× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ভারত-চীন সীমান্তে উত্তেজনা শান্তির অন্তরায়

ফারিহা জেসমিন

প্রকাশ : ২৫ ডিসেম্বর ২০২২ ০০:০৪ এএম

আপডেট : ২৫ ডিসেম্বর ২০২২ ১৬:৫০ পিএম

অলঙ্করন : প্রবা

অলঙ্করন : প্রবা


সম্প্রতি চীন-ভারত সীমান্তে দুই দেশের সৈন্যদের মধ্যে ব্যাপক সংঘাতের সূচনায় দুই দেশের মধ্যে বিরাজ করছে উত্তেজনা। শুরু হয়েছে তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে বিস্তর আলোচনা, নতুন করে জন্ম নিয়েছে গুরুতর সংঘর্ষ কিংবা যুদ্ধের আশঙ্কা নিজ দেশের সার্বভৌমত্ব সুরক্ষা নিয়ে ভারতের রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতাসীন বিজেপিকে করছে নানান প্রশ্ন এবং সেসব প্রশ্নের জবাব পাল্টা জবাব নিয়ে ভারতের রাজনীতির মাঠ ইদানীংকালে হয়ে উঠেছে সরগরম। ১৪৪ কোটি জনসংখ্যা অধ্যুষিত গণচীন পূর্ব এশিয়ার একটি পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ৫টি স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে একটি, যারা যেকোনো সিদ্ধান্তে ভেটো প্রদানের ক্ষমতাপ্রাপ্ত অর্থনৈতিক এবং সামরিকভাবে শক্তিশালী এই দেশ এশিয়ার একটি বৃহৎ আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে বিশ্ব মানচিত্রে স্থান করে নিয়েছে সামরিকভাবে ভীষণ শক্তিশালী (বিশ্বে বর্তমানে ২য়) হলেও ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধ ছাড়া অন্য বড় কোনো যুদ্ধে চীন নিজেকে সম্পৃক্ত করেনি। অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়ার অগ্রগামী শক্তি হিসেবে ভারতকেও কোনো অংশে ছোট হিসেবে দেখার অবকাশ নেই।

চীনের মতো অর্থনৈতিকভাবে অতটা শক্তিশালী না হলেও ভারত সবদিক থেকে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র সীমান্ত নিয়ে চীন-ভারতের মধ্যকার দ্বন্দ্ব বা সংঘাত ঐতিহাসিক যা এখনও চলমানদুই দেশের যৌথ সীমার পরিমাণ প্রায় সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটার বা ২১০০ মাইল, যার অধিকাংশই অমীমাংসিত চীন তিব্বত দখল করার পর ভারতের বর্তমান অরুণাচল প্রদেশ আকসাই চীনকে চীনের অন্তর্ভুক্ত এলাকা বলে দাবি করেএই দুই অঞ্চলে (ভারত-চীন) নিজ নিজ সার্বভৌমত্ব বিস্তারকে প্রাধান্য দেওয়ার জন্য পরস্পর দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে। এই সীমানা বিরোধকে কেন্দ্র করে ১৯৬২ সালে প্রথম চীন-ভারত যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং সেবার ভারত চীনের কাছে পরাজিত হয়। যুদ্ধে চীন জয়ী হয়ে একতরফা যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে আকসাই চীন নিজের দখলে রাখে, কিন্তু অরুণাচল প্রদেশ ফিরিয়ে দেয়যুদ্ধের পর ভারত নিজ সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে এবং ভারতের শান্তিবাদী বিদেশনীতিও কিছু পরিবর্তন আসে। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন, ভারতের পক্ষে সমর্থন দিলেও পাকিস্তান চীনের পন্থা অনুসরণ করে এবং মিত্রতা বাড়াতে তৎপর হয়। ১৯৬২ সালের এই যুদ্ধের পর ভারত এবং চীনের মধ্যকার শীতল সম্পর্ক স্পস্ট রূপলাভ করে। দুই দেশই তাদের পরস্পরের মধ্যকার বৈদেশিক নীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনে, যা ছিল নেতিবাচক ফলশ্রুতিতে দুই দেশ ভবিষ্যতে বড় কোনো সংঘাতে লিপ্ত না হলেও সময়ে সময়ে সীমানা সংঘাত ক্রমেই বেড়েছে

ইতিহাস বলছে, সিকিমে ১৯৬৭ সালে একটি স্বল্পস্থায়ী সংঘর্ষ হয়েছিল। ১৯৮৭, ২০১৩, ২০১৭, ২০২০-এর বিভিন্ন সময়ে চীন-ভারত সীমান্তে উত্তেজনা বিরাজ করেছে এবং ছোটখাটো সংঘর্ষ হয়েছে সর্বশেষ গত ৯ ডিসেম্বর ২০২২ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছে, উত্তর-পূর্ব ভারতের অরুণাচল প্রদেশের তাওয়াং সেক্টরে দুই দেশের সেনারা মুখোমুখি সংঘাতে জড়িয়ে পড়েন। পরিস্থিতি হাতের নাগালের বাইরে যাওয়ার আগেই দুই দেশের সামরিক কর্মকর্তারা আলোচনা সাপেক্ষে সীমান্ত পরিস্থিতি মোটামুটি শান্ত করতে সক্ষম হয়েছেন। ঘটনা যত ছোটই হোক, আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিশ্লেষকরা বিষয়টিকে সামান্য বলে মানতে পারছেন না। অনেকে মনে করছেন, তাওয়াং সেক্টরের সংঘাতে দুই দেশের অন্তত ৪০ সেনাসদস্য আহত হয়েছেন অপরদিকে চীনা সেনারা প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখার (এলএসি) অবস্থা বদলে দিয়েছেনচীন এলএসি এলাকার প্রায় ৯০০ বর্গকিলোমিটার জায়গা দখল করে নিয়েছে যা ভারতের জন্য মোটেও ভালো খবর নয়কারণ এসব অঞ্চলে আগে উভয় পক্ষের সেনারা শান্তিপূর্ণভাবে নিয়মিত টহল দিতে পারলেও ভারতের সেনারা এখন সেই অধিকার হারাল। স্মরণে আছে, ২০২০ সালে পূর্ব লাদাখ সীমান্তের গালওয়ান ভ্যালিতে বড় ধরনের সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছেন ভারত-চীনের সেনারা। তখনও আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা হয়নি তবে উভয়পক্ষই বড় পরিসরে লাঠিযুদ্ধেএতে ভারতের ২০ ও চীনের চার সেনা নিহত হন। আহত হন অনেকে। এভাবে এশিয়ার পরমাণু শক্তিধর দুই দেশের মধ্যে সীমানা নিয়ে দফায় দফায় অসন্তোষ এবং সংঘর্ষ নিজেদের মধ্যকার সম্পর্কের তিক্ততাকে দীর্ঘস্থায়ী করছে, যার নেতিবাচক অর্থনৈতিক প্রভাবও দুই দেশের ওপর পড়বে, কারণ চীন ভারতের অন্যতম একটি বাণিজ্যিক সঙ্গী। ইতোমধ্যে এই রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব মোদী এবং চীনা প্রেসিডেন্ট শি জি পিং-এর মধ্যকার সম্পর্কের ওপর পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে চূড়ান্ত নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে, যেখানে কূটনৈতিক ক্ষেত্রে বিজেপিকে চীন-ভারত সীমান্ত ইস্যু নিয়ে চরম ব্যর্থ বলে অভিহিত করে যাচ্ছেন দেশটির বিজেপিবিরোধী রাজনৈতিক দলোগুলো। তারা বলছেন বিজেপি নেতৃত্বাধীন ভারতের বর্তমান সরকার সীমান্ত ইস্যুতে চীনের সমানে সমান অবস্থান নিতে পারছে না এবং তাই সীমান্তে চীনের কঠোর কার্যকলাপের পর্যাপ্ত জবাব দিতে ভারত ব্যর্থ হচ্ছে। সাবেক কংগ্রেস সভাপতি সোনিয়া গান্ধী এই ইস্যুতে বিজেপির প্রতি প্রশ্ন ছুড়েছেন এবং চীন-ভারত সীমান্তে চলমান উত্তেজনায় ভারতের প্রকৃত প্রতিক্রিয়া ভারতের জনগণের সামনে আনা হচ্ছে না বলে অভিযোগ করে সংসদে এ বিষয়ে উন্মুক্ত আলোচনার জোর দাবি জানান। তার মতে চীনের এ ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশের প্রতিকারে মোদি সরকারের নীতি কি, তা দেশের জনগণ জানতে চায়।

চীন সীমানা ক্রমাগতই বাড়িয়ে চলেছে এবং আধুনিক অস্ত্রের মহড়ার মাধ্যমে দেখিয়ে দিচ্ছে যে তারা পুনরায় যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা বর্তমান মোদি প্রশাসন জনগণের কাছে লুকিয়ে যাচ্ছেন বলে মন্তব্য করেছেন এককালের কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট এবং বর্তমান কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। যদিও তার এই বক্তব্যের জোর প্রতিবাদ জানিয়েছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতারাপ্রসঙ্গত, অরুণাচলে ২০২২-এর ৯ ডিসেম্বরের ঘটনার পর বুধবার (১৪ ডিসেম্বর) লোকসভায় বড় পরিসরে এই বিষয়ে আলোচনা করতে চেয়েছিলেন ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস ও তৃণমূল কংগ্রেসের (টিএমসি) এমপিরা। কিন্তু বিজেপির স্পিকার ওম বিরলা সেই সুযোগ দেননি। এ অবস্থায় সোনিয়া গান্ধীর নেতৃত্বে বিরোধী এমপিরা ওই দিন লোকসভা থেকে ওয়াকআউট করেন। 

সম্প্রতি অরুণাচলের ঘটনার পর পর ভারতের নতুন মিসাইল অগ্নি-৫ উৎক্ষেপণ চলমান চীন-ভারত উত্তেজনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। দেশটির প্রতিরক্ষা বিভাগ এই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার সঙ্গে অরুণাচলের ঘটনার কোনো সম্পর্ক নেই বলে দাবি করলেও গত ১৫ ডিসেম্বরের এই শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষার মাধ্যমে ভারত চীনকে নীরবে নিজের সামরিক ও প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান জানান দেয় বলে অনেকেই মন্তব্য করছেন। তা ছাড়া এই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষণ পারমাণবিক অস্ত্রের ক্ষেত্রে ভারতের নো ফার্স্ট ইউজ নীতির পরিপন্থি বলে ও অনেকেই উল্লেখ করেছেন। ঝু চেন্মিং নামক একজন চীনা গবেষক মনে করছেন ভারতের এই পারমাণবিক পরীক্ষণ একটি সাধারণ প্রতিরক্ষামূলক কার্যকলাপের অংশ, চীনের আরও শক্তিশালী অস্ত্র রয়েছে যা চীন সাম্প্রতিক ঘটে যাওয়া ঘটনায় ব্যবহার করবে না, কারণ তাতে দুই দেশের মধ্যকার সমস্যা আরও বাড়বে। তবে চীন-ভারতের সামরিক কার্যকলাপে সতর্ক হয়ে যাবে এবং নিজের সামরিক শক্তি আরও পোক্ত করবে বলে ঝু মনে করছেন।

বিশ্বের নানান প্রান্তের সামরিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরাও মনে করছেন ভারতের এই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষণ চীনকে হুমকি দেওয়ার উদ্দেশ্যে নয় বরং অগ্নি-৫ উৎক্ষেপণ একটি রুটিন সামরিক মহড়া যা অনিচ্ছাকৃতভাবেই ১৫ তারিখে সম্পন্ন হয়েছে। তারা বলছেন এটা একটা সাধারণ ঘটনা, যা চীনের উদ্দেশ্যে পরিচালিত নয়। দিল্লির ক্রমেই সামরিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ঝুঁকে যাওয়া চীন ভালোভাবে না নিলেও ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের অবনতি চায় না চীন, যার প্রমাণ হলো দীর্ঘ দিনের সীমান্ত সংঘাত সত্ত্বেও তাদের অর্থনৈতিক লেনদেনের স্থিরতা। কিন্তু বেশ কিছু বছর ধরে সীমান্ত নিয়ে দুই দেশের কোনো ফলপ্রসূ আলোচনা না হওয়ার কারণে তাদের কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতি হতে পারে বলে অনেকেই ধারণা করছেন।

 

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা