× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

প্রজন্মের ভাবনা

স্লোগান নাকি বাস্তবতা

ওরাইনা খাঁন চৌধুরী

প্রকাশ : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:৪৩ এএম

 স্লোগান নাকি বাস্তবতা

‘গাছ লাগাও, প্রাণ বাঁচাও’ বহু বছর ধরে প্রতিটি পরিবেশ-সচেতন আবেদন, সরকারি কর্মসূচি, ক্যাম্পেইন ও সচেতনতার প্রচারে এই স্লোগান বারবার উঠে এসেছে। টেলিভিশনের প্রচারণায়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, স্কুল-কলেজের দেয়ালে এবং নাগরিকদের মুখে প্রায়ই শোনা যায় এই কথাগুলো। কিন্তু বাস্তবতা কি সত্যিই সেই অনুপাতে? আমরা কি সত্যিই গাছ লাগাচ্ছি, আর পর্যাপ্তভাবে গাছের যত্ন নিচ্ছি? নাকি গাছ লাগানোর খেতাবের আড়ালে বরং বোনাস হিসেবেই গাছ কাটা হচ্ছে বেশি? চলুন আজ সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে দেখা যাক।

বাংলাদেশ একটি ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। এখানে তুলনামূলক কম ভূমির ওপর মানুষের চাপ, কৃষি সম্প্রসারণ, শিল্পকারখানা স্থাপন এবং নগরায়ণের কারণে জমির চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলেছে। এর প্রভাব পড়ছে দেশের প্রাকৃতিক বনভূমি, গ্রামাঞ্চলের গাছপালা ও নদীকূলের অরণ্যের ওপর। 

পরিবেশবিদদের মতে, একটি দেশের মোট ভূখণ্ডের অন্তত ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা উচিত, যা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, ভূমিক্ষয় প্রতিরোধ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে সহায়ক। কিন্তু বর্তমান সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশের বনভূমির পরিমাণ মাত্র ১৫.৫৮ শতাংশ। অর্থাৎ প্রয়োজনের তুলনায় আমরা অনেকটাই পিছিয়ে আছি। বেশিরভাগ মানুষ ‘গাছ লাগানো’ বলতে বোঝেন জাতীয় উদ্যান, পার্ক কিংবা স্কুল মাঠে কয়েকটি চারা রোপণ করা।

কিন্তু সত্যিকার অর্থে কি আমরা গাছ লাগাচ্ছি? আর সেই লাগানো গাছগুলো কি টিকে আছে? বাস্তবে দেখা যায়, নতুন লাগানো গাছের বড় একটি অংশই দুই-তিন বছরের মধ্যে শুকিয়ে যায় বা অযত্নে মারা পড়ে। অনেক সময় গাছ লাগানো হয় শুধু আনুষ্ঠানিকতা বা ছবি তোলার জন্য; পরে নিয়মিত পানি দেওয়া, পরিচর্যা করা কিংবা সুরক্ষার দায়িত্ব আর নেওয়া হয় না। এখানেই মূল প্রশ্নÑ আমরা কি গাছ লাগাচ্ছি, নাকি শুধু গাছ লাগানোর অভিনয় করছি? 

বাসাবাড়ির আঙিনা, রাস্তার পাশ বা খোলা জায়গায় গাছ লাগানোর আগ্রহ থাকলেও সঠিক পরিকল্পনা, উপযুক্ত জাত নির্বাচন, নিয়মিত নজরদারি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার অভাবে অনেক গাছ বড় হওয়ার আগেই নষ্ট হয়ে যায়। ফলে পরিবেশ রক্ষার উদ্দেশ্যে নেওয়া উদ্যোগগুলো প্রত্যাশিত ফল দিতে পারে না। অন্যদিকে, বর্তমান সময়ে গাছ কাটার হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। জীবিকা নির্বাহের জন্য অনেক পরিবার বন উজাড় করে বা গাছ কেটে কাঠ বিক্রি করে। কৃষিজমি সম্প্রসারণ, সড়ক ও অবকাঠামো নির্মাণ, ইটভাটা ও শিল্পকারখানা স্থাপনের চাপ বনভূমি ধ্বংসের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু বনাঞ্চলেই নয়, গ্রাম ও শহরের ভেতরের বড় গাছগুলোও অনেক সময় বাড়ি নির্মাণ বা জমির মূল্য বাড়ানোর জন্য কেটে ফেলা হয়। গাছ কাটার পেছনে অর্থনৈতিক চাপ ও স্বল্পমেয়াদি লাভের মানসিকতাও বড় ভূমিকা রাখছে। অনেক সময় নিয়মের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে বা অবৈধভাবে গাছ কেটে নেওয়া হয়। কিন্তু এর প্রভাব পড়ে পুরো সমাজের ওপর।

গাছ কমে গেলে বায়ুদূষণ বাড়ে, গ্রীষ্মে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়, বন্যা ও খরার ঝুঁকি বাড়ে এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যায়। পরিবেশবিদদের মতে, বনভূমি কমে যাওয়ার ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব আরও তীব্র হয়। বনভূমি মাটির ক্ষয় রোধ করে, পানি সংরক্ষণে সহায়তা করে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি কমাতে ভূমিকা রাখে। বন ধ্বংসের সঙ্গে সঙ্গে বন্যপ্রাণী ও নানা প্রজাতির উদ্ভিদ-পাখি তাদের আবাসস্থল হারাচ্ছে, যা জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় হুমকি। বাংলাদেশে বনভূমি কমে যাওয়ার এই বাস্তবতা উপেক্ষা করলে ভবিষ্যতে পরিবেশগত সংকট আরও গভীর হবে। পর্যাপ্ত গাছ না থাকলে বাতাসের মান খারাপ হবে, মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়বে এবং শহর ও গ্রাম উভয় জায়গাতেই বসবাস কঠিন হয়ে উঠবে। তাই ‘গাছ লাগাও, প্রাণ বাঁচাও’ যেন শুধু স্লোগান হয়েই না থাকে এটি বাস্তব উদ্যোগে রূপ দিতে হবে। গাছ লাগানোকে হতে হবে পরিকল্পিত ও দীর্ঘমেয়াদি। লাগানো গাছের নিয়মিত যত্ন, পানি দেওয়া ও সুরক্ষার দায়িত্ব নিতে হবে। স্থানীয় পরিবেশের উপযোগী গাছ নির্বাচন করা জরুরি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি সংস্থা, এনজিও ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগেই টেকসইভাবে সবুজায়ন সম্ভব। শুধু পোস্টার বা প্রচারণায় সীমাবদ্ধ না থেকে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে পরিবেশবান্ধব অভ্যাস গড়ে তুলতে হবেÑ বাড়ির সামনে বা ছাদে গাছ লাগানো, অযথা কাগজ অপচয় কমানো, বর্জ্য পুনর্ব্যবহার করা, পরিবহনে সচেতন হওয়াÑ এসব ছোট উদ্যোগ মিলেই বড় পরিবর্তন আনে।

গাছ লাগানো মানে শুধু চারা পুঁতে ছবি তোলা নয়; প্রকৃত অর্থে তা হলো গাছকে বড় করে তোলা, তাকে বাঁচিয়ে রাখা এবং পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ গড়ে তোলা। গাছ শুধু আমাদের শ্বাস নেওয়ার সুযোগ দেয় না; আমাদের জল, বায়ু, জীববৈচিত্র্য ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আজ আমরা যে সিদ্ধান্ত নেব, তার ফল ভোগ করবে আগামী প্রজন্ম।


ওরাইনা খাঁন চৌধুরী

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ,বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা