালাবদলের পর বাংলাদেশে প্রতিশোধমূলক মামলা, গণহারে আসামি করা এবং সামাজিক প্রতিপক্ষকে আইনি জালে ফাঁসানোর প্রবণতা নতুন কিছু নয়। অতীতে বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিরোধী মতের মানুষদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের, গ্রেপ্তার এবং দীর্ঘদিন বিচারাধীন অবস্থায় রাখার নজির রয়েছে। ফলে বিচারব্যবস্থা অনেক সময় রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছেÑ এমন অভিযোগও বার বার উঠেছে।

৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়েও বিভিন্ন পেশার মানুষÑ ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, রাজনৈতিক কর্মী এমনকি সাধারণ নাগরিকদের নামেও মামলা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যদি সত্যিই কোনো অসাধু গোষ্ঠী রাজনৈতিক সুযোগ নিয়ে ব্যক্তিগত শত্রুতা বা প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে মামলা করে থাকে, তবে তা শুধু অন্যায় নয়, রাষ্ট্রের আইনি কাঠামোর প্রতি গভীর আঘাত। নিরপরাধ কেউ যদি মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার হন, মাসের পর মাস কিংবা বছরের পর বছর কারাভোগ করেন, সামাজিকভাবে হেয় হন, তবে সেই ক্ষতি শুধু ব্যক্তির নয়, রাষ্ট্রেরও।

আইনের শাসনের মৌলিক ভিত্তি হলো আইন সবার জন্য সমান এবং তা ন্যায়সঙ্গতভাবে প্রয়োগ করতে হবে। যদি আইনকে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করা হয়, তাহলে নাগরিকের রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা ভেঙে পড়ে। এই আস্থা একবার নষ্ট হলে তা পুনর্গঠন করা অত্যন্ত কঠিন। তাই মামলাগুলোর পুনরায় যাচাই-বাছাই কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি রাষ্ট্রীয় নৈতিকতার প্রশ্ন।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জবাবদিহিতা। শুধু মামলা পুনর্বিবেচনা করলেই হবে না; যারা জেনেশুনে ভুয়া বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা করেছেন, তাদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় ভুয়া মামলার সংস্কৃতি বন্ধ হবে না। বরং ভবিষ্যতেও রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে একই চক্র সক্রিয় হয়ে উঠবে।

বাংলাদেশের দণ্ডবিধি ও ফৌজদারি কার্যবিধিতে মিথ্যা অভিযোগের বিরুদ্ধে কিছু বিধান থাকলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ খুবই সীমিত। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভুয়া মামলার বাদী কোনো শাস্তির মুখোমুখি হন না। ফলে এক ধরনের দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। এই সংস্কৃতি ভাঙতে হলে আইনকে কার্যকর করতে হবে এবং প্রয়োজনে আরও কঠোর ও সুস্পষ্ট বিধান যুক্ত করতে হবে।

এ ক্ষেত্রে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা শিক্ষণীয় হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে জার্মানির কথা বলা যায়। জার্মানিতে মিথ্যা অভিযোগ বা অন্যের বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃতভাবে অপরাধ আরোপ করলে তা গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। জার্মান ফৌজদারি আইনে এমন বিধান রয়েছে, যেখানে প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত ব্যক্তির কারাদণ্ড কিংবা অর্থদণ্ড হতে পারে। অর্থাৎ সেখানে রাষ্ট্র শুধু নিরপরাধকে মুক্তি দেয় না; বরং মিথ্যা অভিযোগকারীকে আইনের আওতায় আনে। ফলে নাগরিকরা মামলা করার আগে দায়িত্বশীল আচরণ করতে বাধ্য হন।

বাংলাদেশেও যদি এ ধরনের কার্যকর বিধান কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হয়, তবে ভুয়া মামলার প্রবণতা অনেকটাই কমে আসবে। তবে আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়; প্রয়োগই মুখ্য। বিচার বিভাগ, পুলিশ প্রশাসন এবং প্রসিকিউশনÑ সবাইকে নিরপেক্ষ ও পেশাদার আচরণ নিশ্চিত করতে হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যে বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনাও পুনঃতদন্তের কথা বলেছেন, সেটিও তাৎপর্যপূর্ণ। ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারির সেই রক্তাক্ত অধ্যায় দেশের ইতিহাসে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। দীর্ঘদিন ধরে ওই ঘটনার তদন্ত ও বিচার নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে। পুনঃতদন্তের উদ্যোগ যদি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে পরিচালিত হয়, তবে তা ইতিহাসের দায় মেটাতে সহায়ক হতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত তদন্ত অপরিহার্য।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে আইনি প্রতিশোধে রূপ না দেওয়া। নতুন সরকার যদি সত্যিই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়, তবে তাকে কয়েকটি স্পষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে।

প্রথমত, ৫ আগস্ট-পরবর্তী সব মামলার একটি স্বচ্ছ পর্যালোচনা প্রক্রিয়া গড়ে তুলতে হবে। প্রয়োজনে বিচারক, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের নিয়ে স্বাধীন রিভিউ বোর্ড গঠন করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, যেসব মামলায় স্পষ্টভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা ভিত্তিহীন অভিযোগ পাওয়া যাবে, সেগুলো দ্রুত খারিজ করতে হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের আইনি সহায়তা দিতে হবে। তৃতীয়ত, প্রমাণিত ভুয়া মামলাকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। এতে ভবিষ্যতে কেউ রাজনৈতিক সুবিধা বা ব্যক্তিগত শত্রুতার কারণে আইনের অপব্যবহার করতে সাহস পাবে না। চতুর্থত, পুলিশ প্রশাসনের সক্ষমতা ও পেশাদারত্ব বাড়াতে প্রশিক্ষণ ও নজরদারি জোরদার করতে হবে, যাতে প্রাথমিক তদন্তেই দুর্বল ও অসঙ্গতিপূর্ণ মামলা চিহ্নিত করা যায়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলোÑ রাজনৈতিক নেতৃত্বের সদিচ্ছা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অনেক সময় রাজনৈতিক ইঙ্গিতের দিকে তাকিয়ে কাজ করে। যদি শীর্ষ নেতৃত্ব স্পষ্ট বার্তা দেয় যেকোনো ধরনের প্রতিহিংসামূলক মামলা বরদাস্ত করা হবে না, তবে মাঠপর্যায়ে তার প্রভাব পড়বে।

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা বহু বাধাবিপত্তির মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। প্রতিবার রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর যদি একইভাবে মামলা-গ্রেপ্তার-হয়রানির চক্র ঘুরেফিরে আসে, তবে গণতন্ত্র কখনোই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে না। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা মানে শুধু বিরোধীকে দমন না করা নয়; বরং ক্ষমতাসীনদের সমর্থকদেরও আইনের ঊর্ধ্বে না রাখা।

আজ প্রয়োজন একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে কোনো নিরপরাধ মানুষ রাজনৈতিক পালাবদলের বলি হবেন না। ৫ আগস্ট-পরবর্তী মামলাগুলোর পুনঃযাচাই সেই লক্ষ্যপূরণের একটি সূচনা হতে পারে। তবে এই উদ্যোগ যেন কেবল ঘোষণায় সীমাবদ্ধ না থাকেÑ তা নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।

ভুয়া মামলার সংস্কৃতি ভাঙতে হলে রাষ্ট্রকে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে : আইন প্রতিশোধের হাতিয়ার নয়, ন্যায়বিচারের মাধ্যম। আর সেই বার্তাই হতে পারে নতুন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পুনর্জাগরণের ভিত্তি।


হাবিব বাবুল

জার্মানভিত্তিক সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা