টিআইবির বিজ্ঞপ্তি
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:৫৫ এএম
টিআইবি ই-গভর্ন্যান্স সম্প্রসারণ, উন্মুক্ত তথ্যপ্রবাহ, বাজেট প্রণয়ন ও ব্যয়ে স্বচ্ছতা এবং সংসদীয় নজরদারি জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
দুর্নীতি প্রতিরোধ ছাড়া কোনো প্রতিশ্রুতিই সঠিকভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক দলগুলো নানা প্রতিশ্রুতি দেয়Ñ দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় উন্নয়ন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, সুশাসন প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা না গেলে এসব প্রতিশ্রুতির বেশিরভাগই কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকে। উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ অপচয়, নিয়োগে স্বজনপ্রীতি, ব্যাংক খাতে অনিয়ম, টেন্ডারবাজিÑ এসবই জন-আস্থাকে নষ্ট করে এবং রাষ্ট্রের অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করে।
তবে আশা জাগানিয়া তথ্য, ত্রয়োদশ সংসদে নির্বাচিত সরকার দলীয় সংসদ সদস্যদের শুল্কমুক্ত গাড়ি ও সরকারি প্লট সুবিধা গ্রহণ না করার সুচিন্তিত ঘোষণা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বৈষম্যবিরোধী চেতনায় রাষ্ট্র পরিচালনার প্রথম পদক্ষেপ বলে মনে করছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সিদ্ধান্তটিতে সাধুবাদ বলে উল্লেখ করেছে তারা। বিষয়টিকে বহুল প্রতীক্ষিত, সুচিন্তিত, সময়োপযোগী ও আশা-জাগানিয়া বলে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি। এখন দেখার বিষয়, এসব সুবিধা গ্রহণ না করলে দুর্নীতি কতটা রোধ হয়।
১৮ ফেব্রুয়ারি, বুধবার এক বিজ্ঞপ্তিতে টিআইবি জানায়, এ ঘোষণায় দীর্ঘদিন লালিত কর্তৃত্ববাদী ও বৈষম্যমূলক রাষ্ট্র পরিচালনার চর্চার অবসানের পথে গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হয়েছে। একই সঙ্গে এ পদক্ষেপের পরিপূর্ণ ও টেকসই সুফল অর্জনের লক্ষ্যে রাষ্ট্র মেরামতে বিএনপির ৩১ দফা রূপরেখা, নির্বাচনি ইশতেহার, জুলাই সনদ ও দুদক সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে একটি সমন্বিত জাতীয় দুর্নীতিবিরোধী কৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা গ্রহণেরও আহ্বান জানায় সংস্থাটি। বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আমরা যেন ভুলে না যাই, জুলাই অভ্যুত্থান ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গণরায়ের মৌলিক অভীষ্ট এমন এক জনকল্যাণমূলক বাংলাদেশÑ যা হবে সুশাসিত, জনগণের কাছে জবাবদিহিতামূলক ও দুর্নীতিমুক্ত।
এ কথা সত্য যে, নির্বাচনের আগে বা পরে সরকারের নানা অঙ্গীকার অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক শোনায়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, দুর্নীতির শিকড় উপড়ে না ফেললে এসব প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়িত হয়! আন্তর্জাতিক ও দেশীয় পর্যবেক্ষণ বলছে, দুর্নীতিই উন্নয়নের প্রধান অন্তরায়। এর আগেও টিআইবি বার বার তাদের গবেষণা ও প্রতিবেদনগুলোতে দেখিয়েছে যে, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও রাজনৈতিক প্রভাব দুর্নীতিকে টিকিয়ে রাখছে। টিআইবির বিভিন্ন জরিপে উঠে এসেছেÑ সরকারি সেবা পেতে ঘুষ, নিয়োগে অনিয়ম, উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি এবং ব্যাংকিং খাতে দুর্বল নজরদারিÑ এসব সমস্যার কারণে সাধারণ মানুষ প্রত্যাশিত সেবা থেকে বঞ্চিত হন। উন্নয়ন বাজেট বাড়লেও তার সুফল সমানভাবে পৌঁছে না। অর্থাৎ উন্নয়নের পরিমাণ বাড়লেও গুণগত মান প্রশ্নবিদ্ধ থেকে যায়। এতে জন-আস্থা কমে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি বিশ্বাস দুর্বল হয়।
টিআইবি বহুবার সুপারিশ করেছে যে, দুর্নীতি দমনে কার্যকর স্বাধীনতা ও সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে দুর্নীতি দমন কমিশনের। শুধু আইন থাকলেই হবে না; প্রয়োগে নিরপেক্ষতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন। তদন্ত ও বিচারে দীর্ঘসূত্রতা, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দায়মুক্তিÑ এসব দুর্নীতিবিরোধী প্রচেষ্টাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ফলে সরকারের সুশাসনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে শক্ত ভিত পায় না। টিআইবি ই-গভর্ন্যান্স সম্প্রসারণ, উন্মুক্ত তথ্যপ্রবাহ, বাজেট প্রণয়ন ও ব্যয়ে স্বচ্ছতা এবং সংসদীয় নজরদারি জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে অনিয়ম নিয়েও টিআইবি নানা সময়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি ও অর্থ পাচার দেশের অর্থনীতিকে দুর্বল করে। এতে বিনিয়োগ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কর্মসংস্থান কমে এবং সামাজিক বৈষম্য বাড়ে। তার অর্থ অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি তখন বাস্তব রূপ পায় না।
আমরা মনে করি, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এখানে সবচেয়ে বড় বিষয়। ক্ষমতার পালাবদল হলেও যদি দুর্নীতির ধরন ও পৃষ্ঠপোষকতা বদল না হয়, তবে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হবে না। বরং একটি শক্তিশালী, জবাবদিহিতামূলক ও স্বচ্ছ প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপ নজরদারির আওতায় থাকবে।
আসলে উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও সামাজিক ন্যায়বিচারÑ সবকিছুর ভিত্তি হলো সুশাসন। আর সুশাসনের প্রধান শত্রু দুর্নীতি। তাই প্রতিশ্রুতির পাহাড় গড়ার আগে দুর্নীতির শিকড় উপড়ে ফেলাই হওয়া উচিত সরকারের প্রথম ও প্রধান অগ্রাধিকার। দুর্নীতি রোধে কার্যকর পদক্ষেপই পারে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং ঘোষিত প্রতিশ্রুতিগুলোকে বাস্তবে রূপ দিতে।
টিআইবির অভিমত স্পষ্টÑ দুর্নীতিকে সহনীয় পর্যায়ে রেখে উন্নয়ন সম্ভব নয়। টেকসই উন্নয়ন, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ এবং গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার জন্য দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রতিশ্রুতির সাফল্যনির্ভর করে সুশাসনের ওপর, আর সুশাসনের পূর্বশর্ত হলো দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ও নিরপেক্ষ পদক্ষেপ। তাই সরকারের প্রতিশ্রুতি পূরণের প্রথম ধাপ হওয়া উচিত দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃঢ় ও দৃশ্যমান অবস্থান। আমরা চাই, সরকারের প্রথম ধাপ হোক দুর্নীতি রোধ। সরকারের লক্ষ্য যেন সফলতা পায়।