× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সিদ্ধান্তগুলো প্রশংসনীয়, তবে…

মহিউদ্দিন খান মোহন

প্রকাশ : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:৩৬ এএম

মহিউদ্দিন খান মোহন, সাংবাদিক ও কলাম লেখক। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

মহিউদ্দিন খান মোহন, সাংবাদিক ও কলাম লেখক। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমান বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেছেন। জাতির উদ্দেশে দেওয়া তার প্রথম ভাষণে সেগুলো উল্লেখ করেছেন। তন্মধ্যে অন্যতমÑ রাষ্ট্র পরিচালনায় আইনের শাসনই হবে শেষ কথা। তার এই বক্তব্য দেশবাসীর কাঙ্ক্ষিত প্রত্যাশার প্রতিফলন বললে ভুল হবে না। কেননা, এ দেশের মানুষ আইনের শাসনের জন্য চাতক পাখির মতো তাকিয়ে থাকলেও তার দেখা পায়নি। বিশেষ করে গত সরকারের সময়ে তা একেবারেই অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। তখন যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হতোÑ ‘আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে।’ তবে বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। আইনের নিজস্ব কোনো গতি ছিল না। সেটা চলত সরকারের মন্ত্রী-এমপি ও শাসকদলের নেতাকর্মীদের ইচ্ছানুযায়ী। বস্তুত আইনের গতি নির্ভর করে ক্ষমতাসীন সরকারের মর্জির ওপর। তারা আইনকে যেভাবে চালান, আইন সেভাবেই চলে। তারা যদি আইনকে তার স্বাভাবিক পথে চলতে দেন, তাহলে দেশে আইনের শাসন কায়েম হয়। অন্যথায় তা শুধু সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে কিংবা টেলিভিশন টকশোর আলোচনার বিষয়বস্তুতে সীমাবদ্ধ থাকে। 

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আইনি কর্মকাণ্ডে ক্ষমতাসীন দলের হস্তক্ষেপ এতটাই প্রকট রূপ ধারণ করেছিল যে, মানুষ বিপদে আইনের আশ্রয় নিতেও সাহস পেত না। অন্যায়-অবিচারের শিকার হয়েও থানা-পুলিশ বা আদালতের শরণাপন্ন হতে চাইত না নতুন করে হেনস্থার শিকার হওয়ার আশঙ্কায়। সে সময় দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক তার পুত্র ফয়সাল আরেফিন দীপন হত্যাকাণ্ডের পর গণমাধ্যমে প্রকাশ্যেই বলেছিলেন, “কার কাছে বিচার চাইব? আমি বিচার চাই না।” কেন বলেছিলেন তিনি এ কথা? কারণ তিনি দেখেছেন, এ দেশে ন্যায়বিচার নীরবে নয়, সরবে চিৎকার করেই কাঁদে। তিনি দেখেছেন, সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারোয়ার ও মেহেরুন রুনির হত্যাকাণ্ডের বিচার তো দূরের কথা, পুলিশ, র‌্যাব, পিবিআইসহ রাষ্ট্রের কোনো সংস্থাই খুনিদের শনাক্ত করে মামলার চার্জশিট দিতে পারেনি। আইনের শাসনকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করে আওয়ামী লীগ কার্যত বাংলাদেশকে পরিণত করেছিল জাহেলিয়াতের রাজ্যে। যেখানে সন্ত্রাসী-দুর্নীতিবাজরা ছিল নিয়ন্ত্রণহীন। তবে একটি ক্ষেত্রে অবশ্য কঠোর নিয়ন্ত্রণ ছিল। আর সেটা ছিল বিরোধী রাজনৈতিক দলের বেলায়। তাদেরকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য সাংবিধানিক বিধিবিধান ও আইনের অপপ্রয়োগ করা হয়েছে অত্যন্ত কঠোরভাবে। 

যখন একটি দেশে আইনের শাসন অনুপস্থিত থাকে, তখন ক্ষমতাসীন সরকার কর্তৃত্ববাদী শাসনে প্রবৃত্ত হয়। আর কর্তৃত্ববাদী শাসন শেষ পর্যন্ত তাদের ফ্যাসিবাদের দিকে ঠেলে দেয়। আওয়ামী লীগের শাসনকালের দিকে দৃষ্টিপাত করলে সে সত্য প্রতিভাত হয়ে ওঠে। অবশ্য কর্তৃত্ববাদী শাসনের পরিণতি কখনোই শুভ হয় না। বিশ্বের ইতিহাসে এর ভূরি ভূরি নজির রয়েছে। আওয়ামী লীগের পরিণতি তার ব্যতিক্রম নয়। এজন্য বিজ্ঞজনেরা বলে থাকেন, আইনের শাসন শুধু জনগণ বা বিরোধী দলের জন্য ‘সুরক্ষা বেষ্টনী’ নয়, এটা ক্ষমতাসীনদের জন্যও রক্ষাকবচ। কারণ ক্ষমতা হারালে আইনের শাসনই তাদেরকে অবিচারের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে। 

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার যে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন, তা এ দেশের গণমানুষের প্রত্যাশারই প্রতিধ্বনি। এ দেশের মানুষ চিরকাল আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারকে সব ধরনের সহযোগিতা করতে প্রস্তুত থেকেছে। কিন্তু রাষ্ট্রক্ষমতাকে গিলে খেতে ক্ষমতাসীনদের উদগ্রতার কারণে দেশ আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পথে অগ্রসর হতে পারেনি। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না, একটি দেশে আইনের শাসনের অনুপস্থিতি কী ধরনের অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। আইনের শাসন না থাকলে নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ন হয়, তারা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়। যে কথা ওপরে কিছুটা বলা হয়েছে। তারেক রহমান নিজেও আইনের শাসনের অনুপস্থিতির শিকার হয়েছেন। তিনি দীর্ঘ ১৭ বছর দেশের বাইরে নির্বাসিত জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়েছেন দেশে আইনের শাসন না থাকার কারণে। সংগত কারণেই আমরা ধরে নিতে পারি, নিজের জীবনের সে অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় ঘোষণা করেছেন। একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমরা ধারণা করি, তার এ ঘোষণা দেশবাসীকে আশ্বস্ত করবে এবং আইন ও বিচারের প্রতি তাদের যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছিল, তা দূর হবে। 

বিএনপির সংসদীয় দলের প্রথম সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, দল থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যগণ শুল্কমুক্ত গাড়ি নেবেন না এবং সরকারি কোনো প্লটও নেবেন না। এ সিদ্ধান্ত দেশবাসীর মধ্যে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। অবশ্য এর আগে জামায়াতে ইসলামী-এনসিপি জোটও একই রকম সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটা একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত বলা যায়। পৃথিবীর কোনো দেশে পার্লামেন্ট মেম্বারদের বিনাশুল্কে গাড়ি আমদানির সুযোগ রয়েছে বলে জানা নেই। আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের এমপিএ এবং এমএনএগণ অধিবেশনে যোগ দিতে যান অটোরিকশায় চড়ে। যাদের গাড়ি আছে তারা গাড়িতে যান। আর সে গাড়ি আমাদানিকৃত নয়, ভারতে তৈরি গাড়ি। অথচ আমাদের দেশে রাষ্ট্রকে তার প্রাপ্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করার এমন একটি অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হয়েছিল তার কোনো ব্যাখ্যা আজ অবধি পাওয়া যায়নি। জাতীয় সংসদ সদস্যরা দেশ ও জাতির সেবায় কাজ করবেন এটা ঠিক। সেজন্য তাদেরকে জাতীয় সংসদ সচিবালয় থেকে গাড়ি সরবরাহ করা যেতে পারে, যেমনটি করা হয় মন্ত্রীদের। তা ছাড়া শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির সুযোগ নিয়ে অনেক এমপি দুর্নীতিতেও লিপ্ত হয়েছেন অতীতে। তারা বিলাসবহুল গাড়ি আমদানি করে তা বিশেষ কায়দায় ধনাঢ্য ব্যক্তিদের কাছে বিক্রি করে দিয়ে নগদ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন। ওয়ান-ইলেভেনের পর এ ধরনের অনেক গাড়ি রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে বেওয়ারিশ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা গেছে। 

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কয়েকটি সিদ্ধান্ত জনমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। তার মিডিয়া টিমের একজন সদস্য গত ১৮ ফেব্রুয়ারি সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন, তারেক রহমান সরকারি গাড়ি ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি নিজের গাড়িতে চলাফেরা করবেন এবং জ্বালানি এবং ড্রাইভারের বেতনের খরচ নিজেই বহন করবেন। একই সঙ্গে এটাও জানানো হয়েছে, তিনি তার বহরের গাড়ির সংখ্যা কমিয়ে ফেলেছেন এবং গাড়িতে পতাকা ব্যবহার করবেন না। তবে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান ও বিদেশি মেহমানদের সফরের সময় তার গাড়িতে পতাকা থাকবে। তা ছাড়া তার চলাচলের সময় রাস্তা বন্ধ না রাখারও সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর চলাচলের সময় পোশাক পরিহিত পুলিশও রাস্তার দুই পাশে আর থাকবে না। 

সিদ্ধান্তগুলো চমকপ্রদ সন্দেহ নেই। তবে এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবতার সঙ্গে কতটা সংগতিপূর্ণ তা ভেবে দেখার অবকাশ রয়েছে। প্রথমতÑ রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের সরকারি গাড়ি-বাড়িসহ অন্যান্য সুবিধা দেওয়া হয় রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের জন্য রাষ্ট্রের তহবিল থেকেই। এটা তাদের প্রতি কারও অনুদান নয় বরং প্রাপ্য। সারা বিশ্বে এ রীতি অনুসৃত। অবশ্য অনেক রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান তাদের বেতন-ভাতা নিজে না নিয়ে রাষ্ট্রীয় তহবিলে দান করে থাকেন। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তাদের প্রাপ্য বেতন-ভাতা রাষ্ট্রের তহবিলে দান করেছেন। তবে চলাচলের জন্য তারা সরকার প্রদত্ত গাড়ি ব্যবহার করেছেন। এখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তা ব্যবহার করবেন কি না সেটা তার নিজস্ব সিদ্ধান্তের বিষয়। এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ারও তার রয়েছে। কিন্তু এর সুদূরপ্রসারী প্রতিক্রিয়া কি ভেবে দেখেছেন? তিনি যখন মফস্বলে সফরে যাবেন তখনও কি নিজের গাড়ি নিয়ে যাবেন? আর সেটা কি সম্ভব? তা ছাড়া দূরবর্তী এলাকায় যেতে হলে তাকে রাষ্ট্রীয় খরচে হেলিকপ্টারেই যেতে হবে। এক্ষেত্রে অবশ্য প্রাইভেট হেলিকপ্টার ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীদের জন্য তা নিরাপদ হবে না। 

অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী তার গাড়িতে পতাকা ব্যবহার করবেন না, এটা বিজ্ঞজনোচিত সিদ্ধান্ত বলে মনে হয় না। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের গাড়িতে পতাকা বহনের বিধান কোনো বিলাসিতা নয়। এটা সম্মান ও সাধারণ মানুষের গাড়ির সঙ্গে তাদের গাড়ির পার্থক্য নির্ণয়ের জন্যই করা হয়েছে। যাতে রাস্তায় কর্তব্যরত পুলিশ ও অন্যরা সহজেই ওইসব বিশেষ গাড়ি চিহ্নিত করে নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারে। তবে প্রধানমন্ত্রী তার বহরে গাড়ির সংখ্যা কমিয়ে আনার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা প্রশংসাযোগ্য। সফরসঙ্গীদের প্রত্যেকের পৃথক গাড়ির পরিবর্তে দু-তিনটি মাইক্রোবাস ব্যবহার করলে বহরের আকার ছোট হয়ে আসবে এবং তাতে বেশিক্ষণ রাস্তা আটকে থাকবে না। প্রধানমন্ত্রীর গাড়ি ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে সাধারণ গাড়ির মতো চলাচল করবেÑ এটাও যুক্তিযুক্ত সিদ্ধান্ত নয়। কেননা, প্রধানমন্ত্রীকে সময় মেপে যাতায়াত ও কাজ করতে হয়। অফিস কিংবা কোনো অনুষ্ঠানে যাওয়ার পথে হঠাৎ ট্রাফিক জ্যামে পড়ে গাড়িবহর আটকে গেলে তিনি সময়মতো অফিস কিংবা অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে পারবেন না। এতে উটকো ঝামেলার সৃষ্টি হবে। 

বুঝতে অসুবিধা নেই তারেক রহমান জনস্বার্থেই ওইসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলেছেন। তবে তা কার্যকর করার আগে এগুলোর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্বন্ধে ভালোভাবে ভেবে দেখা দরকার। জ্ঞানীজনেরা বলে গেছেন, ‘ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না।’


মহিউদ্দিন খান মোহন

সাংবাদিক ও কলাম লেখক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা