× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ইমেইল থেকে

লজিস্টিকস সংকট: অর্থনীতির নীরব জরুরি অবস্থা

প্রজ্ঞা দাস

প্রকাশ : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:০১ এএম

আপডেট : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:১১ এএম

বিশ্ববাজারে যেখানে সময়ই প্রতিযোগিতার সবচেয়ে বড় মুদ্রা, সেখানে বিলম্ব মানেই ক্ষতি।

বিশ্ববাজারে যেখানে সময়ই প্রতিযোগিতার সবচেয়ে বড় মুদ্রা, সেখানে বিলম্ব মানেই ক্ষতি।

বাংলাদেশ একটা উন্নয়নশীল দেশ। এই ভূখণ্ডের অধিকাংশ মানুষই নিম্ন কিংবা নিম্ন মধ্য-আয়ের। অমানুষিক পরিশ্রম আর প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করেই চলে এদেশের মানুষের জীবনব্যবস্থা। এই অবস্থায় এখানে বসবাসরত মানুষের জীবনের পরিবর্তন করতে এবং দেশের সার্বিক উন্নয়ন সাধন করতে বৈদেশিক বাণিজ্যের বিস্তার এবং বাণিজ্য-সংক্রান্ত সামগ্রিক ব্যবস্থার উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশ যত বৈদেশিক বাণিজ্যে অগ্রগতি লাভ করবে, ততই উন্নয়নশীল দেশের কাতার থেকে উন্নত দেশের দিকে ধাবিত হবে। তবে দুঃখজনক বিষয় হলো সেদিকে অগ্রসর হওয়ার পথ এত সহজ নয়, বেশ কণ্টকাকীর্ণ। এর মধ্যে বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বেশি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে লজিস্টিক সংকট।

লজিস্টিকস কেবল পণ্য পরিবহন নয়; এটি উৎপাদন, সংরক্ষণ, সরবরাহ, বন্দর ব্যবস্থাপনা, কাস্টমস প্রক্রিয়া, সড়ক ও রেল নেটওয়ার্ক, জ্বালানি সরবরাহ এবং ডিজিটাল সমন্বয়ের সমন্বিত অবকাঠামো। এই সমন্বয়ের কোথাও সামান্য সমস্যা ঘটলেই পুরো অর্থনৈতিক চক্র ধীর হয়ে যায়। বাংলাদেশে সেই ধীরগতি এখন ক্রমশ স্থবিরতার দিকে এগোচ্ছে, যা ভবিষ্যতের জন্য কোনো ভালো দিকনির্দেশনা বহন করে না। এই প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে এভাবে চলতে থাকলে শিল্পায়নের গতির সঙ্গে তাল মেলানো কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। ইতোমধ্যেই লজিস্টিকস খাতের অব্যবস্থাপনা এবং সময়োপযোগী উন্নয়ন না হওয়ায় উৎপাদনশীলতা কমছে, বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় দেশ পিছিয়ে পড়ছে। 

চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার। দেশের অধিকাংশ আমদানি ও রপ্তানি ব্যবস্থা এই বন্দরের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে জাহাজজট, কন্টেইনার জট, সীমিত জেটি সক্ষমতা, ধীর কাস্টমস প্রক্রিয়া এবং অভ্যন্তরীণ পরিবহন ব্যবস্থার দুর্বলতা এই বন্দরের কার্যকারিতা কমিয়ে দিয়েছে। একটি কন্টেইনার খালাস হতে যে সময় লাগে, তা অনেক প্রতিযোগী দেশের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের সরবরাহ সক্ষমতা অনিশ্চিত এবং ধীরগতি সম্পন্ন বলেই বিবেচিত হচ্ছে। 

বিশ্ববাজারে যেখানে সময়ই প্রতিযোগিতার সবচেয়ে বড় মুদ্রা, সেখানে বিলম্ব মানেই ক্ষতি। রপ্তানিমুখী শিল্পে নির্ধারিত সময়ে পণ্য পাঠাতে না পারলে ক্রেতারা বিকল্প উৎস খুঁজে নেয়। ফলে অর্ডার কমে যায়, মূল্য ছাড় দিতে হয়, লাভের মার্জিন সংকুচিত হয়। একই সঙ্গে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, কারণ কাঁচামাল বন্দরে আটকে থাকলে কারখানায় উৎপাদন থেমে যায় অথবা অতিরিক্ত মজুদ খরচ তৈরি হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই পুরো অবস্থার প্রভাব পড়ে শ্রমিকের মজুরি, উদ্যোক্তার বিনিয়োগ এবং রাষ্ট্রের রপ্তানি আয়ের ওপর। শুধু বন্দর নয়, লজিস্টিক সমস্যার ক্ষতির প্রভাব দেখা যায়, দেশের অভ্যন্তরীণ পরিবহন ব্যবস্থায়ও। 

বর্তমানে এই প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে লজিস্টিক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা বিনিয়োগকারীরা সরবরাহ ব্যবস্থার এমন নাজুক অবস্থা দেখে তারা বিনিয়োগ আকর্ষণ হারায় এবং অনেক ক্ষেত্রেই তারা পার্শ্ববর্তী অন্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্য করার পরিকল্পনা করে। বাণিজ্য প্রক্রিয়া কোনো এক দিনের জিনিস নয়। বিনিয়োগকারী ভালো ফিডব্যাক পেলে তারা যেমন পুনরায় আবার বাণিজ্য করতে উৎসুক হবে, পাশাপাশি তারা অন্যান্য ক্ষেত্রেও বাণিজ্য মাত্রাকে বাড়িয়ে দেবে। ঠিক একইভাবে খারাপ ফিডব্যাক পেলে তারা বাণিজ্য করতে নিরুৎসাহিত হবে। তাই এই অবস্থা থেকে উত্তরণে এখনই ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় দেশের জন্য অশনিসংকেত অপেক্ষা করছে। বাণিজ্য-সম্পর্কিত খাতগুলোতে পরিকল্পিত বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি নীতিগত সংস্কার এবং প্রযুক্তি-নির্ভর ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই। এখানেই শেষ নয়, বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, গভীর সমুদ্রবন্দর কার্যকর করা, রেল ও নৌপথে মালবাহী পরিবহন বাড়ানো, একক ডিজিটাল কাস্টমস প্লাটফর্ম চালু করা এবং আঞ্চলিক সংযোগ উন্নয়নে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। 

এ ছাড়া বাণিজ্য ক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের পথ প্রশস্ত করতে হবে। কারণ লজিস্টিকস উন্নয়ন মানে কেবল অবকাঠামো নির্মাণ নয়; এটি একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া। যেখানে উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ সময়, ব্যয় এবং দক্ষতার মানদণ্ডে পরিচালিত হয়। তাই সমন্বিত উন্নয়ন দরকার। এতে কৃষক ন্যায্যমূল্য পাবে, শিল্প প্রতিযোগিতামূলক হবে, রপ্তানিতে নতুন বাজার সৃষ্টি হবে, বিনিয়োগ আকর্ষণ বাড়বে, বাণিজ্য বিস্তৃত হবে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসবে এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে। মূলত লজিস্টিকস শক্তিশালী হওয়া মানে পুরো অর্থনীতি শক্তিশালী হওয়া। আর অর্থনীতির উন্নয়ন হলেই বাংলাদেশের প্রতিটা খেটে খাওয়া মানুষ থেকে শুরু করে সর্বস্তরের মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তন হবে। দেশ উন্নয়নশীল দেশ থেকে বেরিয়ে উন্নত দেশের কাতারে পরিগণিত হবে। আর বহির্বিশ্বের কাছে বাংলাদেশ স্বমহিমায় উজ্জ্বল হবে।


প্রজ্ঞা দাস 

শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ, ঢাকা 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা