ডিজিটাল ট্রাফিক সিগন্যাল
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:৫৪ এএম
আপডেট : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:৫৪ এএম
ট্রাফিক সিগন্যাল অটোমেশন সিস্টেমের সফলতা ধরে রাখতে হলে দূর করতে হবে ঢাকার সড়কে চলা দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা।
রাজধানীবাসীর নিত্যদিনের বিড়ম্বনার নাম যানজট। প্রতিদিন নাকাল হতে হয় যানজটে। নির্দিষ্ট সময়ে কোথাও পৌঁছানো যেন অলীক কল্পনা। অথচ যানজট নিরসনের উপায় নিয়ে কথাবার্তা কম হয়নি। ট্রাফিক সিগন্যাল কার্যকরের জন্যও নানা পদক্ষেপের কথা শোনা গেছে। দেখাও মিলেছে কিছু কিছু কাজের। কিন্তু অতীতের প্রায় সব উদ্যোগই ‘মাঠে মারা’ গেছে। সড়কে গতি আনার জন্য রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে তৈরি হয়েছে উড়াল সড়ক, নির্মাণ হয়েছে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, চলছে মেট্রোরেল। এতে করে স্বাভাবিকভাবেই ধারণা করা গিয়েছিলÑ সড়কে গতি ফিরবে। যানজট কমবে, মানুষের দুর্ভোগ কমবে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে শৃঙ্খলার পরিবর্তে বিশৃঙ্খলাই যেন সর্বত্র জেঁকে বসেছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে নগরজুড়ে বাজার, হকার এবং যান্ত্রিক রিকশা, যা সড়ককে গতিহীন করার পাশাপাশি তৈরি করছে নানান প্রতিবন্ধকতা। আর যানবাহন চলাচলে ট্রাফিক আইন ভঙ্গের চিত্র হরহামেশাই ঘটছে। তবে এসবের মধ্যেও আশার বার্তা মিলেছে ‘সড়কে শৃঙ্খলা আনছে ডিজিটাল ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর প্রতিবেদন।
রাজধানীর সড়কে শৃঙ্খলা আনতে গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে চালু হয়েছে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা। গত বছরের আগস্টে শুরু হয় ট্রাফিক সিগন্যাল অটোমেশন সিস্টেমের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম। দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি আধা স্বয়ংক্রিয় (সেমি-অটোমেটিক) ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা পাইলট প্রকল্প হিসেবে চালু হয় রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল, বাংলামোটর, সোনারগাঁও হোটেল (কারওয়ান বাজার), ফার্মগেট, বিজয় সরণি, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং জাহাঙ্গীর গেটে। পরে এটি বাড়িয়ে আরও ১১টি পয়েন্টে চালু হয়। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) প্রযুক্তিগত সহায়তায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মাধ্যমে এসব পয়েন্টে সবুজ, হলুদ ও লাল বাতি জ্বালানোর সময় নির্ধারণ হচ্ছে। ফলে চালকরা ডিজিটাল ট্রাফিক সংকেত মেনে যানবাহন নিয়ে পয়েন্টগুলো অতিক্রম করছেন। সংকেত না মানলে চালকদেরকে জরিমানার আওতায় আনছেন কর্তব্যরত ট্রাফিক পুলিশের কর্মকর্তারা। এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক পদেক্ষপ।
আমরা এই উদ্যোগকে যেমন স্বাগত জানাই, তেমনি কর্তৃপক্ষকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, আগেও রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থার আধুনিকায়নে অনেক পরিকল্পনা হয়েছে। অনেক প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে উপকারভোগী জনগণের অভিজ্ঞতা প্রীতিকর নয়। তাই শুরু থেকেই সতর্ক থাকতে হবে, যেন এবারের উদ্যোগটি আগের ‘মাঠে মারা’ না যায়। সমস্যার মূলে হাত না দিলে শুধু সরকারি অর্থেরই অপচয়ই ঘটবে। আমাদের এও মনে রাখতে হবে, সিগন্যাল ব্যবস্থার আধুনিকায়নই এ রোগের একমাত্র ওষুধ নয়। কারণ আয়তনের তুলনায় রাজধানীতে সড়ক কম, কিন্তু চলাচল করে কয়েক গুণ যানবাহন। এর মধ্যে ধীরগতির যানবাহন যেমন আছে, তেমনি আছে দ্রুতগতির যানবাহনও। ফলে সিগন্যাল বাতি জ্বলার সময় একই গতিতে সব যানবাহন ইন্টারসেকশন পার না হলে এর সুফল মিলবে না। তাই আধা স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থাকে পরিপূর্ণভাবে সফল করতে সড়কের বিশৃঙ্খলাও নিরসন করতে হবে।
পুরো বিশ্বেই ট্রাফিক সিগন্যাল চলছে ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে। অথচ আমাদের এখানে এখনও ট্রাফিক পুলিশের হাতের ইশারায় চলাচল করে যানবাহন। আমাদের ট্রাফিক আইন মানার প্রবণতাও সুখকর নয়। ইতঃপূর্বে বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে ট্রাফিক ব্যবস্থা আধুনিক করা হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাও ফিরে গেছে অ্যানালগ সিস্টেমেই। বর্তমানে উন্নত বিশ্বের আদলে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ‘আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্ট’Ñপদ্ধতির প্রয়োগ এবং তার সফল বাস্তবায়ন অবশ্যই ইতিবাচক। তবে আমরা মনে করি, শুধু ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থার আধুনিকায়নই নয়, একই সঙ্গে ট্রাফিক আইন বাস্তবায়নেও জোর দিতে হবে। অন্যথায় কোনো উদ্যোগই ফলপ্রসূ হবে না।
ট্রাফিক সিগন্যাল অটোমেশন সিস্টেমের সফলতা ধরে রাখতে হলে দূর করতে হবে রাজধানীর সড়কে চলা দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা। এজন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি অভিযান। নাগরিকদের আইন মেনে চলার প্রবণতা বাড়াতে প্রচারণার পাশাপাশি বিদ্যমান আইনের কঠোর প্রয়োগও জরুরি। যানবাহন মালিক, চালক, পথচারী ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারী সবার মধ্যেই আইন মানার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। তাহলেই রাজধানীর ভেঙে পড়া ট্রাফিক ব্যবস্থা প্রাণ ফিরে পাবে, আর সড়কগুলো ফিরে পাবে গতি।