× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বিশ্লেষণ

রাষ্ট্র পুনর্গঠনে ঐতিহাসিক সুযোগ বিএনপির

আবু জুবায়ের

প্রকাশ : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১২:০৪ পিএম

বিএনপির লোগো। ছবি: সংগৃহীত

বিএনপির লোগো। ছবি: সংগৃহীত

(শেষ পর্ব)

ভবিষ্যৎ অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি নিয়ে একটি মিশ্র ও অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং পূর্বাভাস দিয়েছে, যা নতুন সরকারের জন্য এক ভয়াবহ সতর্কবার্তা। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) মনে করে ২০২৫ সালে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে ৪.০ শতাংশ এবং ২০২৬ সালে তা ৫.০ শতাংশে দাঁড়াবে; একই সময়ে মূল্যস্ফীতির হার যথাক্রমে ১০.০ শতাংশ এবং ৮.০ শতাংশ হবে বলে তারা পূর্বাভাস দিয়েছে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে ৪.৯ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি থাকবে ৮.৭ শতাংশের ঘরে। এ ছাড়া জাতিসংঘের (ইউএন ডেসা) এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০২৪ অর্থবছরের ৪.১ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পর ২০২৬ অর্থবছরে তা ৪.৬ শতাংশ হতে পারে এবং ২০২৫ সালের ৮.৯ শতাংশ মূল্যস্ফীতি কমে ২০২৬ সালে ৭.১ শতাংশে নামতে পারে । 

এই উপাত্তগুলো স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, আগামী কয়েক বছর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের আশপাশেই স্থবির হয়ে থাকবে এবং মূল্যস্ফীতির হার উদ্বেগজনকভাবে বেশি থাকবে। জাতিসংঘের ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক সিচুয়েশন অ্যান্ড প্রসপেক্টস ২০২৬’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, যেখানে ভারতের মূল্যস্ফীতি ২.৭ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কার মাত্র ০.৬ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশের ৭.১ শতাংশে অবস্থান করার পূর্বাভাস অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতাকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। তারেক রহমান অত্যন্ত সময়োপযোগীভাবে উল্লেখ করেছেন যে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পর তার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হবে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। কারণ, অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে না পারলে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিই দীর্ঘমেয়াদে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হবে না। 

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও কাঠামোগত সংকট কোনো বিচ্ছিন্ন ভৌগোলিক ঘটনা নয়। মানব ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ চরম স্বৈরতন্ত্রের পর এ ধরনের কাঠামোগত শূন্যতা ও পুনর্গঠনের মুখোমুখি হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর জার্মানির অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, নব্বইয়ের দশকের পোল্যান্ডের অহিংস গণতান্ত্রিক উত্তরণ এবং বর্ণবাদ-পরবর্তী দক্ষিণ আফ্রিকার ‘রেইনবো নেশন’ গড়ার অভিজ্ঞতা নতুন সরকারের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির পর জার্মানি ছিল আক্ষরিক অর্থেই এক মৃত্যুপুরী ও ধ্বংসস্তূপ। এই চরম বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে ১৯৪৯ সালে কনরাড আডেনাউয়ার যখন নবগঠিত পশ্চিম জার্মানির প্রথম চ্যান্সেলর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন তার সামনে মূল চ্যালেঞ্জ ছিল একটি ক্ষতবিক্ষত জাতিকে একত্রিত করা। তিনি প্রতিশোধমূলক রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে দেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে সর্বোচ্চ মনোযোগ দেন। ‘ডিনাজিফিকেশন’ বা নাৎসিবাদের মূলোৎপাটন একটি বড় রাজনৈতিক ইস্যু হলেও, আডেনাউয়ার খুব দ্রুত বুঝতে পেরেছিলেন যে কেবল অতীত ঘাঁটলে দেশের অর্থনীতি দাঁড়াবে না। তাই তিনি অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং সামাজিক স্থিতিশীলতাকে বেশি গুরুত্ব দেন।

বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই ইতিহাস থেকে সবচেয়ে বড় শিক্ষণীয় দিক হলো, পূর্ববর্তী কতৃত্ববাদী সরকারের ভয়াবহ অন্যায় এবং দুর্নীতির বিচার অবশ্যই হতে হবে, কিন্তু সদ্য নির্বাচিত সরকারের মূল ফোকাস বা কেন্দ্রবিন্দু হতে হবে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান বিনির্মাণ।

পূর্ব ইউরোপে কমিউনিজমের পতনের সূচনা হয়েছিল পোল্যান্ডের রাজপথ এবং কারখানাগুলোর মধ্য দিয়ে। ১৯৮০ সালে লেক ওয়ালেসার নেতৃত্বে শুরু হওয়া ঐতিহাসিক ধর্মঘট পরবর্তীতে ‘সলিডারিটি’ নামক এক বিশাল সামাজিক আন্দোলনে রূপ নেয়। ১৯৮৯ সালে পোল্যান্ডের কমিউনিস্ট সরকার দেশের ভয়াবহ অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে সলিডারিটির নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে বাধ্য হয়, যা ইতিহাসে ‘গোলটেবিল চুক্তি’ নামে খ্যাত। এই আলোচনার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো চরম সংঘাতপূর্ণ একটি পরিস্থিতি থেকে রাজনৈতিক আপসের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক উত্তরণ।

বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের সঙ্গে পোল্যান্ডের এই সলিডারিটি আন্দোলনের গভীর মিল রয়েছে। পোল্যান্ডের ইতিহাস প্রমাণ করে যে, স্বৈরতন্ত্রের পতনের পর একটি সফল রাষ্ট্র গঠন করতে হলে রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ এবং ছাত্র নেতৃবৃন্দের মধ্যে একটি সুসংহত ঐকমত্য প্রয়োজন। বিএনপির প্রস্তাবিত ‘ন্যাশনাল রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ বা জাতীয় ঐকমত্যের সরকারের ধারণাটি মূলত পোল্যান্ডের এই গোলটেবিল চুক্তির দর্শনেরই প্রতিধ্বনি।

বর্ণবাদের অবসান ঘটিয়ে ১৯৯৪ সালে নেলসন ম্যান্ডেলার নেতৃত্বে আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস (এএনসি) যখন দক্ষিণ আফ্রিকার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হয়, তখন তারা একটি অত্যন্ত বিভক্ত রাষ্ট্র উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিল। ম্যান্ডেলা এই নতুন বৈষম্যহীন সমাজকে ‘রেইনবো নেশন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। জাতি গঠনে এএনসি ‘পুনর্গঠন ও উন্নয়ন কর্মসূচি’ নামে একটি নীতি গ্রহণ করে প্রাথমিক সাফল্য পেলেও, দীর্ঘমেয়াদে দক্ষিণ আফ্রিকার গভীরে প্রোথিত কাঠামোগত ও জাতিগত বৈষম্য দূর করতে তারা চরমভাবে ব্যর্থ হয়। বর্তমান দক্ষিণ আফ্রিকায় বেকারত্বের হার প্রায় ৩১.৯ শতাংশে পৌঁছেছে এবং অর্ধেকেরও বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে।

বিএনপি তাদের রূপরেখায় যে ‘রেইনবো নেশন’ গঠনের কথা বলেছে, দক্ষিণ আফ্রিকার এই ইতিহাস তাদের জন্য একাধারে একটি বিশাল অনুপ্রেরণা এবং একটি গভীর সতর্কবার্তা। সতর্কবার্তা হলো কেবল চমৎকার রাজনৈতিক স্লোগান দিয়ে একটি রাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখা যায় না। যদি সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা না যায় এবং অর্থনৈতিক সিন্ডিকেট প্রথা দূর করা না যায়, তবে ‘রেইনবো নেশন’-এর মতো মহৎ ধারণাও সময়ের পরিক্রমায় ব্যর্থ হতে বাধ্য।

১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচনে বিজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আজ এমন এক ঐতিহাসিক মোহনায় দাঁড়িয়েছে, যেখান থেকে পেছনের দিকে তাকানোর কোনো সুযোগ নেই। এই নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে তীব্র প্রতিযোগিতা হয়েছে, বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর মতো তৃতীয় বৃহত্তম দল এবং ছাত্র-নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে, তা প্রমাণ করে জনগণ একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রত্যাশী। এই নির্বাচনে মোট ভোটারের প্রায় এক-চতুর্থাংশ ছিলেন তরুণ এবং প্রথম প্রজন্মের ভোটার, যারা জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে সম্মুখভাগে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন । 

অর্থনৈতিক ফ্রন্টে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা সবচেয়ে জরুরি। এই পরিস্থিতিতে নতুন নির্বাচিত সরকারকে জার্মানির কনরাড আডেনাউয়ারের মতো অত্যন্ত প্রজ্ঞাপূর্ণ এবং বাস্তবসম্মত অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশকে অত্যন্ত সতর্ক ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি অনুসরণ করতে হবে।

রাষ্ট্র পুনর্গঠন কোনো একক রাজনৈতিক দলের একার পক্ষে সম্ভব নয়। বিএনপি যদি তাদের প্রস্তাবিত রেইনবো নেশন বা অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে চায়, তবে তাদেরকে অবশ্যই মতাদর্শিক পার্থক্য ভুলে সকল গণতান্ত্রিক শক্তি, সুশীল সমাজ, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী এবং বিশেষ করে তরুণ ছাত্রসমাজের সঙ্গে একটি টেকসই অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে হবে। তারেক রহমান সরকার গঠনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে অনুধাবন করেছেন যে, জুলাই বিপ্লবের শহীদদের আত্মত্যাগই আজকের এই পরিবর্তনের মূল ভিত্তি। বাংলাদেশের জনগণ অসীম ত্যাগের বিনিময়ে রাষ্ট্র মেরামতের যে সুযোগ এনে দিয়েছে, তাকে একটি কার্যকর, গণতান্ত্রিক এবং জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রে পরিণত করাই নতুন সরকারের একমাত্র দাবি। এই ঐতিহাসিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে বাংলাদেশের আগামী দশকের ভাগ্য।


আবু জুবায়ের 

কবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা