× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সামাজিক নিরাপত্তা

নিরাপদ নারী মানেই নিরাপদ সমাজ

মতি লাল দেব রায়

প্রকাশ : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১২:৪৮ পিএম

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নারীদের বিরুদ্ধে কটূক্তি, ভুয়া ছবি ছড়ানো কিংবা ব্ল্যাকমেলের ঘটনা বাড়ছে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নারীদের বিরুদ্ধে কটূক্তি, ভুয়া ছবি ছড়ানো কিংবা ব্ল্যাকমেলের ঘটনা বাড়ছে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

সমাজের সকল ক্ষেত্রে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্বÑ এ কথা অনস্বীকার্য। একটি সভ্য সমাজের অগ্রগতির অন্যতম সূচক হলো নারীর স্বাধীন ও নিরাপদ চলাচল। যে সমাজে মেয়েরা নির্ভয়ে স্কুল-কলেজ, কর্মক্ষেত্র, বাজার কিংবা বিনোদনস্থলে যেতে পারে না, সেই সমাজ কখনোই প্রকৃত অর্থে উন্নত হতে পারে না। বাংলাদেশ আজ অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকে অনেক দূর এগিয়েছে, কিন্তু নারীর নিরাপদ চলাচলের প্রশ্নে এখনও নানা শঙ্কা ও চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। তাই সময়ের দাবিÑ মেয়েদের জন্য একটি কার্যকর ও টেকসই নিরাপত্তা বেষ্টনী গড়ে তোলা।

প্রতিদিন গণপরিবহন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র কিংবা অনলাইন প্লাটফর্মে নারীরা হয়রানি ও সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। অনেক ঘটনা প্রকাশ পায় না সামাজিক লজ্জা, ভয় বা বিচারহীনতার আশঙ্কায়। আইন থাকলেও তার প্রয়োগে ঘাটতি, তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা এবং অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত না হওয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ফলে নারীরা আত্মবিশ্বাস হারান, পরিবারগুলো উদ্বিগ্ন থাকে আর সমাজে এক ধরনের অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি হয়।

বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে বিভিন্ন আইন রয়েছে, যেমন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও বিশেষ সেল গঠন করেছে। তবু বাস্তবতা হলোÑ আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত না হলে অপরাধ কমানো সম্ভব নয়। অপরাধীদের জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন অপরাধ করার সাহস না পায়।

গণপরিবহনে নারীদের নিরাপত্তা একটি বড় ইস্যু। বাসে, ট্রেনে কিংবা লঞ্চে প্রায়ই শ্লীলতাহানি ও উত্ত্যক্ত করার অভিযোগ ওঠে। সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, নারী পুলিশের সংখ্যা বৃদ্ধি, নির্দিষ্ট অভিযোগ ব্যবস্থা চালু এবং চালক-সহকারীদের বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে। পাশাপাশি দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর জন্য জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এর কার্যকারিতা আরও জোরদার করতে হবে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন জরুরি। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেই অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্তের জন্য নিরপেক্ষ কমিটি থাকতে হবে। শিক্ষার্থীদের সচেতন করতে পাঠ্যক্রমে লিঙ্গসমতা, নৈতিকতা ও পারস্পরিক সম্মানের শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। ছোটবেলা থেকেই ছেলে ও মেয়েদের মধ্যে সম্মানবোধ গড়ে তুলতে পরিবার ও সমাজের ভূমিকা অপরিসীম।

কর্মক্ষেত্রে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অনেক নারী কর্মজীবী হয়েও হয়রানির শিকার হন কিন্তু চাকরি হারানোর ভয় বা সামাজিক চাপের কারণে অভিযোগ করেন না। কর্মক্ষেত্রে সিসিটিভি, অভ্যন্তরীণ অভিযোগ সেল এবং হয়রানি প্রতিরোধ নীতিমালা বাধ্যতামূলক করতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ বিষয়ে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।

অনলাইন নিরাপত্তাও এখন বড় চ্যালেঞ্জ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নারীদের বিরুদ্ধে কটূক্তি, ভুয়া ছবি ছড়ানো কিংবা ব্ল্যাকমেলের ঘটনা বাড়ছে। সাইবার অপরাধ দমনে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো এবং দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে নারীদের ডিজিটাল নিরাপত্তা বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বৃদ্ধি প্রয়োজন।

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো মানসিকতার পরিবর্তন। নারীকে ভোগের বস্তু নয়, একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে হবে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মস্থলে, ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠন বা প্রতিষ্ঠান সকলের সমন্বিত প্রচেষ্টায় একটি নিরাপদ সমাজ সৃষ্টি সম্ভব। শুধু আইন নয়, সামাজিক প্রতিরোধও হতে হবে শক্তিশালী।কিন্তু একই সঙ্গে এটিও সত্য, নারীরা যদি নিজেরা সচেতন, আত্মবিশ্বাসী ও প্রতিরোধী হয়ে ওঠেন, তবে নিরাপত্তা বেষ্টনী আরও শক্তিশালী হয়। সচেতনতা ও আত্মরক্ষার মানসিকতা অনেক অপরাধের আগেই ঝুঁকি কমিয়ে দিতে পারে।

প্রথমত, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতনতা জরুরি। কোথায় যাচ্ছেন, কীভাবে যাচ্ছেন, জরুরি প্রয়োজনে কাকে জানাবেনÑ এই বিষয়গুলো আগেভাগে পরিকল্পনা করা নিরাপত্তা বাড়ায়। সন্দেহজনক পরিস্থিতি এড়িয়ে চলা, জরুরি নম্বর মুখস্থ রাখা এবং প্রয়োজনে দ্রুত সহায়তা চাওয়া গুরুত্বপূর্ণ।  দ্বিতীয়ত, আইনি অধিকার সম্পর্কে জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। দেশে নারীর সুরক্ষায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনসহ একাধিক আইন রয়েছে। কিন্তু অনেক নারী জানেন না কখন এবং কীভাবে অভিযোগ করতে হয়। আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হলে ভুক্তভোগীকেই প্রথম পদক্ষেপ নিতে হয়। তাই আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে ধারণা থাকা ক্ষমতায়নের অংশ। তৃতীয়ত, আত্মরক্ষার কৌশল শেখা কার্যকর হতে পারে। আত্মরক্ষামূলক প্রশিক্ষণ শুধু শারীরিক সক্ষমতা বাড়ায় না, মানসিক দৃঢ়তাও তৈরি করে। আত্মবিশ্বাসী ও দৃঢ়চেতা আচরণ অনেক সময় সম্ভাব্য অপরাধীকে নিরুৎসাহিত করে। একই সঙ্গে মোবাইল অ্যাপ, লোকেশন শেয়ারিং ও নিরাপত্তা অ্যালার্ট ব্যবস্থার ব্যবহারও সহায়ক হতে পারে। চতুর্থত, সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা জরুরি। নারীরা একে অপরের পাশে দাঁড়ালে এবং হয়রানির বিরুদ্ধে সরব হলে অপরাধীদের জন্য জায়গা সংকুচিত হয়। কর্মক্ষেত্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা গণপরিবহনে অনৈতিক আচরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে। নীরবতা অপরাধকে উৎসাহ দেয়Ñ প্রতিবাদ সেটিকে প্রতিরোধ করে।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য বজায় রাখা প্রয়োজন। নারীর সচেতনতা ও প্রতিরোধী মানসিকতার কথা বলতে গিয়ে যেন দায়িত্বের বোঝা কেবল নারীর কাঁধে না পড়ে। নিরাপত্তাহীনতার দায় কখনোই ভুক্তভোগীর নয়। রাষ্ট্র, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, পরিবার ও সমাজের দায়িত্ব অপরিবর্তিত থাকবে। নারীর আত্মসচেতনতা এই দায়িত্বকে সম্পূরক করবে, প্রতিস্থাপন নয়।

আসলে নিরাপদ সমাজ গঠনে দ্বিমুখী প্রচেষ্টা প্রয়োজনÑ একদিকে শক্তিশালী আইন ও সামাজিক জবাবদিহিতা, অন্যদিকে নারীর আত্মবিশ্বাস, সচেতনতা ও প্রতিরোধী মানসিকতা। নারীরা যদি নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ান, তবে নিরাপত্তা কেবল একটি দাবি নয়, বাস্তবতায় রূপ নিতে পারে। সচেতন নারীই পারে নিজের শক্তি হয়ে উঠতেÑ আর সেই শক্তিই গড়ে তুলবে নিরাপদ আগামী।

তারপরও বলব, নারীর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা কেবল নারীর অধিকার নয়; এটি রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব। মেয়েরা যদি নিরাপদ না থাকে, তবে উন্নয়নের সব অর্জনই অর্থহীন হয়ে পড়বে। তাই এখনই সময়Ñ মেয়েদের জন্য দৃশ্যমান, কার্যকর ও টেকসই নিরাপত্তা বেষ্টনী গড়ে তোলার। নিরাপদ নারী মানেই নিরাপদ সমাজ, আর নিরাপদ সমাজই পারে উন্নত বাংলাদেশ গড়তে।


মতি লাল দেব রায়

কলাম লেখক ও সমাজ সংগঠক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা